সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ না দেয়ার অভিযোগ


poisha bazar

  • সাইফুল ইসলাম
  • ২৭ জানুয়ারি ২০২১, ১০:১১

সর্বনিম্ন দরদাতাকে পাশ কাটিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানকে বেশি দরে কাজ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদফতরের ‘শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন প্রকল্পে (২য় পর্যায়)’। এই প্রকল্পের আওতায় ‘স্কুল অব ফিউচারের জন্য সফটওয়্যার তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ’ স্থাপনের সর্বনিম্ন দরদাতা থেকে ৭৯ লাখ ২৩ হাজার টাকা বেশি দরে ‘টিম ক্রিয়েটিভ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজটি দেয়ার চূড়ান্ত অবস্থায় রয়েছে।

তবে ‘টিম ক্রিয়েটিভ’-এর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদফতরের মহাপরিচালকের বরাবর অভিযোগ দিয়েছেন সিনটেক আইটি সলিউশন বলে জানা গেছে।

সূত্রে জানা যায়, আইটি সেক্টরে ‘টিম ক্রিয়েটিভ’ নামের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটির বড় ধরনের কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। প্রতিষ্ঠানটিতে পর্যাপ্ত লোকবলও নেই। অথচ কারিগরি প্রস্তাবে তাদের দেয়া হয়েছে সর্বোচ্চ নম্বার। এমন একটি প্রতিষ্ঠানকে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন প্রকল্পে (২য় পর্যায়)-এর আওতায় ‘স্কুল অব ফিউচারের জন্য সফটওয়্যার তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ’ স্থাপনের ১৫ কোটি টাকার কাজ দিতে যাচ্ছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদফতর।

অথচ সর্বনিম্ন দর দিয়েও কাজ পায়নি সিনটেক আইটি সলিউশনসহ আরো চার প্রতিষ্ঠান। গত ১১ জানুয়ারি সোমবার বিকালে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব প্রকল্প (২য় পর্যায়)-এর আওতায় ‘স্কুল অব ফিউচারের জন্য সফটওয়্যার তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের’ জন্য ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের করতে আর্থিক প্রস্তাব উন্মুক্তকরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে দরপত্রের আহ্বান করে অধিদফতর।

প্রাথমিকভাবে ৩০০টি স্কুল অব ফিউচার স্থাপনের জন্য প্রথমে ৬টি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশগ্রহণ করে। সেখানে সিনটেক স্যলুয়েশন লি., সিনেসিস আইটি, টিম ক্রিয়েটিভ, আদি সফ্ট আইটি, বিটুএম ও অরেঞ্জ বিডি গ্রুপ ছিল।

তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, সিনটেক আইটি সলিউশন ১৪ কোটি ৯৪ লাখ ৬০ হাজার টাকার, সিনেসিস আইটি ১৮ কোটি ৭২ লাখ ২৭ হাজার ২৫০ টাকার, আদি সফ্ট আইটি ১৬ কোটি ৯ লাখ ৮৯ হাজার ২০০ টাকার, বিটুএম ১৯ কোটি ৪৩ লাখ ৫০ হাজার ৬৯০ টাকার, অরেঞ্জ বিডি গ্রুপ ১৬ কোটি ১৭ লাখ ৩৪ হাজার টাকার ও টিম ক্রিয়েটিভ আইটি ১৫ কোটি ৭৩ লাখ ৮৩ হাজার টাকা প্রস্তাব করে দরপত্রে অংশ নেয়। সেখানে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে দেখা যায় সিনটেক স্যলুয়েশন লিমিটেডকে। পরবর্তীতে কারিগরি প্রস্তাবে নাম্বার দেয়া এই ৬ প্রতিষ্ঠানকে।

সেইগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সিনটেক স্যলুয়েশন লি. কারিগরিতে পেয়েছিলেন ৮০, সিনেসিস আইটি ৭৬.১৪, টিম ক্রিয়েটিভ ৯২.২৯, আদি সফ্ট আইটি ৮০.৫০, বিটুএম ৭২.০৭ ও অরেঞ্জ বিডি গ্রুপ ৭৫.৮৬ নম্বর। সেখানে টিম ক্রিয়েটিভকে সর্বোচ্চ নাম্বার দেয়া হয়। কম নম্বারে দিয়ে সিনটেক আইটি সলিউশন, সিনেসিস আইটিসহ অন্য পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে বাদ দেয়া হয়।

এরই মধ্যে সিনটেক সল্যুয়েশন লি. ও অবলিভীয়ন সল্যুয়েশন নামে প্রতিষ্ঠান প্রকল্প পরিচালক এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদফতরের মহাপরিচালকের বরাবর দুইটি পৃথক অভিযোগ দাখিল করেছেন। যদিও প্রথম অভিযোগের জবাব দিয়েছে প্রকল্প পরিচালক মো. রেজাউল মাকছুদ জাহেদী। বিভিন্ন অনিয়মের প্রতিবাদে গত ১২ জানুয়ারি প্রকল্প পরিচালক রেজাউল মাকসুদ জাহেদী বরাবর পিপিআর ২০০৮ এর ৫৭(১) ধারা মোতাবেক অভিযোগ দেয় জেবি সিনটেক আইটি সলিউশন।

সেই অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, প্রকল্প কর্তৃপক্ষ টিম ক্রিয়েটিভ ও স্টার কম্পিউটার লি. কে কাজ দেয়ার লক্ষ্যে অবৈধ পন্থায় তাদের কারিগরি প্রস্তাবে সর্বোচ্চ নাম্বার দেয়। এর আগে বড় পরিসরে কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই বলেও টিম ক্রিয়েটিভের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়। সবচেয়ে কম দর আহ্বান করেও কাজটি থেকে বঞ্চিত হন সিনটেক আইটি সলিউশন।

অন্যদিকে টিম ক্রিয়েটিভ ৭৯,২৩,০০০ টাকা বেশি প্রস্তাব করে দরপত্রে অংশ নিয়ে কৌশলে কাজটি বাগিয়ে নিচ্ছে। টিম ক্রিয়েটিভ কোম্পানিকে কাজ দেয়ায় সরকারের ৭৯ লাখ ২৩ হাজার আর্থিক ক্ষতি হবে। এরই মধ্যে গত ২১ জানুয়ারি প্রকল্পের পরিচালক রেজাউল মাকসুদ জাহেদী প্রথম অভিযোগের জবাব দিয়েছেন।

তিনি জবাবে লেখেন, প্রকল্প দফতর উক্ত অভিযোগ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০০৮-এর ৫৭(৪) অনুযায়ী সকল ডকুমেন্ট পর্যালোচনা ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হয়। ‘টিম ক্রিয়েটিভ’ কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। আরএফপির শর্তানুযায়ী জনবল যোগ্যতাসহ তথ্যাদি রয়েছে। অন্যান্য অভিযোগের কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি। অভিযোগটি সঠিক নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

গত ২৪ জানুয়ারি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদফতরের মহাপরিচালকের বরাবর আরো একটি অভিযোগ দাখিল করেন সিনটেক সল্যুয়েশন লি. ও অবলিভীয়ন স্যলুয়েশন নামে প্রতিষ্ঠান। সেখানে দেখা যায়, এই কাজের আরএফপি (কাজ করার শর্ত) ডকুমেন্ট টিম ক্রিয়েটিভের কর্মকর্তা বদর’দ্দোজা তুহিন প্রস্তুত করে দিয়েছেন। অধিদফতরের দেয়া আরএফপি ডকুমেন্ট রিভিউ ক্লিক করলেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। যেহেতু আরএফপি (কাজ করার শর্ত) ডকুমেন্ট বানানোতেই প্রমাণ মিলে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। যদি আরএফপি (কাজ করার শর্ত) অধিদফতরের লোকজন তৈরি করে দেয়া কথা ছিল।

অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠান অবলিভীয়ন সলুয়েশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারিক বিন আজিজ বলেন, আমাদের অভিযোগের প্রথমটি জবাব দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। দ্বিতীয় অভিযোগের জবাব এখনো পাইনি। তবে অভিযোগগুলো চলমান থাকবে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে শেখ রাসেল ল্যাব স্থাপন প্রকল্প (২য় পর্যায়) এর প্রকল্প পরিচালক মো. রেজাউল মাকছুদ জাহেদী মানবকণ্ঠকে বলেন, প্রথমে আমরা একটি প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সক্ষমতা দেখি। টেন্ডারের ফাইন্যান্সিয়ালটা খোলার কোনো সুযোগ নেই। কারিগরি সক্ষমতার ভিত্তিতে টেন্ডারে অংশ নেয়া ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা র‌্যাংকিং করি। প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূল্যায়নের জন্য যে কমিটি আছে সেই কমিটিই মূল্যায়ন করে ওই নাম্বার দেয়। এটা পাওয়ার পরে প্রতিষ্ঠানগুলো যে ফাইন্যান্সিয়াল দর দেয় এটা তাদের সামনে ওপেন করি। আগে কিন্তু আমরা জানি না, কে কত দর দিল।

তিনি আরো বলেন, কারিগরি দক্ষতা সব সময় গুরুত্বপূর্ণ। কারিগরি ও ফিন্যান্সিয়াল নম্বর যোগ করে কাজ দেয়া হয়। যে অভিযোগটি তুলা হয়েছে তা সঠিক নয়। আরএফপি ডকুমেন্ট তৈরি করার সময় বিভিন্ন জনের মতামত নেই। এটা হচ্ছে নিয়ম।

‘অধিদফতর আরএফপি ডকুমেন্ট তৈরি করে দেয়ার কথা থাকলেও টিম ক্রিয়েটিভ তৈরি করে দিয়েছে’-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, ‘এটা বলার কোনো সুযোগ নেই। এই ডকুমেন্ট আমরা তৈরি করেছি। এটা তৈরি করার সময় বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের মতামত নেয়ার একটা সুযোগ আছে, সেই সুযোগ আমরা নিয়েছি। তারপর আমরা তাদের কাজ দিয়েছি।’

 






ads
ads