স্বপ্নের সমান্তরালে পদ্মা সেতু


  • সেলিম আহমেদ
  • ০৬ মে ২০২১, ১১:৪৬

প্রমত্তা প্রদ্মার বুকে স্বগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর সর্বশেষ স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে নানা বাধা ও আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে জোড়া লেগেছিল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষের দীর্ঘ দিনের লালিত সেই স্বপ্ন।

সফলতার মাইলফলক স্পর্শ করে বাংলাদেশ। এবার অপেক্ষা শুধু সেতুতে যান চলাচলের। সেই লক্ষ্যে চলছে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। চলমান করোনা মহামারীতেও কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে পদ্মায় কাজ চলছে তিন শিফটে।

প্রকল্পের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৮৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। এরমধ্যে মূল সেতুর কাজের অগ্রগতি হচ্ছে ৯৩ দশমিক ২৫ শতাংশ, নদীশাসনের অগ্রগতি ৮৩ শতাংশ আর রেল প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে ৬০ শতাংশ। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী বছরের জুন মাসে স্বপ্নের পদ্মা সেতু যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে বলে জানালেন সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন।

তিনি বলেন, সেতুর কাজ চলছে দ্রুত গতিতেই। করোনা মহামারীর সময়েও কাজ বন্ধ নেই। সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে দিনে-রাতে কাজ চলছে। তিনি বলেন, আগামী বছরের জুন মাসে স্বপ্নের পদ্মা সেতু যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে।

পদ্মা সেতু চালুর দিনই সেতু দিয়ে রেল চলাচল শুরু করতে পাল্লা দিয়ে চলছে রেল সংযোগ প্রকল্পের কাজও। রেল ও সড়ক পথ একই দিনে চালু হবে বলে জানিয়ে রেলপথমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজন বলেন, আগামী বছরের মাঝামাঝি যখন পদ্মা সেতু যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে ঠিক একই দিনে সেতুর উপর দিয়ে রেলপথও চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। অর্থাৎ একই দিনে পদ্মা সেতুর রেল ও সড়ক পথ চালু হবে।

তবে তখন শুধু ভাঙ্গা থেকে সেতু পার হয়ে মাওয়া পর্যন্ত রেল আসবে জানিয়ে তিনি বলেন, মাওয়া থেকে ঢাকা পর্যন্ত রেল প্রকল্পের কাজও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। শিগগিরই এই কাজও শেষ হবে। সে লক্ষ্যে এখন কাজ এগিয়ে চলেছে। এ পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৬০ শতাংশ। আর ৪০ শতাংশের কাজও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হবে।

সরেজমিন মঙ্গলবার পদ্মা সেতু প্রকল্পে গিয়ে দেখা গেছে, করোনা মহামারীর ঊর্ধ্বগতির মধ্যেও সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে রোড স্ল্যাব ও রেলওয়ে স্ল্যাব বসানোর কাজ। পদ্মা সেতুর মাদারীপুরের জাজিরাপ্রান্ত থেকে উঠে পায়ে হেঁটেই পৌঁছা গেল একেবারে মাওয়া প্রান্তের ১৩ নম্বর পিয়ার (পিলার) পর্যন্ত। এই অংশের সড়ক ও রেলওয়ে স্ল্যাব বসানোর কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। ১৩ নম্বর পিয়ার থেকে ৯ নম্বর পর্যন্ত অংশ ফাঁকা রয়েছে। এখানে স্ল্যাব বসানোর কাজ চলছে।

অপরদিকে মাওয়া প্রান্ত থেকেও সড়ক এবং রেলওয়ে স্ল্যাব বসানোর কাজ বহু দূর এগিয়ে গেছে। মাঝে কয়েকটি পিয়ার বাকি আছে। দু’তলা বিশিষ্ট এই সেতুর উপরের অংশে চলাচল করবে যানবাহন। নিচের অংশে চলবে ট্রেন। সড়ক সেতু চার লেন বিশিষ্ট হলেও ট্রেন লাইন থাকছে মাত্র একটি লাইন।

গত ১ মে প্রকাশিত পদ্মা সেতু প্রকল্পের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, এই মুহূর্তে প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি হচ্ছে ৮৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। এরমধ্যে মূল সেতুর কাজের অগ্রগতি হচ্ছে ৯৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। মূল সেতুর সড়ক পথের জাজিরা থেকে মাওয়া পর্যন্ত মোট ২ হাজার ৯১৭টি সø্যাব বসানো হবে। ইতোমধ্যে ২ হাজার ৩৮৭টি স্ল্যাব বসানো হয়ে গেছে। বসানোর বাকি আছে মাত্র ৫৩০টি স্ল্যাব।

অর্থাৎ রোড স্ল্যাব বসানোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে ৮২ শতাংশ। অপরদিকে রেলওয়ের ট্র্যাক স্থাপনের জন্য রেলওয়ে স্ল্যাব বসবে ২ হাজার ৯৯৫টি। এরমধ্যে ২৫৭০টি স্ল্যাব বসানো সম্পন্ন হয়েছে। বাকি আছে ৪২৫টি স্ল্যাব। রেলওয়ে অংশে স্ল্যাব বসানোর কাজ শেষ হয়েছে শতকরা ৮৭ শতাংশ। স্ল্যাব বসানোর পাশাপাশি এখন সেতুর উপরের অংশে অর্থাৎ সড়কভাগে দুই পাশে প্যারাপেট ওয়াল (সাইট ওয়াল) বসানোর কাজ চলছে।

ইতোমধ্যে ৮২৪টি প্যারাপেট ওয়াল বসানো হয়েছে। এ কাজের অগ্রগতি শতকরা ৭ ভাগ। এছাড়া মাওয়া ও জাজিরা ভায়াডাক্টে ৪৩৮টি সুপারটি গার্ডারের মধ্যে ৪৩৫টি স্থাপন করা হয়ছে। স্থাপনের বাকি আছে মাত্র তিনটি। অর্থাৎ ৯৯ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। একইভাবে ৮৪টি রেলওয়ে আই গার্ডারের বকটি ইতোমধ্যে স্থাপন করা হয়েছে।

নদীশাসনের কাজও ৮৩ শতাংশ শেষ হয়েছে। সরেজমিন পদ্মা সেতু প্রকল্পের জাজিরা প্রান্তে দেখা গেছে, ৪২ নম্বর পিয়ারের নিচে বিশাল এলাকাজুড়ে নদী শাসনের কাজ প্রায় শেষ হয়ে গেছে। প্রসঙ্গত, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলাকে রাজধানীসহ সারাদেশে দেশের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল খরস্রোতা নদী পদ্মা। সেসব অঞ্চলের প্রত্যাশিত উন্নয়নের সামনে বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিল নদীটি।

আর সেই কারণেই স্বাধীনতার পূর্বকাল থেকেই দক্ষিণাঞ্চলের আপামোর মানুষ স্বপ্ন দেখতেন একটি সংযোগ সেতুর। দেশ স্বাধীন হলো, সরকার এলো, সরকার গেল- কেউ পূরণ করতে পারলো না দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের এই স্বপ্ন। অবশেষে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসেই পদ্মা সেতুর স্বপ্ন দেখালেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বিশ্বব্যাংকের অযাচিত টালবাহানাসহ নানা প্রতিকূলতা কাটিয়ে স্বপ্নকে রূপ দিলেন বাস্তবে। সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে গত ডিসেম্বরেই অবয়ব পায় সারাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত সেই স্বপ্ন। সেতুটি খুলে দিলে দূরত্ব কমবে এক অঞ্চলের সঙ্গে অন্য অঞ্চলের। দুই অঞ্চলের অর্থনীতিতেই ঘটবে উল্লম্ফন। সেই সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতিও লাভবান হবে বলে আশা করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।

 



poisha bazar

ads
ads