তরুণরা এবার বেশি আক্রান্ত


  • সেলিম আহমেদ
  • ১৫ মার্চ ২০২১, ১০:৩২,  আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২১, ১০:৩৮

প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ফের বাড়ছে। এখনই স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে না মানলে সামনে আরো বড় ‘বিপদ’ দেখছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এই ঊর্ধ্বগতিকে করোনার ‘দ্বিতীয় ঢেউ’ বলেও মনে করছেন তারা।

আশঙ্কার বিষয় হল- এখন যারা আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের বেশিরভাগই তরুণ। আক্রান্তদের অনেককেই আইসিইউতে রাখতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক। গত এক দিনে আরো ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, ১ হাজার ১৫৯ জনের দেহে করোনা সংক্রমণ ধরা পড়েছে।

দৈনিক শনাক্ত রোগীর এই সংখ্যা গত আড়াই মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আর এক দিনে মৃত্যুর এই সংখ্যা গত ৭ সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে গত ২৪ জানুয়ারি ২০ জনের মৃত্যুর খবর এসেছিল। করোনার এই ঊর্ধ্বগতিতে এরইমধ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।

সংক্রমণ রোধে মাস্ক পরা নিশ্চিতকরাসহ স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনের ওপর জোর দিয়ে এক প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এতে দেশের সকল বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসাদের বিষয়টি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়েছে। করোনার এই ঢেউ মোকাবিলায় সব হাসপাতাল প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

একাধিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দ্রুত ছড়িয়ে পড়া যুক্তরাজ্যের করোনা ভাইরাসের নতুন ধরন বাংলাদেশে শনাক্ত হয়েছিল জানুয়ারিতে- তা এতদিন গোপন ছিল। মার্চে এসে তা প্রকাশ করে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক এবিএম খুরশীদ আলম বলেন, যুক্তরাজ্য ও আফ্রিকায় শনাক্ত হওয়া করোনা ভাইরাসের নতুন ধরনের কারণে দেশে সংক্রমণ বাড়ছে কি না ‘জিনোম সিকোয়েন্স’-এর মাধ্যমে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বর্তমান সময়ে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘অনেকে সন্দেহ করছে যুক্তরাজ্যের ভ্যারিয়েন্টের কারণে বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু ওই ভ্যারিয়েন্ট সারা দেশে ছড়িয়ে গেছে আগের ভ্যারিয়েন্টকে রিপ্লেস করে- এটা এত তাড়াতাড়ি সম্ভব নয়। সুতরাং এই একটা জিনিস দিয়ে এটাকে ব্যাখ্যা করা যাবে না। আরো অন্য বিষয় থাকতে পারে।’

সংক্রমণ বাড়ার আরো কারণ ব্যাখ্যা করে জাতীয় পরামর্শক কমিটির এ সদস্য বলেন, ‘শীতকালে আমাদের অন্যান্য ভাইরাস খুব বেশি সংক্রমিত হয়েছিল- সর্দি-কাশি, জ্বরজারিতে। রেসপিরেটরি রুটে যদি একটা ভাইরাস ঢুকে যায়, অন্য ভাইরাসকে ঢুকতে দেয় না। দেশি ভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধির ফলে হয়তো করোনা ভাইরাস সেভাবে সুযোগ পায়নি। এ কারণে হয়তো শীতকালে সংক্রমণ কমে গিয়েছিল। এখন গ্রীষ্মকাল আসছে, শীতকালের ভাইরাসগুলো কমে গেছে। এখন আবার করোনা ভাইরাস সুযোগ পেয়েছে। আবার সংক্রমণ বাড়ছে। খুব বেশি বাড়বে বলে মনে হয় না, এটা আমাদের ধারণা। বলছি না যে, এটা সত্য, প্রমাণিত। আমার ধারণা, এই সংক্রমণ সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত যেতে পারে। তারপর ওইভাবেই থাকবে। গত বছর যেমন ২০, ২২ এমনকী ৩১ শতাংশ পর্যন্ত হয়েছিল; ওই রকম হবে না।’

কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি না মানলে সামনে বড় বিপদের শঙ্কা দেখছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক এবিএম খুরশীদ আলম। রবিবার রাজধানীর শ্যামলীর টিবি হাসপাতালে ওয়ান স্টপ টিবি সেন্টারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে তিনি বলেন, এখন যারা আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের বেশিরভাগই তরুণ, আক্রান্তদের অনেককেই আইসিইউতে ভর্তি করা লাগছে। গত দুই মাসে আমার কাছে কখনোই আইসিইউ বেডের জন্য কোনো অনুরোধ আসেনি। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে ফোন পাচ্ছি আইসিইউ বেড পাওয়া যাচ্ছে না, ব্যবস্থা করে দেন। এখন যারা আক্রান্ত হচ্ছেন। আগে আমরা দেখছিলাম যাদের কোমর্বিডিটি (অন্যান্য অসুস্থতা) আছে তাদের আইসিইউ লাগত। এখন ইয়াং, ভালো, সুস্থ, তারাও আক্রান্ত হচ্ছেন।

তিনি বলেন, এরইমধ্যে সিভিল সার্জন অফিসগুলোয় চিঠি পাঠানো হয়েছে- সারা দেশে আইসিইউগুলো প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। ডিভিশনাল হাসপাতাল এবং ঢাকায় যতগুলো হাসপাতাল আছে, সেগুলোর পরিচালকদের সঙ্গে বসেছিলাম, তাদের সুবিধা-অসুবিধা কার কী অবস্থা আমরা সেগুলো শুনেছি। সেভাবেই আমরা ব্যবস্থা করছি। তাদের বলেছি যে কয়টা বেড আছে, আপনারা রেডি রাখেন।

স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে জোর দিতে ডিসি ও ইউএনওদের চিঠি: দেশে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ আবার বাড়তে থাকায় সবার স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে জোর দিয়ে বিভাগীয় কমিশনার, ডিসি ও ইউএনওদের চিঠি দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। গত শনিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘সম্প্র্রতি করোনা সংক্রমণের হার এবং মৃত্যুর হার গত কয়েক মাসের তুলনায় কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। সংক্রমণের হার রোধের জন্য সর্বক্ষেত্রে সকলের মাস্ক পরিধানসহ স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’

সকলের মাস্ক পরা নিশ্চিত করাসহ স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনের বিষয়টি পর্যবেক্ষণের জন্য বিভাগীয় কমিশনার, ডিসি ও ইউএনওদের অনুরোধ জানানো হয়েছে চিঠিতে।

করোনায় আরো ১৮ জনের মৃত্যু, শনাক্ত আরো ১১৫৯: দেশে গত এক দিনে আরো ১ হাজার ১৫৯ জনের মধ্যে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে, মৃত্যু হয়েছে ১৮ জনের। দৈনিক শনাক্ত রোগীর এই সংখ্যা গত আড়াই মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এর আগে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর এর চেয়ে বেশি রোগী শনাক্তের খবর দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদফতর। সেদিন মোট ১ হাজার ২৩৫ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। আর এক দিনে মৃত্যুর এই সংখ্যা গত সাত সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২৪ জানুয়ারি ২০ জনের মৃত্যুর খবর এসেছিল।

সংক্রমণ বাড়তে থাকায় পরীক্ষার তুলনায় দৈনিক শনাক্তের হারও ৪ জানুয়ারির পর প্রথমবারের মত ৭ শতাংশ পেরিয়ে গেছে। গত একদিনে পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার ৭ দশমিক ১৫ শতাংশ ছিল বলে স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে।

রবিবার সকাল পর্যন্ত আরো এক হাজার ১৪ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়ায় দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৩৯৫ জন হয়েছে। আর গত এক দিনে মারা যাওয়া ১৮ জনকে নিয়ে দেশে করোনা ভাইরাসে মৃত্যু বেড়ে ৮ হাজার ৫৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

 



poisha bazar

ads
ads