করোনাকালে এক ডজন এমপি হারিয়েছে জাতীয় সংসদ


poisha bazar

  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ০৪ মে ২০২১, ১২:৫০

বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকালে প্রায় এক ডজন সদস্যকে হারিয়েছে জাতীয় সংসদ। মহামারী ঠেকানোর কঠিন লড়াইয়ে নেমে প্রাণ সংহার হয়েছে চারজনের। বাকিরা সবাই অন্যান্য রোগ ও বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান।

এতো অল্প সময়ে এতোসংখ্যক এমপির মৃত্যু জাতীয় সংসদের ইতিহাসে রেকর্ড। মৃত্যুবরণকারী এমপিদের মধ্যে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও মঈন উদ্দীন খান বাদল ছাড়া সবাই আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি। যে কারণে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ শোকে বিহ্বল সহকর্মী এমপিরাও।

এদিকে মৃৃত্যুজনিত কারণে আসন শূন্য হওয়ায় করোনার মধ্যেই এসব আসনে উপ-নির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়েছে নির্বাচন আয়োজনকারী সংস্থা নির্বাচন কমিশনকে (ইসি)। করোনার মৃত্যুর মিছিলের মধ্যেই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে উপ-নির্বাচন করতে হয়েছে ইসিকে। সঙ্গতকারণেই এতো অল্প সময়ে এতোগুলো আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠানে ইসিরও রেকর্ড অর্জিত হয়েছে। এরআগে দেশে নিকট অতীতে একই বছরে এত উপনির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো রেকর্ড নেই।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, বৈশ্বিক মহামারী করোনা সংক্রমণের এ বছরে নির্বাচন কমিশনকে ১১টি সংসদীয় আসনে উপনির্বাচন করতে হয়েছে। এরমধ্যে ৯টির উপনির্বাচন হয়েছে করোনার ঝুঁকি নিয়েই। যেসব আসনে উপনির্বাচন হয়েছে তার মধ্যে ১০টিতে হয়েছে সংশ্লিষ্ট আসনের এমপি মারা যাওয়ায়। বাকি একটিতে এমপি পদত্যাগ করায় সেখানে উপনির্বাচন করতে হয়েছে।

সংশিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মহামারী করোনা ভাইরাস কেড়ে নিয়েছে চলতি সংসদের সিনিয়র তিন এমপি ও একজন প্রতিমন্ত্রীকে। হতভাগ্য এমপিদের মধ্যে রয়েছেন- সিরাজগঞ্জ-১ আসনের এমপি ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, কুমিল্লা-৫ আসনের পাঁচবারের এমপি, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু, নওগাঁ-৬ আসনের এমপি ইসরাফিল আলম। আর প্রতিমন্ত্রী হচ্ছেন- ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মুহম্মদ আবদুল্লাহ।

তথ্যমতে, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ১৪ এপ্রিল মারা যান কুমিল্লা-৫ আসনের পাঁচবারের এমপি, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু। গত বছরের ১৪ জুন করোনায় আক্রান্ত হয়ে একই দিনে মারা যান সিরাজগঞ্জ-১ আসনের এমপি ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এবং ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মুহম্মদ আবদুল্লাহ। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে তার নির্বাচনী এলাকার (টুঙ্গিপাড়া-কোটালীপাড়া) দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। সময় না হওয়ায় আব্দুল মতিন খসরুর আসনে উপ-নির্বাচনের দিনক্ষণ ঠিক হয়নি এখনো। তবে করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারী মোহাম্মদ নাসিমের সিরাজগঞ্জ-১ আসনে গত ১২ নভেম্বর উপ-নির্বাচন সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন।

গত বছরের শুরুতেই (২০২০ সালের জানুয়ারি) পরপর তিনজন এমপি মারা যান। তাদের মধ্যে ৯ জানুয়ারি বাগেরহাট-৪ আসনের মো. মোজাম্মেল হোসেন, ১৮ জানুয়ারি বগুড়া-১ আসনের আবদুল মান্নান এবং ২১ জানুয়ারি যশোর-৬ আসনের ইসমাত আরা সাদেক মারা যান। আসনগুলো শূন্য হওয়ায় ওই বছরের ২১ মার্চ বাগেরহাট-৪ ও ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচন সম্পন্ন করে ইসি। তবে মৃত্যুজনিত কারণে নয়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে নির্বাচন করার কারণে ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস সংসদ সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করায় তার আসনটি ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর শূন্য হয়।

এদিকে ২৯ মার্চ ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারণ করে যশোর-৬ ও বগুড়া-১ আসনের উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। তবে করোনা সংক্রমণের কারণে শেষ সময়ে এসে নির্বাচন স্থগিত হয়। ২০২০ সালের ১৪ জুলাই এ দুটি আসনে ভোট হয়। গত বছরের ২৭ জুলাই করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান নওগাঁ-৬ আসনের এমপি ইসরাফিল আলম। শূন্য হওয়া এ আসনটিতে গত ১৭ অক্টোবর উপনির্বাচন সম্পন্ন করে ইসি।

পাবনা-৪ আসনের এমপি, সাবেক মন্ত্রী, পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা? শামসুর রহমান শরীফ ডিলু অসুস্থ হয়ে মারা যান গত বছরের ২ এপ্রিল। একই বছরের ৬ মে মারা যান ঢাকা-৫ আসনের এমপি হাবিবুর রহমান মোল্লা। ওই বছরেরই ১০ জুলাই মারা যান ঢাকা-১৮ আসনের এমপি, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন। অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করায় শূন্য হয়ে যায় এসব আসন। সঙ্গতকারণেই উপনির্বাচনের আয়োজন করতে হয় ইসিকে।

শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর আসন পাবনা-৪ এ ২৬ সেপ্টেম্বর, হাবিবুর রহমান মোল্লার ঢাকা-৫ আসনে ১৭ অক্টোবর ও সাহারা খাতুনের ঢাকা-১৮ আসনে ১২ নভেম্বর উপনির্বাচন সম্পন্ন করে কমিশন। আগের বছরের ৭ নভেম্বর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) কার্র্যকরী সভাপতি চট্টগ্রাম-৮ আসনের এমপি মঈন উদ্দীন খান বাদল মারা যান। শূন্য হওয়া এ আসনটিতে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত গত বছরের ১৩ জানুয়ারি।

একই বছর ২৭ ডিসেম্বর ইউনূস আলী সরকার মারা যাওয়ায় শূন্য হওয়া গাইবান্ধা-৩ আসনে উপনির্বাচন হয় ২০২০ সালের ২৭ জানুয়ারি। সূত্রমতে, চলতি একাদশ সংসদের প্রথম বছরে এমপিদের মধ্যে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, আওয়ামী লীগের ইউনূস আলী সরকার এবং জাসদের মঈন উদ্দীন খান বাদল মারা যান। ওই বছরে এরশাদের আসনে উপনির্বাচন হলেও বছরের শেষ দিকে মারা যাওয়ায় বাদল ও ইউনূস আলী সরকারের আসনে উপনির্বাচন হয়েছে পরের বছরে।

অল্প সময়ে এতোজন এমপি মারা যাওয়ার বিষয়ে সংসদে আনা শোক প্রস্তাবের ওপর বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘এটা কষ্টকর। এবারের নির্বাচনের পর অনেক সদস্যকে আমরা হারিয়েছি। জানি না, এবার আমাদের সংসদের কী রকম একটা দুর্ভাগ্য। এদিকে দশম সংসদের পাঁচ বছরে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামসহ তিন মন্ত্রী, একজন প্রতিমন্ত্রী ও একজন বিরোধীদলীয় হুইপ মিলে ১৬ জন এমপি মারা যান। তাদের মধ্যে ১৩ জন আওয়ামী লীগের।

বাকি তিনজন জাতীয় পার্টির সদস্য। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম মারা যান একাদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর। ফলে দশম সংসদে মৃত্যুজনিত কারণে ৫ বছরে ১৪টি আসনে উপনির্বাচন হয়েছিল এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেড়ে দেয়া রংপুর-৬ আসনে উপনির্বাচন হয়। সেখানে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন মনোনয়ন পেয়ে জয়লাভ করেন। এছাড়া লতিফ সিদ্দিকী পদত্যাগ করায় ২০১৫ সালে টাঙ্গাইল-৫ আসনে উপনির্বাচন হয়।

 






ads
ads