বস্তিতে আগুন: তবুও ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন


  • শাহীন করিম
  • ০৯ জুন ২০২১, ১১:২৭

অনেক বছরের ঘাম আর শ্রমে তিলে তিলে গড়েছিলেন স্বপ্নের ঘর। হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের টাকায় সেই ঘরে ছিল টিভিসহ যাবতীয় আসবাবপত্র। কারো ব্যবসার টাকা, কারো রিকশা কিংবা দোকান।

গত সোমবার ভোরে লাগা রহস্যজনক আগুনে পুড়ে সব ছাই হয়ে যায়। স্বপ্ন যখন পুড়ে যায় চোখের পলকে, তখন শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা ছাড়া কিছুই আর করার ছিল না মহাখালীর সাততলা বস্তির হাজারো খেটে খাওয়া মানুষের। ঘরের সঙ্গে সঞ্চয়ও পুড়ে যাওয়ায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন হতদরিদ্র মানুষগুলো। কোথায় যাবেন ও কি করবেন বুঝতে পারছেন না তারা। তবু ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন।

মঙ্গলবারও কেউ কেউ ধ্বংসস্ত‚পের মধ্যে খুঁজে বেরিয়েছেন শেষ সম্বল বলতে কিছু আছে কিনা। ওই অগ্নিকাণ্ডকে রহস্যজনক দাবি করে কয়েকজন বস্তিবাসী আক্ষেপ করে বলেন, গত বছরের নভেম্বর মাসেও এই বস্তিতে আগুন লেগে অনেক ঘর পুড়ে যায়। কেন আমাদের নিয়ে এমন নিষ্ঠুর খেলা চলে?

মাত্র সাত মাসের ব্যবধানে আবারো পুড়ে ছাই হয় সাততলা বস্তির তিনশ’র বেশি ঘর। পার্শ্ববর্তী একটি হাসপাতালে আশ্রয় নিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে গতকাল ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসীদের পরিবার প্রতি ৫ হাজার টাকা করে নগদ টাকা ও খাদ্য সহায়তা দেয়া হয়েছে। ঘর তোলা জন্য টিনও দেয়া হবে। বস্তির আশপাশে ফায়ার হাইড্র্যান্ট স্থাপন করা কথা জানিয়েছেন মেয়র আতিকুল ইসলাম।

এদিকে মহাখালীর সাততলা বস্তিতে আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বস্তিবাসীদের জন্য স্থায়ী আবাসনের দাবি জানান। আগুন লাগার যথাযথ কারণ উদ্ঘাটনে সুষ্ঠু তদন্তেরও দাবি জানান এই বিএনপি নেতা।

সোমবারের মতো দুপুরেও মহাখালীর সাততলা বস্তিতে অসংখ্য মানুষকে ছাইয়ের মধ্যে তাদের স্বপ্ন খুঁজতে দেখা গেছে। তিন শতাধিক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার তাদের সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত শেলি বেগম জানান, এই বস্তিতেই জন্ম। স্বামীর মৃত্যুর পর দুই ছেলে মেয়েকে নিয়ে থাকতেন মহাখালী সাততলা বস্তিতে। বিভিন্ন এনজিওর কাছ থেকে ঋণ করে ধীরে ধীরে সাজিয়ে ছিলেন সংসার। কিন্তু লোন পরিশোধ হতে না হতেই ঘরের সব আসবাবপত্র পুড়ে গেছে। ঘরে নগদ ১০ হাজার টাকা ছিল, তাও পুড়ে গেছে।

সেখানকার আরেক বাসিন্দা সীমা বেগম জানান, তার স্বামী কামাল রিকশা চালান। তিনি নিজে বাসা-বাড়িতে কাজ করেন। সন্তান আর স্বামীকে নিয়ে তার দুই ঘরে আট সদস্যের সংসার। রবিরার রাতে সবাই একসঙ্গেই ঘুমিয়েছিলেন। ভোরের দিকে দেখলেন পরনের কাপড় ছাড়া আর কিছু নেই তাদের। ঠাঁই হয়েছে খোলা আকাশের নিচে।

এই নারী বলেন, এখন কী করবেন, কার কাছে যাবেন, কিছু বুঝতে পারছেন না। কিন্তু বেচে থাকার জন্য তো ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। একাধিক বস্তিবাসী দাবি করেন, বলা হচ্ছে গ্যাস কিংবা বিদ্যুৎ থেকে আগুন লেগেছে। কিন্তু তারা এটা বিশ্বাস করেন না। মনে করেন, তাদের তাড়িয়ে দিতে কোনো মহল আগুন লাগিয়ে দিতে পারে। নিরপেক্ষ তদন্ত হলে সেটিই উঠে আসবে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র ইতোমধ্যে তাদের টিন, নগদ টাকা ও আপদকালীন খাবারের নিশ্চয়তা দিয়েছেন। তবে তাদের দুর্দশা বাড়িয়েছে বৃষ্টি। খোলা আকাশের নিচে তারা নারী ও শিশু নিয়ে অবস্থান করছেন। বস্তির পাশে কয়েকটি হাসপাতালের আঙিনা ও বারান্দায় কয়েকজনের জায়গা হলেও সেখানে এত মানুষের সংকুলান হচ্ছে না।

রবিবার ভোর রাত ৪টার দিকে সাততলা বস্তিতে আগুনের সূত্রপাত। একের পর এক ঘরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের প্রচেষ্টায় প্রায় তিন ঘণ্টা পর সকাল ৭টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ততোক্ষণে প্রায় তিন শতাধিক ঘর পুড়ে যায়।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, ওই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের পর কাজ শুরু করেছে। প্রতিবেদন হাতে পেলে আগুন লাগার কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিশ্চিত করে বলা যাবে। তিনি বলেন, বস্তিতে প্রচুর পরিমাণে অবৈধ গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই দুটোর যে কোনো একটি থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে।



poisha bazar

ads
ads