আইসিইউ ও বেড সংকট


  • সেলিম আহমেদ
  • ২৪ মার্চ ২০২১, ০৯:৫৯

দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। প্রতিনিয়ত মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষের মধ্যে আতঙ্কও বাড়ছে। সর্বশেষ মঙ্গলবার দেশে করোনায় আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে তিন হাজার ৫৫৪ জনকে। যা গত ৮ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। ওইদিন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে আরো ১৮ জনের। করোনা সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশের হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে আইসিইউ ও বেড সংকট। এ অবস্থায় প্রতিদিন রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের।

এদিকে সংক্রমণের গতি এভাবে ঊর্ধ্বগতির দিকে থাকলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, চলতি মাসের শুরু থেকে যে হারে রোগী বাড়ছে, সেটা আগামী কয়েকদিন অব্যাহত থাকলে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেয়ার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে সরকার।

খোদ স্বাস্থ্য অধিদফতরই গতকালের প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে। ইতোমধ্যেই রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে করোনা রোগী ভর্তি করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে আইসিইউতে বেড একেবারেই ফাঁকা পাওয়া যাচ্ছে না। করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে গত বছরের মতো রোগী নিয়ে হাসপাতাল হাসপাতাল ঘুরতে হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তারা।

দেশে হঠাৎ করেই করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি ও মৃত্যু নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সব দায়ভার আক্রান্তদের ওপরই চাপিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

তিনি বলেন, দিনদিন মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান হচ্ছে। কেউই স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। করোনা তো বাড়বেই। আমরা আগে থেকেই বলেছি, আমরা এখন জেনেশুনেই আক্রান্ত হচ্ছি। আমাদের নিজেদেরই সতর্ক হওয়া উচিত। তা না হলে পরে নিজের এবং পরিবারের ক্ষতি হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা যদি এখনই সতর্ক না হই, স্বাস্থ্যবিধি না মানি, তাহলে আমাদের দেশের অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। যা আমরা এখনো বুঝতে পারছি না। কারণ, আমাদের হাসপাতালগুলোতে তো লাখো মানুষের জায়গা হবে না। কোথায় চিকিৎসা হবে? কে চিকিৎসা দেবে এত মানুষকে?

স্বাস্থ্য অধিফতরের তথ্য মতে, রাজধানীর করোনা বিশেষায়িত ১১ সরকারি হাসাপাতালে ২৩৮১টি সাধারণ আসনের ফাঁকা আছে মাত্র ৬৩৬টি আসন আর ১০৩টি আইসিইউ আসনের মধ্যে ফাঁকা রয়েছে মাত্র ১১টি। এছাড়াও রাজধানীর ৯টি বেসরকারি করোনা বিশেষায়িত হাসপাতালে ৯৪০টি সাধারণ আসনের মধ্যে ফাঁকা রয়েছে ৪৫২টি আসন আর ১৬৪টি আইসিইউয়ের মধ্যে ফাঁকা রয়েছে ৪৬টি আসন।

চট্টগ্রাম মহানগরীর করোনা বিশেষায়িত চারটি সরকারি হাসাপাতালে ৪২৬টি সাধারণ আসনের ফাঁকা আছে মাত্র ২৪৮টি আসন আর ২৫টি আইসিইউ আসনের মধ্যে ফাঁকা রয়েছে মাত্র ১০টি। এছাড়াও বৃহত্তম এই নগরীর ৩টি বেসরকারি করোনা বিশেষায়িত হাসপাতালে ২৬১টি সাধারণ আসনের মধ্যে ফাঁকা রয়েছে ১৭২টি আসন আর ২০টি আইসিইউয়ের মধ্যে ফাঁকা রয়েছে মাত্র ১০টি আসন।

এছাড়াও রাজধানী ও চট্টগ্রামের বাইরে সারাদেশে ৬ হাজার ৪৯২টি সাধারণ আসনে মধ্যে ৪৫৯টি আসনে রোগী ভর্তি রয়েছেন। বর্তমানে ফাঁকা আছে ৬ হাজার ৩৩টি আসন। অন্যদিকে সারাদেশে ২৩৭টি আইসিইউ আসনের মধ্যে ৭১টি আসনে রোগী ভর্তি রয়েছেন। বর্তমানে সারাদেশে ফাঁকা রয়েছে ১৬৬টি আসন।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক বলেন, আমাদের এখানে সবসময় রোগী বেশি থাকে। অন্যান্য সময়ের চেয়ে গত কয়েকদিন রোগীর সংখ্যা একটু বেশি মনে হচ্ছে। বেশিরভাগই জ্বর, সর্দি আর শ্বাসকষ্ট নিয়ে আসছেন। আউটডোরে গিয়ে দেখা গেছে যে, বিভিন্ন ধরনের রোগীর দীর্ঘ লাইন। শুধু আউটডোরের রোগীর চাপ সামাল দিতে ডাক্তারদের দিনে এক থেকে দুই ঘণ্টা সময় বেশি দিতে হচ্ছে।

হঠাৎ রোগীর চাপ বৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, মাঝে যখন করোনার সংক্রমণের হার কমে গিয়েছিল, তখন হয়তো মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানতে শিথিলতা দেখিয়েছে। রোগীর সংখ্যা বাড়ার এটা একটা কারণ হতে পারে। এ সময় কোনো রকম স্বাস্থ্য সচেতনতা ছাড়াই লোকজন বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। ছুটিতে কক্সবাজারে কী পরিমাণ মানুষ গিয়েছে, আপনারা তা দেখেছেন। অনেকেই স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না, মাস্ক পরছেন না। এছাড়া করোনার নতুন ধরন খুব দ্রুত ছড়ায় বলে শোনা গেছে। সেটা সত্যি হলে, হঠাৎ সংক্রমণ বাড়ার এটাও কারণ হতে পারে।

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল আহমেদ বলেন, হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে আমাদের ওপর চাপ যাচ্ছে। সারাদেশের মানুষ যেভাবে ড্যামকেয়ার মুডে চলাফেরা করছে, সংক্রমণ তো বাড়বেই। সামাজিক দূরত্ব, স্বাস্থ্যবিধি কেউ মানছেনই না।

তিনি বলেন, গত ১ মার্চ কুর্মিটোলা হাসপাতালে রোগী ছিল ১৪৬ জন। এখন তা ৩০০ ছাড়িয়েছে। ১০টি আইসিইউ শয্যা আছে। কিছুদিন আগেও বেশ কয়েকটি বেড খালি ছিল, এখন নেই। রোগী এসে ঘুরে যাচ্ছে।

আইসিইউ শয্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে কি না জানতে চাইলে জামিল আহমেদ বলেন, ‘নতুন করে ৪/৫টি আইসিইউ বানানোর চেষ্টা চলছে। এক্ষেত্রে সমস্যা হলো দক্ষ জনবল। আইসিইউ বেড বাড়িয়ে লাভ নেই, যদি পরিচালনার লোক না থাকে। যদি দক্ষ চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয়, তাহলেই বেড বাড়ানো সম্ভব।’

প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও ইউজিসির অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই। যেসব দেশ স্বাস্থ্যবিধি মানেনি, সেসব দেশে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেছে। আমাদের দেশে এখন কেউ মাস্ক পরতে চান না, স্বাস্থ্যবিধি মানতে চান না। এ বিষয়ে জনগণকে সচেতন হতে হবে।

সাড়ে আট মাসে করোনায় সর্বোচ্চ শনাক্ত: গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন তিন হাজার ৫৫৪ জন। ফলে মোট আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৭৭ হাজার ২৪১ জনে। গত বছরের ২ জুলাইয়ের পর এটিই দেশে একদিনে সর্বোচ্চ শনাক্ত। সেদিন আক্রান্ত হিসেবে দেশে শনাক্ত হয়েছিলেন চার হাজার ১৯ জন। এ সময় আক্রান্ত আরো ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ভাইরাসটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে আট হাজার ৭৩৮ জনে।

গতকাল মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে পাঠানো করোনা বিষয়ক নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় করোনামুক্ত হয়েছেন এক হাজার ৮৩৫ জন। এখন পর্যন্ত মোট সুস্থ হয়েছেন পাঁচ লাখ ২৫ হাজার ৯৯৪ জন। এ সময়ে ২৬ হাজার ৩৫৭ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। পরীক্ষা করা হয়েছে ২৫ হাজার ৯৫৪টি নমুনা। মোট নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ৪৪ লাখ ৬০ হাজার ১৮৪টি। দেশে মোট ২১৯টি পরীক্ষাগারে করোনার নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

 



poisha bazar

ads
ads