এবারো হজযাত্রা নিয়ে সংশয়


  • ছলিম উল্লাহ মেজবাহ
  • ২৩ মার্চ ২০২১, ১১:১২

করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির কারণে গত বছরের ধারাবাহিকতায় এবারো পবিত্র হজে যাওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। আর কঠিন শর্তের কারণে ওমরাহযাত্রী পাঠাচ্ছে না হজ এজেন্সিগুলো। হজের আর মাত্র চার মাস বাকি থাকলেও বাংলাদেশ থেকে কেউ হজে যেতে পারবেন কি না-সে বিষয়ে এখনো কোনো নির্দেশনা দেয়নি সৌদি আরব সরকার।

শুধু হজে যেতে কোভিড-১৯ টিকা গ্রহণ বাধ্যতামূলক আর হজযাত্রীদের বয়স ১৮ থেকে ৬০ বছর নির্ধারণ করে দিয়েছে দেশটি। এ বিষয়ে রাজকীয় সৌদি সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক গেজেটও প্রকাশিত হয়েছে। এ নির্দেশনা অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকারও গত বছর নিবন্ধিত হজযাত্রীদের করোনা টিকা কার্যক্রম শুরু করেছে। এছাড়া এ বিষয়ে আর তেমন কোনো প্রস্তুতি শুরু হয়নি।

হজের প্রস্তুতি বিষয়ে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মো. ফরিদুল হক খান বলেছেন, চলতি বছর হজ হবে কি-না তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি সৌদি আরব। তবে আগাম প্রস্তুতি হিসেবে সারা বিশ্বের হজ পালনে আগ্রহীদের করোনার টিকা নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছে সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশেও নিবন্ধিত ব্যক্তিদের টিকা দেয়ার জন্য বলা হয়েছে। যেহেতু প্রথম ডোজের ২ মাস পর দ্বিতীয় ডোজ দেয়ার নিয়ম, সেহেতু এখন থেকেই টিকা দেয়ার শুরু হচ্ছে। এ বছর সীমিত পরিসরে হজ অনুষ্ঠিত হলেও যেন আমরা সমস্যায় না পড়ি সেই লক্ষ্যে কাজ চলছে।

এদিকে করোনা পরিস্থিতির কারণে গত প্রায় এক বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে কেউ ওমরাহ পালনের সুযোগ পাচ্ছেন না। কয়েক মাস আগে থেকে সীমিত পরিসরে ওমরাহ কার্যক্রম চালু হলেও নানা কঠিন শর্তের কারণে বেসরকারি এজেন্সিগুলো বাংলাদেশ থেকে এখনো ওমরাহযাত্রী পাঠানো শুরু করতে পারেনি বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) সভাপতি এম শাহাদাত হোসাইন তসলিম মানবকণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে হজে যাওয়ার বিষয়ে সৌদি সরকার থেকে এখনো কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। এখন পর্যন্ত সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবার হজে যেতে হলে হজযাত্রীদের বাধ্যতামূলকভাবে করোনা টিকা নিতে হবে। সর্বশেষ হজযাত্রীদের বয়স নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে যে, ১৮ বছরের নিচে এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সের কেউ হজে যেতে পারবেন না। এর বাইরে আর কোনো তথ্য জানায়নি দেশটি।’

হাব সভাপতি বলেন, ‘আমরা আশা করছি যদি সীমিত পরিসরে হজ হয়, তাহলে বিশ্বের অন্য দেশ থেকে সুযোগ পেলে বাংলাদেশকেও বাদ দেবে না। তবে কত সংখ্যক হজযাত্রী সুযোগ পাবেন সেটা অজানা। তবে হজে যাওয়ার অনুমতি পেলে তার আগে নিয়মানুযায়ী দুই দেশের মধ্যে চুক্তিসহ অন্যান্য কার্যক্রম সম্পাদিত হবে। এ বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।’

করোনা মহামারীর কারণে গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের পাশাপাশি সারা বিশ্ব থেকে মুসলমানদের জন্য ওমরাহ কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় সৌদি আরব সরকার। একপর্যায়ে পবিত্র মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীতে নামাজ আদায় ও কাবাঘর তাওয়াফ বন্ধ করে দেয় দেশটি। পরবর্তী সময় সীমিত পর্যায়ে তাওয়াফ ও নামাজের অনুমতি দেয়া হয়।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত বছর হজ অনুষ্ঠান বাতিলের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। তবে শেষ মুহূর্তে কঠোর নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধির মধ্য দিয়ে শুধু সৌদিতে বসবাসরত বিভিন্ন দেশের স্বল্পসংখ্যক মুসলমানদের অংশগ্রহণে পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবছর হজে সারা বিশ্বের ২০ লাখেরও বেশি মানুষ অংশ নেন। অথচ করোনা পরিস্থিতিতে গত বছর সৌদি আরবে অবস্থানরত প্রায় ১০ হাজার মানুষ হজে অংশ নেয়ার সুযোগ পান।

এদিকে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে গত বছরের ৪ অক্টোবর থেকে কঠোর নিয়মনীতি মেনে সীমিত আকারে চালু হয় পবিত্র ওমরাহ কার্যক্রম। ধাপে ধাপে ওমরাহ পালনের সুযোগ বাড়ানো হয়। তবে ওমরাহ পালনকারীরা কাবা চত্বরে তাওয়াফ সম্পন্ন করলেও তাদের হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ বা চুম্বনে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। কাবা শরিফের বাইরে অস্থায়ী প্রাচীরের বাইরে থেকে তাওয়াফ সম্পন্ন করতে হচ্ছে।

বর্তমানে সৌদি ছাড়াও কয়েকটি দেশ থেকে সীমিতসংখ্যক মুসলমান ওমরাহ পালনের সুযোগ পাচ্ছেন। তবে স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত নানা কঠোর শর্তের কারণে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব থেকে স্বাভাবিকভাবে ওমরাহ পালনে যেতে পারছেন না বলে জানা গেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে এ বছর হজ পালনে সবার সুযোগ থাকছে কি-না তা নিয়েও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।

সূত্রমতে, প্রতিবছর হজ মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই সৌদি আরবের সঙ্গে হজ চুক্তি শেষে হজ-প্যাকেজ ঘোষণা করে বাংলাদেশ। ডিসেম্বরের শেষে বা জানুয়ারির প্রথম দিকে এ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। তবে এ বছর এখনো কোনো চুক্তি বা প্যাকেজ ঘোষণা হয়নি। তাছাড়া হজের আগে নিবন্ধন কার্যক্রম চললেও এ বছর নতুন করে কোনো হজযাত্রী নিবন্ধন করা হয়নি।

এদিকে করোনা টিকার বিষয়ে সৌদির নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৫ মার্চ ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় হজ নিয়ে একটি বৈঠক করে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর, হজ এজেন্সির মালিকদের সংগঠন হাব-সহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন। সৌদি আরব যেহেতু ভ্যাকসিন গ্রহণকারীদের হজে যেতে দেবে, সেই ঘোষণার ভিত্তিতে প্রস্তুতির পক্ষে মত দেন বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা। সিদ্ধান্ত হয়, ২০২০ সালে হজে যাওয়ার জন্য যারা নিবন্ধন করেছিলেন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের ভ্যাকসিন দিয়ে হজের জন্য প্রস্তুত করা হবে।

দেশে ৪০ বছরের নিচের বয়সীদের করোনার ভ্যাকসিন নেয়ার সুযোগ না থাকায় বৈঠকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয় ১৮ বছরের উপর ও ৪০ বছরের নিচে নিবন্ধিত হজযাত্রীদের ভ্যাকসিন দেয়ার সুযোগ দিতে। সে সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা নিবন্ধিত সব বয়সী হজযাত্রীদের ভ্যাকসিন দেয়ার আশ্বাস দেন। মের মধ্যে হজের জন্য নিবন্ধনকৃতদের টিকার দুটি ডোজ দেয়ার ব্যবস্থা করতে স্বাস্থ্য অধিদফতরে অনুরোধ করেছে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

১৬ মার্চ এক বিজ্ঞপ্তিতে ধর্ম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ বছরের হজের আগাম প্রস্তুতি হিসেবে সরকারি ও বেসরকারি সিস্টেমে নিবন্ধিত ৬০ হাজার ৭০৬ জনকে করোনার ভ্যাকসিন নিতে হবে। এরমধ্যে ১৮ বছরের উপরে ও ৪০ বছরের নিচে রয়েছেন ৪ হাজার ৮৩৩ জন। ৪০ বছরের ঊর্ধ্বে আছেন ৫৫ হাজার ৮৭৩ জন।

বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মাধ্যমে চলতি মার্চের মধ্যে কোভিড-১৯ টিকার প্রথম ডোজ ও মে মাসের মধ্যে টিকার দ্বিতীয় ডোজ প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মে সর্বশেষ ২০২০ সালে বাংলাদেশ থেকে এক লাখ ৩৭ হাজার ১৯৮ জনকে হজ পালনের সুযোগ দেয়ার কথা ছিল। তবে করোনার কারণে কেউ সে সুযোগ পাননি। এবারো কতজন যেতে পারবেন তা এখনো অনিশ্চিত।

এদিকে এ বছর হজ অনুষ্ঠিত হলেও খরচ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে হাব সভাপতি বলেন, ‘সৌদি আরব আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলেই সব পরিষ্কার হবে। নতুন কোনো চার্জ ধরছে কি না, হজযাত্রীদের আবাসন ব্যয় কেমন হবে- এসব জানার পর খরচ বলা সম্ভব হবে।

এদিকে আসন্ন হজের জন্য বয়স নির্ধারণ ছাড়াও বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে সৌদি সরকার। দেশটির একটি গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, হজে অংশগ্রহণকারীদের সৌদি আরবে অবতরণের কমপক্ষে এক সপ্তাহ আগে করোনা ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া সৌদি আরবে অবতরণের ৭২ ঘণ্টা আগে করা কোভিড-১৯ পিসিআর টেস্টের নেগেটিভ রিপোর্টও সঙ্গে রাখতে হবে এবং সৌদি আরবে আসার পর ৭২ ঘণ্টা কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে।

দেশটির হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী প্রতিটি গ্রুপ হবে ১০০ জনের। সৌদিতে গিয়ে আবার পিসিআর টেস্ট করতে হবে এবং নেগেটিভ রিপোর্ট আসার পর কোয়ারেন্টিন সমাপ্ত করতে হবে। হজের সময় স্বাস্থ্য প্রটোকল প্লান অনুযায়ী হাজি এবং হজের কর্মীরা আলাদা ব্যাজ পরিধান করবেন। পাশাপাশি পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

 



poisha bazar

ads
ads