গ্রেফতার আতঙ্কে হেফাজত নেতারা


poisha bazar

  • শাহীন করিম
  • ০৮ এপ্রিল ২০২১, ০৭:০৫

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির পিতার জন্ম শতবার্ষিকীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরোধিতার নামে দেশে ভয়াবহ তাণ্ডবের ঘটনায় অবশেষে হার্ডলাইনে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সংঘাত ও হতাহতের ঘটনা এড়াতে এবং এতদিন ধৈর্যের পরীক্ষা দিলেও আর ছাড় দেয়া হবে না।

ব্রাক্ষণবাড়িয়া, চট্টগ্রামের হাটহাজারী, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় ব্যাপক নাশকতার ঘটনার মামলায় অভিযুক্ত হচ্ছেন হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতারা। প্রথমে আড়ালে থাকলেও এবার শীর্ষ নেতাদের নাম মামলায় উঠে এসেছে। মামলায় হেফাজতের নেতা-কর্মীদের মধ্যে গ্রেফতার আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে গতকাল আটক হয়েছেন কথিত শিশুবক্তা রফিকুল ইসলাম মাদানী।

নারীকাণ্ডে ব্যাপক সমালোচিত মাওলানা মামুনুল হকসহ হেফাজতের ইসলামের কয়েক শীর্ষস্থানীয় নেতাও রয়েছেন গোয়েন্দাদের নজরদারিতে। সাম্প্রতিক তাণ্ডবে বহু মামলার আসামি এসব নেতা যেকোনো সময় গ্রেফতার হতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

সূত্র জানায়, মামলার পাশাপাশি হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতাদের আয়কর ফাইলও দেখা হবে। ইতোমধ্যে অর্ধশতাধিক নেতার ব্যাংক হিসাব তলব করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, যেহেতু হেফাজত নেতারা এখন সরাসরি রাজনীতিতে জড়িয়ে গেছেন, তাই অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের মতো তাদেরও সব কিছু খতিয়ে দেখা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এবার আর ছাড় পাচ্ছেন না হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকসহ বেশ কয়েক নেতা। বারবার সমালোচনায় আসা এসব হেফাজত নেতাদের বিরুদ্ধে আইনগতভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সবুজ সঙ্কেত পেলেই তাণ্ডবের হোতাদের আইনের মুখোমুখি করবে পুলিশ ও র‌্যাব।

এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরোধিতা করে চালানো তাণ্ডবে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও হামলার ঘটনায় শুধুমাত্র ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেই বুধবার পর্যন্ত ৪৮টি মামলা হয়েছে। এতে আসামি প্রায় ৩০ হাজার আসামির মধ্যে হেফাজত, বিএনপি ও জামায়াতের অনেক নেতার নাম রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে রয়েল রিসোর্র্টে মামুনুল হকের নারীকাণ্ডের পরবর্তী সহিংসতায় তিনটা মামলা হয়েছে।

এর একটিতে আসামির তালিকায় মাওলানা মামুনুল হকের নাম রয়েছে। ২৬ মার্চ জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে তাণ্ডবের ঘটনায় মঙ্গলবার রাতে পল্টন থানায় দায়ের করা দুটি মামলায়ও হেফাজত নেতা মামুনুলসহ অন্তত ২০ নেতার নাম রয়েছে। এ ছাড়া ২৫ থেকে ২৭ মার্চে নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, চট্টগ্রামের হাটহাজাীর, হবিগঞ্জ ও নরসিংদীসহ বিভিন্ন জায়গায় তাণ্ডবের ঘটনায় আরো ২০টির অধিক মামলা হয়েছে।

এসব মামলার প্রাথমিক তদন্তে হেফাজতের পাশাপাশি জামায়াত ও বিএনপি নেতার জড়িত থাকার তথ্য মিলছে বলে জানা গেছে। তবে হেফাজতের নেতারা বলছেন, শীর্ষ নেতাদের হয়রানির জন্য পরিকল্পিতভাবে এসব মামলা করা হচ্ছে।

পুলিশ ও র‌্যাবের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সুনামগঞ্জের শাল্লা থেকে প্রথম তাণ্ডব শুরু করেছে হেফাজতে ইসলামের মারমুখী কর্মীরা। পরবর্তীতে বিভিন্ন জায়গায় একের পর এক নাশকতা চালায় হেফাজত কর্মীরা। তাদের আড়ালে রয়েছে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদল। মূলত দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অরাজকতা চালিয়ে সরকারবিরোধী অপতৎপরতা চালাচ্ছে এসব অশুভ শক্তি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্যও তাদের হামলায় আহত হয়েছেন। আঘাতপ্রাপ্ত হয়েও অনেকটা ধৈর্য ধরেছে পুলিশ ও র‌্যাব। তারা ধর্মকে ব্যবহার করে চরম তাণ্ডব চালিয়ে শত শত কোটি টাকা দেশের সম্পদ নষ্ট করেছে। নানা কারণে এতদিন তাদের ছাড় দিলেও জনস্বার্থে এখন হার্ডলাইনে যেতে বাধ্য হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানায়, সেই ২৮ মার্চের পর থেকে কয়েক নেতার ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সবশেষ শনিবার সোনারগাঁয় মামুনুল হকের অবরুদ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে হেফাজতের এসব নেতার ওপর বিশেষ নজরদারি শুরু হয়। নাশকতার নির্দেশদাতাদের সূত্রও খোঁজা হচ্ছে। এরই মধ্যে মামুনুল হকসহ কয়েক নেতার ব্যাপারে কিছু প্রমাণ মিলেছে। সরকারের সবুজ সঙ্কেত পেলে মামুনুলসহ কয়েক আসামিকে গ্রেফতার করা হতে পারে।

অন্যদিকে মামলা ও তদন্তের বিষয়টি টের পেয়ে গা-ঢাকা দিয়েছেন কয়েক হেফাজত নেতা। তারা বর্তমানে গ্রেফতার আতঙ্কে রয়েছেন। একই সূত্র মতে, সাম্প্রতিক ব্যাপক সহিংসতার ঘটনার মামলায় মাওলানা মামুনুল হক ছাড়াও হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা লোকমান হাবিব, যুগ্ম মহাসচিব নাসির উদ্দিন মনির, নায়েবে আমির মাওলানা বাহাউদ্দিন জাকারিয়া, মাওলানা নুরুল ইসলাম জেহাদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নায়েবে আমির মাজেদুর রহমান, মাওলানা হাবিবুর রহমান, মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়্যুবী ও সহকারী মহাসচিব মাওলানা জসিম উদ্দিনের ব্যাপারে নিবিড় তদন্ত চলছে। এরাসহ আরো অনেক নেতাকে নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি বিএনপি ও জামায়াতের কতিপয় নেতার কর্মকাণ্ডেও নজরদারি রয়েছে।

হেফাজতের তাণ্ডবের ব্যাপারে কৃষিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, সহিংসতার ব্যাপারে সরকার কোনো ছাড় দেবে না। তারা যে কর্মকাণ্ড করেছে, সেটা মোকাবিলা করতে হলে শত শত মানুষকে গুলির মুখে ফেলতে হতো। কিন্তু সেটা সরকার করেনি। সরকার ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। সারা জাতি দেখেছে এবং সারা পৃথিবীর মানুষ দেখেছে যে, ধর্মান্ধরা কী করতে পারে। এবার সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেবে। তিনি বলেন, যারা এ ধ্বংসাত্মক কাজে জড়িত ছিল, তাদের সবাইকে আইন অনুযায়ী কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। তারা কোনোক্রমেই রেহাই পাবে না।

গত ২৬ মার্চ জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে সহিংসতার ঘটনায় ৫ এপ্রিল হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হকসহ ১৭ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের উপ-দফতর সম্পাদক খন্দকার আরিফুজ্জামান বাদী হয়ে পল্টন থানায় মামলাটি করেন। এরপর সোনারগাঁয়ে রিসোর্টে নারীসহ মামুনুল অবরুদ্ধ ও পরবর্তীতে ব্যাপক ভাঙচুরে ঘটনায়ও নেতাদের আসামির তালিকায় আনা হয়েছে। যদিও প্রথম দিকের মামলায় হেফাজত নেতাদের নাম না থাকায় প্রশ্ন দেখা দেয়।

পরবর্তীতে মামুনুল হক ও হেফাজতের নেতাদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়ার ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে পুলিশ ও র‌্যাব। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কথা থেকেও সে ধারণা পাওয়া গেছে।

পুলিশ জানিয়েছে, গোয়েন্দা তথ্যে হোতাদের শনাক্ত করা হচ্ছে। আর ভিডিও ফুটেজ ও স্থির ছবি দেখে হামলাকারীদের শনাক্ত করা হচ্ছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজনকে শনাক্ত করে তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। হেফাজত নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসছে। তাদের বিরুদ্ধেও কড়া ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই প্রতিনিয়ত বাড়ছে তাণ্ডবের মাত্রা। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রয়োজন সকলের সমন্বিত প্রয়াস। পাশাপাশি সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক ভ‚মিকা রাখার কথাও বলছেন তারা।






ads
ads