উৎসবহীন চৈত্রসংক্রান্তি আজ


poisha bazar

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ১৩ এপ্রিল ২০২১, ১২:২৯

কবি জীবনানন্দ দাশের ভাষায়- ‘পুরনো সে-নক্ষত্রের দিন শেষ হয়/নতুনেরা আসিতেছে ব’লে।’ এক দিন পরেই বাঙালির জীবনে আসছে নতুন বাংলা সন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ। কাল বুধবার বর্ষবরণের দিন পহেলা বৈশাখ। এ কারণেই জীর্ণ পুরনোকে বিদায় আর নতুনকে বরণের প্রস্তুতিতে আজ চৈত্রসংক্রান্তিতে মুখর থাকার কথা বাংলাদেশ ও পাশের দেশ ভারতের বাঙালি অধ্যুষিত জনপদগুলো। কিন্তু মরণব্যাধি করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) প্রাদুর্ভাবের কারণে জনসমাগম এড়ানোর জন্য বর্ষবিদায় ও নববর্ষ বরণের সব অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে।

সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, ভয়াবহ এই কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে এবারো পহেলা বৈশাখে সশরীরে কোনো মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হবে না। এর আগে, ১০০ জন নিয়ে সীমিত পরিসরে শোভাযাত্রা করার ঘোষণা দেয়া হলেও শেষ মুহূর্তে এসে তা বাতিল করা হলো। তবে প্রতীকী কর্মসূচি হিসেবে চারুকলা অনুষদের শিল্পীদের তৈরি মঙ্গল শোভাযাত্রার বিভিন্ন মুখোশ ও প্রতীক ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রদর্শন এবং সম্প্রচারের উদ্যোগ নেয়া হবে। চৈত্রসংক্রান্তি ও বর্ষবরণ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গণজমায়েত করা যাবে না।

আজ মঙ্গলবার, ৩০ চৈত্র। ১৪২৭ সনের চৈত্র মাসের শেষ দিন। আজ সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে আরো একটি বছর। বাংলা সনের সমাপনী মাস চৈত্রের শেষ দিনটি সনাতন বাঙালির লৌকিক আচারের চৈত্রসংক্রান্তি। কথিত আছে- চৈত্রসংক্রান্তিকে অনুসরণ করেই পহেলা বৈশাখ উদযাপনের এত আয়োজন। তাই চৈত্রসংক্রান্তি হচ্ছে বাঙালির আরেক বড় উৎসব। গত বছরের মতো এবারো সেই উৎসব ম্স্নান। কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধে পহেলা বৈশাখসহ সব ধরনের সমাগমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। করোনা রোধে পহেলা বৈশাখের প্রথম দিন থেকে সারা দেশে সর্বাত্মক লকডাউন শুরু হচ্ছে। এ কারণে এবার থাকছে না ছোট-বড় বর্ষবরণের কোনো আয়োজন। বাতিল করা হয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে কোনো আনুষ্ঠানিকতা থাকছে না এবারো।

চৈত্রসংক্রান্তি বাংলার লোক-সংস্কৃতির এমন এক অনুষঙ্গ, যা ঐতিহ্যবাহী লোকউৎসবের আমেজে বর্ণিল। হালখাতার জন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সাজানো, লাঠিখেলা, সঙযাত্রা, রায়বেশে নৃত্য, গান, আবৃত্তি, শোভাযাত্রাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান আর ভূত তাড়ানোর মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়ে থাকে চৈত্রসংক্রান্তি। কিন্তু বাংলাদেশসহ বিশ্বের বাঙালি কোভিড মহামারী থেকে সহসা মুক্তির প্রত্যাশা নিয়েই পুরনো বছরকে বিদায় আর পরের দিন নতুন বছরকে বরণ করে নেবে তেমন কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই।

বাংলার চিরায়ত রীতি অনুযায়ী বছরের শেষ দিনের উৎসবকে বলা হয় চৈত্রসংক্রান্তি। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের চড়ক পূজা চৈত্রসংক্রান্তির এক প্রাচীন ঐতিহ্য। নতুন বছরকে বরণের প্রস্তুতির পাশাপাশি শেষ দিনটিতে থাকে বর্ষবিদায়ের নানা আয়োজন। এদিনটিতে পুরান ঢাকায় ভূত তাড়ানো হয়। ওঝা সেজে হাতে ঝাড়ু নিয়ে বিশেষ ভঙ্গিমায় ছোট শিশুরা ভূত তাড়ানোর খেলায় মেতে ওঠে। প্রতি বছরই শিল্পকলা একাডেমি, সুরের ধারাসহ বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বের করা হয় বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা। রং-বেরঙের মুখোশ পরে বিভিন্ন বয়সী মানুষ এ শোভাযাত্রায় অংশ নেন। কিন্তু এবার সব কিছু নিষিদ্ধ। তবে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পালন করবে চৈত্রসংক্রান্তি।

চৈত্রসংক্রান্তি প্রধানত হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসব হলেও অসাম্প্রায়িক অগ্রসর সমাজের এক বৃহত্তর লোকউৎসব এখন। সাধারণভাবে বাংলা মাসের শেষ দিনে শাস্ত্র ও লোকাচার অনুসারে স্থান, দান, ব্রত, উপবাস প্রভৃতি ক্রিয়াকর্মকে পুণ্যের কাজ বলা মনে করা হয়। চৈত্রসংক্রান্তির প্রধান উৎসব ‘চড়ক’। এর সঙ্গে চলে গাজনের মেলা। চৈত্র মাসজুড়ে উপবাস, ভিক্ষান্নভোজন প্রভৃতি নিয়ম পালন করার পর সংক্রান্তির দিন সন্ন্যাসীরা কিংবা সাধারণ লোকের কারো কারো শূলফোঁড়া, বাণফোঁড়া ও বড়শিগাঁথা অবস্থায় চড়কগাছে (উঁচু করে পোঁতা কাঠে) ঘোরা, আগুনে হাঁটা প্রভৃতি ভয়ঙ্কর ও কষ্টসাধ্য দৈহিক কলাকৌশল দেখা যায়। অবশ্য এখন এ ধরনের বিপজ্জনক খেলা এখন আর তেমন দেখা যায় না।

বাংলা বছরের শেষ দিনটিতে ছোট-বড় সব ব্যবসায়ীই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেন। নকশা করা রঙিন কাগজ-জরি আর ফুল দিয়ে সাজিয়ে তোলেন সাধ্যমতো বর্ণিল করে। লাল শালুতে মোড়া হালখাতাও তৈরি করেন এই দিনেই। পরদিন নববর্ষে দিনব্যাপী চলবে হালখাতার উৎসব। কিন্তু এবার তার এক অংশ দেখা যাচ্ছে না। থাকবে কি করে করোনার কারণে চলছে ব্যবসা মন্দা। তার পরেও কোনো কোনো ব্যবসায়ী ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে হালখাতা করবেন। সীমিত পরিসরে থাকবে আয়োজন।

দেশের হিন্দুপ্রধান অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে চৈত্রসংক্রান্তির বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে বারোয়ারি মেলা অন্যতম। বিশেষ করে ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নবাবগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, সাভার, দিনাজপুরের ফুলছড়িঘাট ও কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে চৈত্রসংক্রান্তির মেলা বসে। শহরাঞ্চলের নগর সংস্কৃতির আমেজেও চৈত্রসংক্রান্তির উৎসব বা মেলা বসে। তখন এক সর্বজনীন মিলনমেলায় পরিণত হয়। কিন্তু এবার সব ধরনের আয়োজন নিষিদ্ধ করা হয়েছে করোনার কারণে। উপজাতীয়দের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব ‘বৈসাবি’। বৈসুক, সাংগ্রাই ও বিজু এই নামগুলোর আদ্যক্ষর নিয়ে বৈসাবি শব্দের উৎপত্তি। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িরা বৈসাবি উৎসবকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম দিনটির নাম ‘ফুলবিজু’। এ দিন শিশু-কিশোররা ফুল তুলে ঘর সাজায়। দ্বিতীয় দিন হলো ‘মুরুবিজু’। এদিনে হয় মূল অনুষ্ঠান। এদিন নানা রকম সবজি নিয়ে তৈরি হয় ‘পাজন’ নামে নিরামিষ খাবার। এটি বৈসাবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী পিঠা ও মিষ্টান্ন তৈরি করা হয়। অতিথিদের জন্য এদিন সবার ঘরের দরজা খোলা থাকে। লোক সমাগম যেন তেমন বেশি না হয়, করোনা স্বাস্থ্যবিধি মেনেই কিছু কিছু অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে সীমিত পরিসরে। মূল আয়োজন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে কয়েকদিন আগে। চৈত্রসংক্রান্তিকে সবার প্রত্যাশা মহামারী করোনা নির্মূল হয়ে যাক। আসুক স্বাস্থ্যকর নতুন বাংলাদেশ।  নতুন বিশ্ব।

মানবকণ্ঠ/এসকে

 






ads
ads