রাজধানীর প্রবেশ পথে জনস্রোত


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২৪ জুন ২০২১, ১০:৪২

করোনার থাবা থেকে সুরক্ষিত রাখতে অবরুদ্ধ করা হয়েছে রাজধানী ঢাকাকে। রাজধানীর কোনো প্রবেশপথ দিয়েই ঢুকতে কিংবা বের হতে দেয়া হচ্ছে না কোনো গণপরিবহন। প্রতিটি প্রবেশপথেই বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। তবে আটকানো যাচ্ছে না মানুষকে। দেশের ভিন্ন এলাকা থেকে এসে প্রবেশপথে নেমে চেকপোস্ট পার হয়ে নগরীতে প্রবেশ করছেন তারা।

এতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের। ঢাকার পার্শ্ববর্তী চার জেলাসহ কঠোর লকাডাউনকৃত সাত জেলায় গণপরিবহন না চললেও প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, ট্রাক কিংবা কাভার্ডভ্যানে যাতায়াত করছেন মানুষ। রাস্তায় প্রশাসনের তল্লাশির কারণে অনেক জায়গায় লেগেছে দীর্ঘ জ্যামও। হুট করে লকডাউন দায়েরের কারণে এমন ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে বলে দাবি করছেন ভুক্তভোগীরা।

ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগাম বার্তা না দিয়ে হঠাৎ করে ঢাকার আশপাশের ৭ জেলায় লকডাউন দিয়ে ঢাকাকে সারাদেশের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ঢাকার সঙ্গে সকল যোগাযোগ ব্যবস্থা। এতে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ঢাকায় আসা মানুষেরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। জরুরি প্রয়োজনে যারা ঢাকার বাইরে গিয়ে আটকা পড়েছেন তারাও পথে পথে দুর্ভোগ পেরিয়ে ঢাকায় ফিরতে হচ্ছে। সরকার এক-দুই দিন সময় নিয়ে এই লকডাউন দিলে এই ভোগান্তি পোহাতে হতো না।

সকালে গাবতলী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, লকডাউনের চরম প্রভাব পড়েছে ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ গাবতলীতে। আমিনবাজার ব্রিজে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়ায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। ব্রিজের দুই পাশে আটকে দেয়া হচ্ছে যানবাহন। গাবতলীতে আটকে দেয়া হচ্ছে ঢাকার অভ্যন্তরীণ গণপরিবহনসহ অন্যান্য পরিবহন। ওদিকে ব্রিজের অপর পাশে আমিনবাজারে আটকে দেয়া হচ্ছে সাভারের বাসসহ অন্যান্য যানবাহন।

সকাল ৭টা থেকেই সেই এলাকায় দেখা যায় মানুষের ঢল। বেশির ভাগই হেঁটে প্রবেশ করছেন ঢাকায়। তাদের মধ্যে অফিসগামী মানুষের সংখ্যাই বেশি, যারা মূলত সাভারে থাকেন। রয়েছেন পোশাককর্মী। এর বাইরে অন্যান্য জেলা থেকে ঢাকার পথে আসছেন চিকিৎসা করাতে রোগী, বেড়াতে গিয়ে আটকে পড়া ঢাকার বাসিন্দারা। এছাড়া বাইরের জেলাগুলো থেকে ভেঙে ভেঙে আসছেন অনেকে। এতে খরচ হচ্ছে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।

গাইবান্ধা থেকে ঢাকায় আসছেন বেসরকারি ফার্মের কর্মকর্তা রহিম আব্দুল্লা। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, হঠাৎ সব বন্ধ না করে দিয়ে তিন-চার দিন আগে ঘোষণা দিলে ভোগান্তিটা হতো না।

তিনি বলেন, চাকরি বাঁচানোর জন্য আসতে হচ্ছে। এতে যেমন অতিরিক্ত টাকা খরচ হয়েছে, তেমনি ভোগান্তি হয়েছে অনেক। গাইবান্ধা থেকে আসতে স্বাভাবিক সময়ে ৫০০ টাকার বেশি লাগে না। এখন জনপ্রতি লাগছে দেড় হাজার টাকার মতো। মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টায় রওনা দিয়েছেন গাইবান্ধা থেকে। গাবতলী পর্যন্ত পৌঁছাতেই বেজে গেছে সকাল ১১টা।

সার্বিক কার্যাবলি ও চলাচল বন্ধের আওতায় থাকা জেলা মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকায় ডায়ালাইসিস করার জন্য এসেছেন সাহারা বেগম। গাবতলীতে ভাগনিকে নিয়ে হাঁটতে দেখা গেল তাকে। সাহারা বেগম বলেন, ‘অনেক কষ্ট হয়েছে অসুস্থ শরীর নিয়ে। তিনবার গাড়ি পাল্টেছি, টাকাও বেশি খরচ হয়েছে।’ তিনি জানান, মানিকগঞ্জ থেকে আসার পথে রাস্তায় কোথাও পুলিশকে আটকাতে দেখেননি।

নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, দূরপাল্লার কোনো বাস প্রবেশ না করলেও মানুষ ঠিকই প্রবেশ করছে। সেখান থেকে যাত্রী নিয়ে রাজধানীতে আসা যাওয়া করছে বাসগুলো। প্রতিটি বাসই অতিরিক্ত যাত্রী বহন করছে।

একই চিত্র গাজীপুর থেকে ঢাকামুখী সড়কের। সেখানে গাড়ির সংখ্যা কম দেখা গেলেও মানুষ আসছে ঢাকার দিকে। বাবুবাজার ব্রিজ, পোস্তগোলা ব্রিজ ও শনির আখড়ায়ও একই অবস্থা।

ঢাকার প্রবেশমুখগুলোতে কঠোর অবস্থানে ছিল গাজীপুর জেলা প্রশাসন। জেলা দিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করার প্রতিটি রাস্তায়ই বসানো হয়েছিল চেক পোস্ট। যেখানে জরুরি সেবা ছাড়া কোনো পরিবহন প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি ঢাকায়। এতে নরসিংদী থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত লেগে যায় বিশাল জ্যাম। সেই জ্যাম ঠেলেই ঢাকায় প্রবেশ করতে হয় জরুরি কাজে আসা মানুষদের।

সরেজমিন দেখা গেছে, আবদুল্লাপুর মোড়ের ঢাকার পরিবহনগুলো তাদের গতিপথ পরিবর্তন করে আবার ঢাকায় ঢুকছে। ব্যক্তিগত গাড়ি ও পণ্য পরিবাহী ট্রাক, পিকআপ টঙ্গী ব্রিজ পার হলেও বাধার মুখে পড়ছে পুলিশ চেকপোস্টে। সেখানে অবস্থান নিয়েছেন ম্যাজিস্ট্রেট সাব্বির আহমেদ। বেশি কড়াকড়ি আরোপ করায় ব্যক্তিগত গাড়ি বা অফিসিয়াল গাড়িতে একজনের যাতায়াতও বাধা দেয়া হয়েছে। টঙ্গী ব্রিজের আগে আব্দুল্লাহপুর অংশ থেকে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। বেশিরভাগই ব্যক্তিগত গাড়ি বা মাইক্রো। অধিকাংশ গাড়ির উপরে বিভিন্ন কোম্পানির স্টিকার লাগানো।

অন্যদিকে নরসিংদী থেকে কাঁচপুর ব্রিজ পর্যন্ত ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডেও দীর্ঘ জ্যামে আটকে থাকা অধিকাংশ গাড়িই ছিল প্রাইভেট, মাইক্রো, ট্রাক কিংবা কাভার্ডভ্যান।

সিলেট থেকে ঢাকায় আসা নাজনিন আক্তার বলেন, জরুরি কাজে সিলেট গিয়েছিলাম সেখানে গিয়ে লকডাউনে আটকা পড়েছি। বাধ্য হয়ে প্রাইভেট গাড়ি নিয়ে অতিরিক্ত খরচে ঢাকায় আসতে হয়েছে। কিন্তু রাস্তায় তীব্র জ্যামের কবলে পড়তে হয়েছে। নরসিংদী থেকে কাঁচপুরে আসতে সময় লেগেছে ৫ ঘণ্টা।

গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, গাজীপুরে লকডাউনের তৃতীয় দিনে ঢাকা-ময়মনসিংহ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কসহ নগর ও জেলার অভ্যন্তরীণ সড়কে বাস চলাচল বন্ধ থাকলেও চলাচল করছে নানা ধরনের হালকা যানবাহন। সিএনজি অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইকসহ নানা ধরনের হালকা যানবাহন এমনকি পিকআপ ভ্যানে করেও লোকজনকে চলাচল করতে দেখা গেছে।

দূর-দূরান্তের জেলা থেকে বাসে এসে গাজীপুর জেলার বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় নেমে তারা বিকল্প উপায়ে জেলা পাড়ি দিচ্ছেন। গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা থেকে টঙ্গী ব্রিজ পর্যন্ত ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কে বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দ থাকায় যানজটে পরিণত হয়।

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি জনান, সরেজমিন বুধবার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে দেখা যায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার মানুষ মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল, মাহিন্দ্র, অটোরিকশায় করে দৌলতদিয়া ঘাটে এসে নামছেন। প্রতিটি ঘাটেই ছিল ফেরি। ঘাটে নেমেই সরাসরি ফেরিতে উঠতে এসব মানুষকে কোনো বেগ পেতে হচ্ছে না।

ঢাকা থেকেও মানুষ ছুটছেন বাড়িতে। ঘাটে আসা যশোরের আলাউদ্দিন স্ত্রী সন্তান নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। তিনি জানান, লকডাউন ঈদ পর্যন্ত চলতে পারে তাই আগে-ভাগেই স্ত্রী সন্তানকে বাড়ি রেখে আসতে যাচ্ছি। গাবতলী থেকে কোনো যানবাহন না পেয়ে জনপ্রতি ৫০০ টাকা করে ভাড়া দিয়ে প্রাইভেটকারে করে পাটুরিয়া ঘাট হয়ে ফেরিতে দৌলতদিয়া ঘাটে এসে পৌঁছেছি। এখন নিরাপদে বাড়িতে পৌঁছাতে পারলেই হলো।

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মানিকগঞ্জের প্রবেশদ্বার আরিচা এবং পাটুরিয়া ফেরিঘাটে জরুরি পণ্যবাহী ট্রাক এবং অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া কোনো যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে না। রাজধানী ঢাকা থেকে মানিকগঞ্জে ঢুকার প্রবেশদ্বার বারবাড়িয়া এবং ধল্লা এলাকায় পুলিশ তৎপর ভূমিকা পালন করছে, এতে কাউকেই জেলাতে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। ভিন্ন পথে কেউ কেউ ঢুকে পড়লেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

জেলার অভ্যন্তরীণ রুটে সিএনজি এবং ইঞ্জিনচালিত ভ্যানে যাত্রী পারাপার করা হচ্ছে। উপায় না পেয়ে যাত্রীরা ঝুঁকি নিয়ে এসব যানবাহনে ছুটছেন গন্তব্যে।

মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) ভাস্কর সাহা বলেন, জেলার প্রবেশমুখ বারবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড, সিংগাইরের ধল্লা, মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড, জেলা শহরের খালপাড়, জরিনা কলেজ মোড়, বরংগাইল বাসস্ট্যান্ড, আরিচা-পাটুরিয়া ঘাট এলাকায় পুলিশের চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। সাধারণ মানুষ বিভিন্ন অজুহাতে বাইরে বের হচ্ছেন। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে বিকল্প পন্থায় যাত্রীরা পাটুরিয়া ঘাটে যাচ্ছেন বলে জানান তিনি।


poisha bazar

ads
ads