১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ গিলে খাচ্ছে বনখেকোরা!


  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ২৪ মে ২০২১, ০৮:৪১

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণাধীন বন বিভাগের ১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ দীর্ঘদিন ধরে বেদখল করে রেখেছে বনখেকোরা। প্রভাবশালী এসব দখলদারদের কবল থেকে রক্ষা পায়নি সংরক্ষিত বনভূমিও। প্রায় আড়াই লাখ একর জমি দখল করে শিল্প প্রতিষ্ঠানসহ নানা স্থাপনা গড়ে তোলা হলেও এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ কিংবা উচ্ছেদ কার্যক্রম কোনোটাতেই তোড়জোড় নেই সংশ্লিষ্টদের।

এ সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি বিষয়টি নিয়ে বার বার মন্ত্রণালয়কে তাগাদা দেয়ার পর উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করা হলেও এখন তাতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। কিছু জমি অবশ্য উদ্ধার করা হয়েছে; তবে তা এক শতাংশেরও কম।

তথ্যানুযায়ী, দেশে মোট বনভূমির পরিমাণ ৪৬ লাখ ৪৬ হাজার ৭০০ একর। এরমধ্যে ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৫৮ একর বনভূমি অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন ১ লাখ ৬০ হাজার ৫৬৬ জন। এসব ভূমি দখল করে ঘরবাড়ি নির্মাণ, কৃষিকাজ থেকে শুরু করে তৈরি করা হয়েছে শিল্পকারখানা।

দখলদারদের থেকে রক্ষা পায়নি সংরক্ষিত বনভূমিও। ৮৮ হাজার ২১৫ জন দখলে করে রেখেছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬১৩ দশমিক শূন্য ছয় একর। অবৈধ দখলে থাকা এসব বনভূমির মধ্যে এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়েছে মাত্র ৮৩৬ একর।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বন বিভাগের দেয়া এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, সংরক্ষিত বন দখল করে স্থায়ী স্থাপনাসহ শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা করেছেন ১৭২ জন। তারা ৮২০ একর সংরক্ষিত বন দখল করে রেখেছেন। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, যেমন হাট-বাজার, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কটেজ, ফার্ম, রিসোর্ট ইত্যাদি করে ৪ হাজার ৯১৪ একর বন দখল করেছেন ৩ হাজার ৩২৯ জন। সংরক্ষিত বনে ঘরবাড়ি করেছেন ৫৮ হাজার ৪০৭ জন। স্থায়ী স্থাপনা না করে কৃষিকাজ, বাগান ইত্যাদি করে বন দখলে রেখেছেন ২৬ হাজার ৩০৭ জন।

সংরক্ষিত বন বাদে অন্যান্য শ্রেণিভুক্ত বনভূমির মধ্যে ৯০১ একর বনভূমি দখল করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা করেছেন ১২৭ জন। বনের জায়গায় অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, যেমন হাট-বাজার, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কটেজ, ফার্ম ইত্যাদি করে বন দখল করেছেন ২ হাজার ২২৭ জন। ঘরবাড়ি, বসতভিটা করেছেন ৫২ হাজার ৪২৯ জন। স্থায়ী স্থাপনা না করে বনের জমি দখলে রেখেছেন ১৭ হজার ৫৬৮ জন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে এই দখলদারি। এতে স্থানীয় প্রভাবশালী, রাজনৈতিক প্রভাবশালী, এমনকি এনজিও প্রভাবশালীরাও বড় ভূমিকা রেখেছে। ব্রিটিশ আমলে যে সিএস রেকর্ড করা হয়, তাতে বন বিভাগের জমির মোটামুটি সঠিক পরিমাণ জানা যায়। এরপর এসএ, আরএস বা বিএস জরিপে কেবলই কমেছে বন বিভাগের জমি। বনের জমি রেকর্ড করা হয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে। আবার ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত বনভূমি (সংরক্ষিত বনভূমি ছাড়া অন্যান্য, যেমন-রক্ষিত, অর্পিত বনভূমি) অনেক ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বন্দোবস্ত দিয়েছে।

জানা গেছে, অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে অতীতে বন বিভাগ অনেক মামলা করেছে। অনেক দিন ধরেই সেসব মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। মামলা পরিচালনায় সংশ্লিষ্টদের গাফিলতির কারণেও অনেক মামলায় কোনো ফলোদয় হয়নি।

এ বিষয়ে প্রধান বন সংরক্ষক জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে অবৈধ দখলে থাকা এক লাখ ৩৮ হাজার একর বনভ‚মি উদ্ধারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ভারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৮২০ একরে। তার পরও এক লাখ ১৯ হাজার একর জমি অবৈধ দখল উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে যাবে।

এদিকে সংসদীয় কমিটি জবরদখল হওয়া জমি উদ্ধারে আগের কার্যক্রম খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে। দখলদারদের নোটিশ দেয়া হয়েছে কি না, দিয়ে থাকলে সেগুলোর তালিকা আর না দিয়ে থাকলে তার কারণ জানতে চাওয়া হচ্ছে। অবৈধ দখল করা বনভ‚মি বন্ধক দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে থাকে, তবে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের শরণাপন্ন হতে বলেছে সংসদীয় কমিটি।

এ বিষয়ে সংসদীয় কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, যারা বনের জমি নিজেদের দেখিয়ে ঋণ নিয়েছে, তারা জালিয়াতি করেই নিয়েছে। আমরা মন্ত্রণালয়কে বলেছি, এরকম ঘটনার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করতে হবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সহায়তা নিতে হবে।



poisha bazar

ads
ads