উৎকণ্ঠায় বিচ্ছিন্ন ঢাকা


  • সেলিম আহমেদ
  • ২২ জুন ২০২১, ০৯:১৬,  আপডেট: ২২ জুন ২০২১, ০৯:৩৩

ভারতের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট আঘাত হানার পর দেশে ফের ভয়াবহভাবে করোনার পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। ইতোমধ্যে সীমান্তের জেলাগুলোকে বিপর্যস্ত করে ঢাকায় আবারো চোখ রাঙাতে শুরু করেছে প্রাণঘাতী এই ভাইরাসটি। এবার এক সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীতে সংক্রমণের হার বেড়েছে প্রায় আড়াইগুণ।

সর্বশেষ সোমাবর শনাক্তের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ১৪ শতাংশে। যা আগেরদিন ছিল ৯ দশমিক ৬ শতাংশ। পরিস্থিতির অবনতি হওয়া ঢাকায় সপ্তাহখানেকের মধ্যে তৃতীয় ঢেউ দেখা দেয়ার আশঙ্কা করছে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এমন পরিস্থিতিতে ঢাকাকে সারা দেশ থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নিয়েছেন সরকার। রাজধানীর পার্শ্ববর্তী ৪ জেলাসহ সাত জেলায় এক সপ্তাহের কঠোর লকডাউন দেয়া হয়েছে। অতি প্রয়োজন ছাড়া এসব জেলা থেকে যে কারো ঢাকায় প্রবেশে দেয়া হয়েছে নিষেধাজ্ঞা।

সোমবার দুপুরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জরুরি বৈঠক শেষে এক ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, মঙ্গলবার (আজ) থেকে রাজধানীর পার্শ্ববর্তী জেলা নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জে এক সপ্তাহের জন্য কঠোর লকডাউন থাকবে।

পাশাপাশি ঢাকার অদূরের মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, রাজবাড়ীতেও লকডাউন থাকবে। লকডাউনকৃত এলাকায় জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ চলাচলও করতে পারবেন না। এসব জেলার মানুষ ঢাকায় ঢুকতে পারবেন না। ঢাকার সঙ্গে মুভমেন্ট বন্ধ হলে এমনিতেই সংক্রমণ সারা দেশে কমে যাবে।

জেলাগুলোতে কী কী বন্ধ থাকবে, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সবকিছু বন্ধ থাকবে। মানুষও যাতায়াত করতে পারবে না। মালবাহী ট্রাক এবং অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া কিছুই চলবে না। ৭ জেলায় সরকারি-বেসরকারি অফিস বন্ধ থাকবে কি না-জানতে চাইলে তিনি বলেন, বলেই তো দিয়েছি, সব বন্ধ, শুধুমাত্র কয়েকটা সার্ভিস ছাড়া।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জেলাগুলো বøকড থাকবে, কেউ ঢুকতে পারবে না। ঢাকায় করোনার আরেকটি ঢেউ দেখা দেয়ার আশঙ্কা করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর পাশাপাশি রাজধানী ঢাকায় যেভাবে সংক্রমণ বাড়ছে, তাতে ঢাকায় করোনা ভাইরাসের আরেকটি ঢেউ আঘাত হানার আশঙ্কা রয়েছে। রাজধানীর পরিস্থিতি গত মার্চ-এপ্রিলের মতো হতে পারে। চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিল মাসে করোনা ভাইরাসে দ্বিতীয় ঢেউয়ের আঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল রাজধানীর স্বাস্থ্যব্যবস্থা। তখন করোনা রোগীদের হাসপাতালে ঠাঁই পাওয়াটাই দুষ্কর হয়ে পড়ে।

স্বাস্থ্য অধিদফতর ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ার পর প্রথমেই করোনার হটস্পট হয়ে উঠে সীমান্তের জেলাগুলো। প্রথমেই সবচেয়ে বিপর্যস্ত করে সীমান্তের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জকে। যেখানে শনাক্তের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৭০ শতাংশে। এরপর চাঁপাইয়ের অবস্থার উন্নতি হলে আঘাত আনে খুলনা ও রাজশাহী বিভাগে। বর্তমানে বিভাগ দুটির অবস্থা একবারেই নাজুক। সেখানে প্রতিদিনই বাড়ছে রোগীর চাপ।

সর্বশেষ সোমবার খুলনা বিভাগে ৩১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশ হয়েছে। রাজশাহী বিভাগে ২২ দশমিক ৩১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৪ দশমিক ১৮ শতাংশ হয়েছে। অব্যহত রোগীর চাপ বাড়ায় ভেস্তে পড়েছে সেখানকার চিকিৎসা সেবা। অনেক হাসপাতালেই নির্দিষ্ট আসন থেকে অতিরিক্ত রোগী ভর্তি হওয়ার মেঝেতে রেখে চলছে চিকিৎসা। কোনো কোনো হাসপাতালে নতুন রোগী ভর্তি রাখা বন্ধ রয়েছে। এই একদিনে করোনায় আক্রান্ত হয়ে রাজশাহীতে ১৫ জন ও খুলনায় ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে গত কয়েক সপ্তাহের প্রতিকূল অবস্থা কাটিয়ে সীমান্তের কোনো কোনো জেলা যখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল ঠিক তখনি ঢাকায় দেখা দিয়েছে পরিস্থিতির অবনতি। গত সপ্তাহে যেখানে শনাক্তেও হার ছিল ৫ শতাংশে তা গতকাল বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ১৪ শতাংশে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন চার হাজার ৬৩৬ জন। যা আগের দিনের চেয়ে প্রায় এক হাজার বেশি। আর মৃত্যু হয়েছে ৭৮ জনের।

এ প্রসঙ্গে জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. আবু জামিল ফয়সাল মানবকণ্ঠকে বলেন, ঢাকার বাইরে যেভাবে সংক্রমণ বেড়েছিল ঠিক একইভাবে ঢাকায়ও সংক্রমণ বাড়ছে। আমরা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে আছি। কেউ স্বাস্থ্যবিধি মানছি না। আমি আশঙ্কা করছি যে, আগামী তিন থেকে চার দিনের মধ্যে ঢাকা শহরে ভাইরাসের সংক্রমণ খুলনা বা রাজশাহীর মতোই খারাপ হয়ে যেতে পারে।

তিনি বলেন, আমরা আগেই ধারণা জুলাইয়ের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে করোনার তৃতীয় ঢেউ আসতে পারে। এখন সংক্রমণের গতি দেখে মনে হচ্ছে জুলাইতে যাওয়ার আগেই তৃতীয় ঢেউ ঘটে যাবে। এই অবস্থায় যেসব এলাকা লকডাউন দেয়া হয়েছে তা পুরোপুরিভাবে কার্যকর করতে হবে। সবাইকে সম্পৃক্ত করে কাজ করতে হবে। তাহলে চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার মতো সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভাব হবে।

যা থাকবে লকডাউনে: সোমবার দুপুরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসন সমন্বয় অধিশাখার উপ-সচিব মো. রেজাউল ইসলাম স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, করোনা ভাইরাস সংক্রমণের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় ২২ জুন সকাল ৬টা থেকে ৩০ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ী এবং গোপালগঞ্জ জেলায় সার্বিক কার্যাবলি/চলাচল (জনসাধারণের চলাচলসহ) বন্ধ থাকবে।
এ সময়ে শুধু আইনশৃঙ্খলা এবং জরুরি পরিষেবা যেমন: কৃষি উপকরণ (সার, বীজ, কীটনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি), খাদ্যশস্য ও খাদ্যদ্রব্য পরিবহন, ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা, কোভিড-১৯ টিকা প্রদান, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস/জ্বালানি, ফায়ার সার্ভিস, বন্দরসমূহের নদীবন্দর) কার্যক্রম, টেলিফোন ও ইন্টারনেট (সরকারি-বেসরকারি), গণমাধ্যম (প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া), বেসরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ডাক সেবাসহ অন্যান্য জরুরি ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও সেবা সংশ্লিষ্ট অফিস, তাদের কর্মচারী, যানবাহন এবং পণ্যবাহী ট্রাক, লরি নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে।

লকডাউনকৃত এলাকায় নৌ চলাচল বন্ধ: লকডাউনকৃত ৭ জেলার মধ্যে যেসব এলাকায় নৌপথ রয়েছে সেসব এলাকায় সকল ধরনের নৌযান (লঞ্চ/স্পিডবোট/ট্রলার) বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ। পণ্য পরিবহন এবং জরুরি সেবা প্রদানকারী নৌযানের ক্ষেত্রে এই আদেশ কার্যকর হবে না।

নৌনিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঢাকা-মাদারীপুর, ঢাকা-মিরকাদিম/মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ/চাঁদপুর/নাড়িয়া, শিমুলিয়া (মুন্সীগঞ্জ)-বাংলাবাজার (মাদারীপুর)/মাঝিকান্দি (শরিয়তপুর), আরিচা (মানিকগঞ্জ)-কাজিরহাট, পাটুরিয়া (মানিকগঞ্জ)-দৌলতদিয়া (রাজবাড়ী) নৌপথসহ উল্লেখিত জেলার সংশ্লিষ্ট নৌপথে সকল ধরনের যাত্রীবাহী নৌযান আজ সকাল ৬টা থেকে ৩০ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।


poisha bazar

ads
ads