করোনার ‘হটস্পট’ ঢাকা


  • সেলিম আহমেদ
  • ২৮ মার্চ ২০২১, ১০:০৭

দেশে গরমের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। শনিবার বিগত সাড়ে তিন মাসের রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ সংখ্যক মৃত্যু হয়েছে। এই এক দিনে আরো ৩৯ মৃত্যু, ৩ হাজার ৬৭৪ জনকে করোনায় আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গরমের এই প্রকোপ যতই বাড়বে, করোনা ততই মাথা ঝাড়া দিয়ে উঠবে। এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, শীতের সময় বাংলাদেশসহ উষ্ণমণ্ডলীয় দেশে সংক্রমণ কমে গিয়েছিল। তবে শীতপ্রধান দেশগুলোতে এ সময়ে সংক্রমণ বেড়ে গিয়েছিল। একটা বিষয় আমরা জানি যে, শীতপ্রধান দেশগুলোতে শীতকালে ইনফ্লুয়েঞ্জা বেড়ে যায়।

আর গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলোতে বাড়ে গরমকালে। তাই যেহেতু আমাদের গ্রীষ্মপ্রধান দেশ, তাই এ সময়ে করোনার সংক্রমণ আরো বাড়তে পারে। এদিকে দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর থেকেই করোনার ‘হটস্পট’ ছিল রাজধানী ঢাকা। এখনো দেশে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর শীর্ষে অবস্থান করছে ইটপাথরের এই নগরী।

ঢাকায় প্রতিনিয়ত করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় সরকারি ও বেসরাকারি হাসপাতালগুলোতে ইতোমধ্যেই দেখা দিয়েছে আইসিইউ ও বেড সংকট। সংক্রমণ আরো বাড়তে আক্রান্তদের কীভাবে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হবে তা নিয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। শনিবার পর্যন্ত দেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ঢাকার অবস্থান।

সর্বমোট মৃত্যুর ৫৬.৬৯ শতাংশ মানুষ মারা গেছেন ঢাকায়। গতকালও সারাদেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ৩৯ জনের মধ্যে ২৮ জন মারা গেছেন ঢাকায়। এখন পর্যন্ত করোনায় মোট ৮ হাজার ৮৬৯ জন মারা যাওয়ার মধ্যে ৫ হাজার ২৮ জনই মারা গেছেন ঢাকায়। আর করোনায় সবচেয়ে কম মৃত্যু হয়েছে ময়মনসিংহে। সেখানে মৃত্যুর হার মাত্র ২. ২৬ শতাংশ। এখন পর্যন্ত দুইশত মারা গেছেন বিভাগটিতে।

সবমিলিয়ে গতকাল পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রামে মারা গেছেন এক হাজার ৬২০ জন। মৃত্যুহার ১৮.২৭ শতাংশ। রাজশাহীতে মারা গেছেন ৪৯২ জন। মৃত্যুহার ৫.৫৫ শতাংশ। খুলনায় মারা গেছেন ৫৭৩ জন। মৃত্যুহার ৬.৪৬ শতাংশ। বরিশালে মারা গেছেন ২৬৭ জন। মৃত্যুহার ৩.০১ শতাংশ। সিলেটে মারা গেছেন ৩১৭ জন। মৃত্যুহার ৩.৫৭ শতাংশ। রংপুরে ৩৭২ জন। মৃত্যুহার ৪.১৯ শতাংশ।

এদিকে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় ইতোমধ্যেই দেখা দিয়েছে আইসিইউ ও বেড সংকট। শনিবার খোদ স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে পাওয়া তথ্যমতে, রাজধানীর ১০টি করোনা বিশেষায়িত হাসপাতালে (নিবিড় পরিচর্চা কেন্দ্র) আইসিইউ’র ১০৮টি বেড রয়েছে। এর মধ্যে ১০৩টি আইসিইউতে রোগী ভর্তি রয়েছেন। আইসিইউ খালি আছে মাত্র ৫টি। আর এই ১০টি হাসপাতালে দুই হাজার ৪০১টি সাধারণ আসনের মধ্যে এক হাজার ৯৪৮টি আসনে রোগী ভর্তি রয়েছেন। খালি রয়েছে ৪৫৩টি।

আর বেসরকারি ৯টি করোনা বিশেষায়িত হাসপাতালে ১৮৮টি আইসিইউ’র মধ্যে ১৪৩ টিতে রয়েছে রোগী ভর্তি। খালি রয়েছে মাত্র ৪৫টি। আর সাধারণ ৯২৮টি আসনের মধ্যে ৫১৪টিতে রয়েছে রোগী ভর্তি। খালি রয়েছে মাত্র ৪১৪টি।

সরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে গতকাল শনিবার পাওয়া তথ্যমতে, কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কোনো আইসিইউ ফাঁকা ছিল না। শুধুমাত্র শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে ২টি, ঢাকা সরকারি কর্মচারী হাসপাতালে ১টি আর রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ২টি আইসিইউ আসন ফাঁকা ছিল। বেসরকারি হাসপাতলের মধ্যে ইবনে সিনা হাসপাতাল ও এ এম জেড হাসপাতালে কোনো আইসিইউ ফাঁকা ছিল না।

একই চিত্র ঢাকার বাইরেও। চট্টগ্রাম মহনাগরীতে ৪টি সরকারি ও ৩টি বেসরকারি করোনা বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে। এই ৭টি হাসপাতালে ৪৫টি আইসিইউয়ের মধ্যে গতকাল শনিবার ২৪টিতে ছিল রোগী ভর্তি। ফাঁকা ছিল মাত্র ২১টি। আর ৬৮৭টি সাধারণ আসনের মধ্যে ২৮৩টি সাধারণ আসনে ছিল রোগী ভর্তি। ফাঁকা ছিল ৪০৪টি।

অন্যদিকে সারা দেশে শনিবার ২৩৩টি আইসিইউ আসনের মধ্যে ৭৮টিতে ছিল রোগী ভর্তি। ফাঁকা ছিল ১৫৫টি। আর ৫ হাজার ৮৩৮টি সাধারণ আসনের মধ্যে ৬৮০টিতে ছিল রোগী ভর্তি। ফাঁকা ছিল ৫ হাজার ১৫৮টি।

এ প্রসঙ্গে মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অসীম কুমার বলেন, ‘এক মাস আগেও আইসিইউতে রোগীর চাপ অনেক কম ছিল। গত ৯ মার্চ থেকে আমাদের হাসপাতালের ১৪টি আইসিইউ বেড পরিপূর্ণ ছিল। এই সংকট শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের প্রতিটা দেশে। সংকট নিরসনে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।’

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক বলেন, এক সপ্তাহ ধরে আইসিইউ শয্যার চাহিদা বাড়ছে। আমাদের করোনা রোগীদের জন্য দুই পাশে আইসিইউ-এর ব্যবস্থা ছিল। তবে সম্প্রতি আগুন লাগার কারণে ১৪টি আইসিইউ শয্যা বন্ধ করা হয়েছে। যে কারণে অন্যান্য হাসপাতালের চেয়ে আমাদের হাসপাতালে চাপ আরো বেশি।

তিনি বলেন, প্রতিদিনই আইসিইউ শয্যার জন্য বিভিন্ন পর্যায় থেকে তার কাছে অনুরোধ আসে। অনেক ঘনিষ্ঠজন ফোন করে একটি আইসিইউ শয্যার জন্য সহায়তা চান। কিন্তু শয্যা ফাঁকা না থাকায় তারা রোগী ভর্তি করতে পারছেন না বলে জানান তিনি।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, শীতের সময় বাংলাদেশসহ উষ্ণমণ্ডলীয় দেশে সংক্রমণ কমে গিয়েছিল। কিন্তু, শীতপ্রধান দেশগুলোতে এ সময়ে সংক্রমণ বেড়ে গিয়েছিল। একটা বিষয় আমরা জানি যে, শীতপ্রধান দেশগুলোতে শীতকালে ইনফ্লুয়েঞ্জা বেড়ে যায়। আর গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলোতে বাড়ে গরমকালে। তাই যেহেতু আমাদের গ্রীষ্মপ্রধান দেশ, তাই এ সময়ে করোনার সংক্রমণ আরো বাড়বে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। গত বছর মার্চে দেশে সংক্রমণ শুরু হলো। কিন্তু, মে-জুন-জুলাইয়ে যখন আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি গরম পড়ছিল, তখনই আমরা দেখেছি যে সংক্রমণ বেড়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, চিকিৎসা করে কিন্তু করোনা রোগী শেষ করা যাবে না। করোনা নিয়ন্ত্রণের প্রথম প্রদক্ষেপ হলো প্রতিরোধ করা। প্রতিরোধ করার যে ব্যবস্থা নেয়া উচিত সেগুলো নিতে হবে। যেমন- সব ধরনের জনসমাগম বন্ধ করা, গণপরিবহনে সতর্কতা আরোপ করা, মার্কেট-শপিংমল বন্ধ করা, মাস্ক পরা নিশ্চিত করা। কিন্তু আমরা এখনো এসব পদক্ষেপ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করি নাই। সংক্রমণ বাড়লেও আমরা ধীরগতিতে চলছি। এভাবে চলছে পরিস্থিতি আরো ভয়বাহ হয়ে যাবে। তখন আমরা তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না। তাই এখনই কঠোরভাবে এসব ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

এক দিনে আরো ৩৯ মৃত্যু, শনাক্ত ৩ হাজার ৬৭৪: করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত এক দিনে দেশে আরো ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা গত সাড়ে তিন মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে এর চেয়ে বেশি মৃত্যুর খবর এসেছিল গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর। সেদিন ৪০ জনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছিল সরকার।

স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, শনিবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরো ৩ হাজার ৬৭৪ জন আক্রান্ত ও এক হাজার ৯৭১ জন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছে। সবমিলিয়ে করোনায় এখন পর্যন্ত ৮ হাজার ৮৬৯ জনের মৃত্যু ও পাঁচ লাখ ৯১ হাজার ৮০৬ জন আক্রান্ত ও ৫ লাখ ৩৩ হাজার ৯২২ জন সুস্থ হয়েছেন।

 



poisha bazar

ads
ads