• বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১
  • ই-পেপার

সর্বস্তরে বাংলা প্রচলন হয়নি


poisha bazar

  • সেলিম আহমেদ
  • ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০৯:৩৭

আজ থেকে ৬৯ বছর আগে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছিল বাংলার দামাল ছেলেরা। তবে স্বাধীন বাংলাদেশে আজও নিশ্চিত হয়নি সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন। উচ্চ আদালত, প্রশাসন, শিক্ষা-দীক্ষাসহ সর্বত্র ইংরেজির দাপট। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যাবহার নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট আইন ও হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকার পরও তা তোয়াক্কা করছেন না অনেকেই।

এখনো আদালতের রায় লেখা হয় ইংরেজিতে, চিকিৎসকরা ব্যবস্থাপত্রও লেখেন ইংরেজিতে। আজও রাস্তা-ঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমা, হাসপাতাল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম থেকে শুরু করে সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার-ফেস্টুন, বিজ্ঞাপনে ইংরেজির ছড়াছড়ি। বিষয়টি ভাষা আন্দোলনের চেতনাবিরুদ্ধ বলে মনে করেন দেশের ভাষাসৈনিক, বুদ্ধিজীবী ও বিশ্লেষকরা।

ভাষাসৈনিক ও কবি আহমদ রফিক মানবকণ্ঠকে বলেন, দেশের সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন করতে চাওয়া হয়নি, তাই হয়নি- জবাব একটাই। এখন সরকার যদি সর্বস্তরের বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে না চায় তাহলে করার কিছু নেই। এখন তরুণদের উচিত সব জায়গায় বাংলা নিশ্চিত করতে সংগ্রামে নামা।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন হচ্ছে না। নামফলকে বাংলা উধাও হচ্ছে, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সর্বোচ্চ আদালতেও বাংলার প্রচলন হয়নি। উদাসীনতা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা না থাকার কারণেই এমনটি হচ্ছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য গোটা ব্যবস্থারই পরিবর্তন দরকার। মানসিক ও সামাজিক বৈপ্লবিক পরিবর্তন দরকার।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট কর্তৃক ঘোষিত প্রথম মাতৃভাষা পদক-২০২১ প্রাপ্ত জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা লেখা থাকলেও সত্যিকার অর্থে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গড়ে তোলা যায়নি। কেবল একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই এ নিয়ে আলোচনা হয়, আর সারাবছর কারো কাছে কোনো গুরুত্ব থাকে না।

তিনি বলেন, ‘ভাষা আন্দোলন দেখেই আমাদের শুরু। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় জীবন কেটেছে ভাষা আন্দোলন নিয়ে। কিন্তু যে ভাষা আন্দোলন থেকে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু, সেই স্বাধীন দেশে বাংলাকে এখনো আমরা পুরো রাষ্ট্রভাষা করতে পারিনি। নইলে স্বাধীনতার এত বছর পরেও কেন বিচারপতিদের উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রীকে বলতে হবে যে, দয়া করে রায়টা ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাতেও দেবেন।’

শিক্ষাক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি নৈরাজ্য চলছে- উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনে ছিল প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষার মাধ্যম হবে বাংলা। পাশাপাশি ইংরেজি বা অন্য ভাষাগুলো ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু ওই সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। বরং আমরা উল্টোটা করেছি। কারণ আমাদের বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি ভার্সন, ইংরেজি মিডিয়াম, আলিয়া মাদ্রাসা, কওমি মাদ্রাসা আরো কত কী আছে। আমাদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সবই দরকার। কিন্তু আমরা কোনো ভাষাই ভালো করে শিখাচ্ছি না, এমনকী বাংলাও না।’

প্রত্যাশার জায়গা প্রসঙ্গে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আশা করি শিক্ষার মাধ্যম শিশু শ্রেণি থেকে উচ্চতর পর্যায় পর্যন্ত বাংলা হবে। সেটা ইঞ্জিনিয়ারিং হোক কিংবা মেডিকেল হোক। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজিটাও থাকবে। উচ্চশিক্ষায় প্রচুর বাংলা গ্রন্থ রচনা হবে।’

ভাষা সৈনিক ও কলামিস্ট রণেশ মৈত্র মানবকণ্ঠকে বলেন, ১৯৪৮ থেকে ’৫২- ওই যুগে যে চেতনা আমাদের বিকাশ লাভ করেছিল সেই চেতনার জায়গা থেকে আমার পিছিয়ে এসেছি। আমাদের অধিকাংশ অভিবাবক সন্তানদের ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়তে দিচ্ছি। পাঠাচ্ছি মাদ্রাসায়। কিন্তু ভাষা আন্দোলনে কথা ছিল- একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সেটা মাতৃভাষার মাধ্যমে। সেখান থেকে আমার পুরোপুরি সরে গেছি এখন। এতে একদিকে যেমন বাংলা গুরুত্ব পাচ্ছে কম, অপরদিকে দেখা যাচ্ছে যারা ইংরেজি মাধ্যমে লেখাপড়া করছে তারা দ্রুত চাকরি পাচ্ছে, বিদেশ যাচ্ছে। এতে একটা বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। আবার আরবি শিক্ষা যারা নিচ্ছে ধীরে ধীরে তাদের একটি অংশ জঙ্গিবাদে দিক্ষিত হচ্ছে। অর্থাৎ ধর্মের নামে তাদের বিপথে চালানো সহজ হচ্ছে। অথচ ভাষা আন্দোলনে কথা ছিল- ধর্মকে কখনো রাজনীতির মধ্যে না আনা। কিন্তু সেটাকে জিয়ার আমলে তেমনি এরশাদ আমলে নৃশংস করা হয়েছে। তারা সেগুলো করে গেছে তা আমরা এখনো বহাল রাখছি। তার ফলে নতুন প্রজন্ম বুঝতেই পারছে না ভাষা আন্দোলনের মূল আদর্শ কী, মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা কী? এই জায়গায় আমাদের পশ্চাৎপদতা, জাতীয় সর্বনাশের নেপথ্য।

মাতৃভাষা সংরক্ষণ, পুনরুজ্জীবন, বিকাশ নিয়ে কাজ করা খাগড়াছড়ির জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, ‘আমাদের দেশে এখনো সরকারি হিসাবে ৫০টির মতো ভাষা রয়েছে। এই ভাষাগুলোর অধিকাংশের প্রচলন এখন কম। লেখালেখিও কম, কারণ এর পেছনে পৃষ্ঠপোষকতা নেই। তাই ভাষাগুলো যেরকম বিকাশ হওয়ার কথা, সেরকম নেই। এর পেছনে সরকারের যদি অব্যাহত প্রক্রিয়া থাকে, তাহলে এই ভাষাগুলো হারিয়ে যাবে না।’

তিনি বলেন, ‘এখন অনেকগুলো ভাষাই বিলুপ্তপ্রায় অবস্থায় আছে। সেগুলো আশা করি হারিয়ে যাবে না। প্রতিটি ভাষা যেন আত্মমর্যাদা নিয়ে টিকে থাকতে পারে, এমনটাই আমার প্রত্যাশা। কারণ কোনো ভাষা যদি হারিয়ে যায়, তবে সেই ভাষার বা সেই অঞ্চলের একটা জ্ঞানভাণ্ডার হারিয়ে যায়।’

সরেজমিনে গত কয়েকদিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন যে শহরের তরুণরা সেই শহরের রাস্তাঘাট, ব্যাংক-বিমা, দেশি-বিদেশি কোম্পানি, বেসরকারি সংস্থা, সরকারি-বেসরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, বিপণিবিতানগুলোর সাইনবোর্ড বা পরিচয়ফলক ও নামফলক থেকে বাংলা উধাও হতে চলেছে। শুধু রাজধানী নয় সারা দেশেই একই চিত্র। অথচ এসব ক্ষেত্রে বাংলায় সাইনবোর্ড লেখা বাধ্যতামূলক করে হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা দেয়া হয়।

দেশের গণমাধ্যমেও রয়েছে ইংরেজির একক দাপট। দেশের বেশিরভাগ গণমাধ্যমের নাম ইংরেজিতে। কেন? এফএম রেডিওগুলো এখনো দেদারসে বাংলা-ইংরেজি-হিন্দি মিশ্রণে বিকৃত ভাষার ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক টেলিভিশনের নামসহ লোগোও ইংরেজিতে লেখা হয়। বেশিরভাগ টেলিভিশন ‘সংবাদ’-কে বলে ‘নিউজ’।

বাংলার ভাষার প্রচলন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজসমূহের ভ‚মিকাও এক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার শিক্ষার্থীদের ভর্তি প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে পরীক্ষা, সিলেবাস, প্রশ্নপত্র, সনদপত্র সবকিছুতেই ইংরেজি ব্যবহার করছে।

অথচ বাংলা ভাষা প্রচলন আইন হয় ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ। ওই বছরের ১২ এপ্রিল সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছেন যে, ভবিষ্যতে সকল নতুন আইন, অধ্যাদেশ, বিধি ইত্যাদি অবশ্যই বাংলায় প্রণয়ন করিতে হইবে।’ ১৯৭৯ সালের ২৪ জানুয়ারি সর্বস্তরে বাংলা ভাষা নিশ্চিত করতে মন্ত্রিসভা ৯টি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ওই বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ১০ সচিবের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়। এর কয়েক মাস পর ৩ মে বঙ্গভবনের আদেশে বলা হয়, সব নোট, সার-সংক্ষেপ বা প্রস্তাবটি বাংলায় উপস্থাপনা করা না হলে রাষ্ট্রপতি তা গ্রহণ করবেন না। ৪ মে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ-সংক্রান্ত আদেশটি সবাইকে অবহিত করে।

১৯৮৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের আদেশে বলা হয়, ‘রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরা বারবার সকল স্তরে বাংলা প্রচলনের আদেশ দিলেও আংশিক কার্যকরী হইয়াছে, কোথাও হয়নি।’ এতে জনসাধারণের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হচ্ছে। সরকার অনভিপ্রেত সমালোচনার মুখে পড়ছে। এই ক্ষোভ ও সমালোচনার মধ্যেই ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেসকো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এক আদেশে দেশের সব সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বর প্লেট, সরকারি দফতরের নামফলক এবং গণমাধ্যমে ইংরেজি বিজ্ঞাপন ও মিশ্র ভাষার ব্যবহার বন্ধ করতে ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন সরকারকে। আদালতের ওই আদেশের ৩ মাস পর ২০১৪ সালের ১৪ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডগুলোকে আদেশটি কার্যকর করতে বলে।

কিন্তু তা না হওয়ায় ২০১৫ সালের ১৮ আগস্ট আদালত কড়া ভাষায় বলেন, বাংলা ব্যবহারে দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি নেই। পরে ২০১৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি এক চিঠির মাধ্যমে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বর প্লেটে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার অনুরোধ জানায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর লেখা ওই চিঠিতে বলা হয়, সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার ইংরেজির স্থলে বাংলায় প্রতিস্থাপিত হয়েছে বলে দেখা যায় না। এটা বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, হাইকোর্টের রুল ও আদেশের পরিপন্থী। এরপর সরকার একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে।

এতে বলা হয়, যেসব প্রতিষ্ঠানের (দূতাবাস, বিদেশি সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র ব্যতীত) নামফলক, সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার ইত্যাদি এখনো বাংলায় লেখা হয়নি, তা নিজ উদ্যোগে অপসারণ করে আগামী ৭ দিনের মধ্যে বাংলায় লিখে প্রতিস্থাপন করতে হবে। না হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 






ads
ads