এই বিধিনিষেধ কোনো কাজে আসবে না


poisha bazar

  • সেলিম আহমেদ
  • ০৭ এপ্রিল ২০২১, ০৯:৪১,  আপডেট: ০৭ এপ্রিল ২০২১, ০৯:৪৩

করোনা সংক্রমণের বিস্তৃতি নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার ঘোষিত বিধিনিষেধ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে না পারলে তা কোনো কাজে আসবে না বলে সাফ জানিয়েছেন দেশের খ্যাতিমান পাঁচ চিকিৎসক। তারা বলেছেন, করোনা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সবার আগে যে কোনোভাবেই হোক স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হবে। লকডাউন কিংবা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে যদি মানুষকে সচেতন করা না যায়, তাহলে তা ফলপ্রসূ হবে না।

উল্টো সংক্রমণের গতি আরো বাড়বে। শুধু দূরপাল্লার বাস ও শপিংমল বন্ধ রেখে একটি অপরিকল্পিত নিষেধাজ্ঞা জনগণকে ক্ষুব্ধ ও বিভ্রান্ত করছে বলেও মনে করেন তারা। দেশের খ্যাতিমান চিকিৎসকগণ মনে করেন, এবারের চ্যালেঞ্জ গতবারের থেকেও বেশি। কারণ, এবার নতুন করে করোনার তিনটি ভ্যারিয়েশন (বৈচিত্র্য) দেশে চলে এসেছে। আর এই তিনটি ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ খুব দ্রুত গতিতে ছড়াচ্ছে। তাই করোনা সংক্রমণকে শক্তভাবে মোকাবিলা করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও খ্যাতিমান মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ মানবকণ্ঠকে বলেন, সবার আগে জরুরি মানুষের স্বাস্থ্যবিধি মানানো। জনগণ যদি স্বাস্থ্যবিধি ঠিকমতো মানে তাহলে লকডাউন কিংবা নিষেধাজ্ঞা কাজে আসবে। অন্যথায় এই নিষেধাজ্ঞা কোনো কাজে আসবে না। তিনি বলেন, দূরপাল্লার বাস আর মার্কেট বন্ধ ছাড়া সবকিছু কিন্তু স্বাভাবিক। মানুষ সামাজিক দূরত্ব মানছে না, মাস্ক পরছে না, স্বাস্থ্যবিধিও মানছে না। ফলে এই নিষেধাজ্ঞা কোনো কাজে আসছে না। এজন্য সরকারকে আরো কঠোরভাবে নজরদারি করতে হবে। বিষয়টি মানাতে যাতে মানুষকে বাধ্য করা যায়, উদ্বুদ্ধ করা যায় সেজন্য প্রচার-প্রচারণা বাড়াতে হবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, সাত দিনের নিষেধাজ্ঞা দেয়ার পর দলে দলে লাখ লাখ মানুষ বড় শহর থেকে গাদাগাদি করে গ্রামে যেতে দেখেছি। এতে শহর থেকে সারা দেশে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার পথটা সুগম হয়েছে। এতদিন ছিল ৩১টি জেলা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ, এখন সারাদেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেল। একটি অপরিকল্পিত, সমন্বয়হীন নিষেধাজ্ঞায় কোনো কার্যকর ফল আসবে বলে আমার মনে হয় না।

তিনি বিশ্লেষণ করে বলেন, এখন যে লকডাউন কিংবা নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে, যেমন- গার্মেন্টস খোলা, শিল্পকলকারখানাগুলো খোলা কিন্তু বিপণিবিতান বন্ধ, দোকানপাট বন্ধ। আবার দোকানপাট বন্ধ কিন্তু মেলা চলছে, খেলা চলছে। তার মানে লকডাউন বা নিষেধাজ্ঞা কার জন্য দেয়া হয়েছে? শুধু কী বিতণিবিতানের জন্য লকডাউন। সরকারি-বেসরকারি অফিস চলছে, কিন্তু পাড়ার চায়ের দোকানকে বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। ফলে মানুষ ক্ষুব্ধ হচ্ছে, বিভ্রান্ত হচ্ছে। এ কারণে কিন্তু মানুষ তা মানতে আগ্রহী নয়।

তিনি বলেন, পুরো বিষয়টার সঙ্গে কিন্তু সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা হয় নাই। সরকার প্রশাসনিক নির্দেশ দিয়ে এবং পরিপত্র জারি করে বিষয়টি বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে। কিন্তু তা জনগণ মানতে চাচ্ছে না। জনগণকে মানাতে হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মাঠে নামাতে হবে।

করোনা সংক্রান্ত জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এই লকডাউন নিয়ে আমাদের কোনো পরামর্শ নেয়া হয়নি। আমরা এ ব্যাপারে কিছু জানি না। এই লকডাউনের কী উদ্দেশ্য তা বলা হয়নি। আমরা ধরে নিচ্ছি যে, করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় এই লকডাউন দেয়া হচ্ছে।

তার মতে, সাত দিনের কোনো লকডাউন হয় না। এটা সর্বনিম্ন ১৫ দিন থেকে সর্বোচ্চ ২১ দিনের হয়। এটাই বৈজ্ঞানিক নিয়ম। কারণ করোনা ভাইরাসের ইনকিউবিশন পিরিয়ড হলো ১৫ দিন। তারপর আরো সাত দিন লকডাউন দরকার। এই সময়ে সঠিকভাবে লকডাউন করা হলে ভাইরাসটির সংক্রমণ ও এর ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো যায়।

সরকারের নিষেধাজ্ঞা মানুষ মানছে না- এই কথার সঙ্গে একমত নন জাতীয় রোগতত্ত¡, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, কেউ কিন্তু সখের বসে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে না। যদি সখের বসেও ঘুরে বেড়ায় তার সংখ্যা কিন্তু নগণ্য। সরকার তো তার জীবিকার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। তাই একেবারেই যাদের বের না হলে নয় তারাই জীবিকার সন্ধানে বের হচ্ছে। তাদের দৈনন্দিন সমস্যা যত বেশি সমাধান করতে পারবে, তত কম মানুষ রাস্তায় বের হবে।

তিনি বলেন, এই বিধিনিষেধে সংক্রমণ কমছে কী না তা দুই সপ্তাহ পরে দেখা যাবে, আর মৃত্যু কমছে কী না তা তিন সপ্তাহ পরে দেখা যাবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল) বলেন, গত বছর দেশে করোনা মহামারী দেখা দেয়ার পর আমরা জীবন ও জীবিকা নিয়ে লড়াই করেছি। কিন্তু এবারের চ্যালেঞ্জ গতবারের থেকেও বেশি। কারণ, এবার নতুন করে করোনার তিনটি ভ্যারিয়েশন (বৈচিত্র্য) দেশে চলে এসেছে। সেগুলো হলো- ব্রিটিশ, সাউথ আফ্রিকান এবং ব্রাজিলিয়ান। আমরা এরই মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে এই তিনটি ভ্যারিয়েন্টের জেনেটিক সিকোয়েন্স জমা দিয়েছি।

গুগল মবিলিটি রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষ করোনা দেখা দেয়ার পর গত ১৩ মাসের মধ্যে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে সবচেয়ে বেশি চলাফেরা করেছে। ফলে সঙ্ঘত কারণেই করোনা বেশি ছড়িয়েছে। আর এই তিনটি ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ যেহেতু ৭০ শতাংশের বেশি ছড়াচ্ছে খুবই দ্রুত গতিতে। এই পরিস্থিতি যদি নিয়ন্ত্রণ করতে হয় তাহলে লকডাউন আমাদের মতো করে বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে সরকার গতবার জীবন জীবিকার কথা বললেও এবার জীবিকার থেকে জীবনকে এগিয়ে রেখেছে। শুধু আমরা সরকারকে দোষারোপ করলে কিন্তু চলবে না। আমাদের আমাদের সচেতনার জায়গা আসতে হবে।

করোনার লকডাউন একেক দেশে একেকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। লকডাউন আমরা শিখেছি চায়না থেকে। চায়নায় পুলিশি রাষ্ট্র সেখানে পুলিশ দিয়ে লকডাউন পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব। কিন্তু আমাদের দেশ বিকাশমান গণতান্ত্রিক দেশ। আমাদের দেশে কিন্তু চাইলেও লকডাউন পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব না।

 






ads
ads