ভ্যাকসিন যুগে বাংলাদেশ


poisha bazar

  • সেলিম আহমেদ
  • ২৭ জানুয়ারি ২০২১, ০৯:৪৮

সেই মহেন্দ্রক্ষণ বুধবার বিকাল সাড়ে ৩টা। সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দেশে শুরু হচ্ছে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধী টিকা প্রয়োগ। শুরু থেকেই টিকা পাওয়া নিয়ে ছিল নানা রকম শঙ্কা। তবে এই টিকা পেতে খুব একটা বেগ পোহাতে হয়নি বাংলাদেশকে।

পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোর কাছাকাছি সময়েই বাংলাদেশ শুরু হচ্ছে টিকা প্রয়োগ। এমনকি বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশ আগেই টিকা পাচ্ছে। রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স রুনু বেরোনিকা কস্তার শরীরে আজ বিকেল সাড়ে ৩টায় পরীক্ষামূলকভাবে করোনার টিকা ‘কোভিশিল্ড’ প্রয়োগের মধ্য দিয়ে শুরু হবে দেশের করোনা টিকা কার্যক্রম।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি সংযুক্ত হয়ে ভ্যাকসিন কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন রাজধানীর গণভবন প্রান্ত থেকে ভিডিও কনফারেন্সেই প্রথম ৫ জনের ওপর টিকার প্রয়োগ সরাসরি প্রত্যক্ষ করবেন তিনি।

রুনু বেরোনিকা কস্তা ছাড়াও প্রথমদিনই টিকা নিবেন সম্মুখ সারিতে থাকা বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিত্বকারী আরো ২৪ জন। সেই তালিকায় চিকিৎসক, নার্স, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, পুলিশ, সেনাবাহিনী, সাংবাদিকসহ অন্য পেশার মানুষ। টিকা কার্যক্রমের জন্য ইতোমধ্যেই সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে কুর্মিটোলা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ অনুষ্ঠান সরাসরি প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশন।

এ প্রসঙ্গে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল আহমদ বলেন, বিকেল সাড়ে ৩টায় প্রাথমিক ‘ড্রাই রান’ করা হবে। প্রথম টিকা গ্রহিতা হিসেবে রুনা বেরোনিকা কস্তার নাম আছে। তবে তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ হলে হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স মুন্নী খাতুন ও রিনা সরকারের মধ্য থেকে একজনের শরীরে প্রথম টিকা প্রয়োগ করা হবে। চিকিৎসক হিসেবে প্রথম টিকা নিবেন কুর্মিটোলা হাসপাতালের মেডিসিন কনসালটেন্ট ডা. আহমেদ লুৎফর মবিন। টিকা কার্যক্রমের জন্য হাসপাতালটির চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীসহ প্রায় ১০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।

প্রতিক্রিয়া জানিয়ে প্রথম টিকা গ্রহিতা রুনা বেরোনিকা কস্তা বলেন, হাসপাতাল পরিচালক তাকে ডেকে পাঠিয়েছেন এবং প্রথম টিকা তার শরীরে দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন। তবে প্রথম টিকা গ্রহিতা হিসেবে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে অনুভূতি জানাতে রাজি হননি।

টিকা কার্যক্রম উদ্বোধনের পরদিন বৃহস্পতিবার এই হাসপাতালের সঙ্গে রাজধানীর আরো চারটি হাসপাতালের ৪০০ থেকে ৫০০ জন স্বাস্থ্যকর্মীর শরীরে পরীক্ষামূলক টিকা প্রয়োগ শুরু হবে। এগুলো হচ্ছে- ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, কুয়েত মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল। টিকা প্রয়োগের পর তাদের এক সপ্তাহ রাখা হবে নিবিড় পর্যবেক্ষণে।

পর্যবেক্ষণের ফল দেখে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে সারাদেশে একযোগে শুরু হবে গণটিকাদান কার্যক্রম। অনলাইনে নিবন্ধনের মধ্যমে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ৬০ লাখ মানুষকে প্রথম মাসেই টিকা দেয়া হবে।

এদিকে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে প্রথম চালানে আসা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ৫০ লাখ টিকা মানবদেহে প্রয়োগের অনুমতি দিয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর। মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুবুর রহমান বলেন, টিকার প্রতিটি লটের নমুনা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। এই টিকা দিয়েই আজ শুরু হবে করোনাভাইরাসের টিকাদান।

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের টিকাদান কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি দেখতে এসে মঙ্গলবার বিকেলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সাংবাদিকদের বলেন, এই হাসপাতালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনাভাইরাসের টিকাদান কর্মসূচি উদ্বোধন করবেন। এর মাধ্যমেই দেশে টিকা দেয়া শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে সুরক্ষা অ্যাপের মাধ্যমে করোনাভাইরাসের টিকার জন্য নিবন্ধন কার্যক্রমও চালু হয়ে যাবে।

তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার ঢাকার পাঁচটি হাসপাতালের ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে টিকা দেয়া হবে। বাংলাদেশে যেহেতু এ টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হয়নি, তাই প্রথম দফায় ঢাকার পাঁচটি হাসপাতালে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর প্রয়োগ করে দেখা হবে। সব ঠিক থাকলে ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হবে সারা দেশে টিকাদান কার্যক্রম। এর আগে ৮ ফেব্রুয়ারির কথা বলা হলেও আমরা ৭ তারিখেই সারা দেশে এ কার্যক্রম শুরু করার চিন্তা করছি।

টিকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ প্রসঙ্গে জাহিদ মালেক বলেন, টিকা আনা হয়েছে বাংলাদেশের মানুষকে রক্ষা করতে, শরীরে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। এজন্য গত ৯ মাস ধরে কাজ করে আসছে সরকার। কাজেই করোনাভাইরাসের টিকা সরকারের কাছে কোনো রাজনীতি নয়। এটা মানুষের জীবনরক্ষা করতে আনা হয়েছে। যারা এই টিকা নিয়ে বিরূপ প্রচার চালাচ্ছেন, তারা ভালো কাজ করছেন না। তারা এদেশের মানুষের মঙ্গল কামনা করলে এটা নিয়ে বিরূপ প্রচারণা চালাবেন না।

রাজধানীর যে পাঁচ হাসপাতালে পরীক্ষামূলক টিকা প্রয়োগ করা হবে সেসব হাসপাতালের পরিচালকরা বলেন, তারা ভ্যাকসিন কর্মসূচি চালু করতে ইতোমধ্যেই সকল প্রস্তুতি নিয়েছেন। তবে তাদের কেউ কেউ বলছেন, জাতীয়ভাবে কর্মসূচি চালু হওয়ার পর কিছুটা সমস্যা হতে পারেÑযেটা চ্যালেঞ্জ মনে হচ্ছে। তবে সেসব কিছু মাথায় নিয়েই কাজ করছেন তারা। প্রথমদিন যদি সবকিছু ঠিক ভাবে করা যায়, তাহলে মানুষের আস্থা আসবে, ধীরে ধীরে ভ্যাকসিন নিতে মানুষ উদ্বুদ্ধ হবে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক বলেন, আমাদের অনেক চিকিৎসকই প্রথম দিনে টিকা নিতে আগ্রহী। তবে আমি নিজে হাসপাতালের পরিচালক হিসেবে প্রথম টিকা নিতে আগ্রহী- আমার সহকর্মীদের টিকা নিতে উদ্বুদ্ধ করতে, উৎসাহ দেওয়ার জন্য, আস্থা জোগাতে। ইতোমধ্যেই আমাদের হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয়, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, টেকনোলজিস্ট, আনসারসহ সব বিভাগের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে এই ১০০ জনকে বাছাই করা হয়েছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিচতলাতে ভ্যাকসিন নেয়ার জন্য বুথ চালু করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক (হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুলফিকার আমিন জানান, আমাদের প্রিপারেশন অলমোস্ট আমরা শেষ করে ফেলেছি। গত ২৪ জানুয়ারি এ হাসপাতালে করোনার টিকাদান কর্মসূচি কিভাবে পরিচালিত হবে সে বিষয়ে একটি মিটিং হয়।

তিনি জানান, যখন সাধারণ মানুষের জন্য জাতীয়ভাবে টিকাদান কর্মসূচি চালু হবে তখন এ হাসপাতালে মোট আটটি বুথ থাকবে এবং প্রতিটি বুথে টিকা দেওয়ার জন্য দুইজন নার্স এবং চারজন করে স্বেচ্ছাসেবক থাকবেন। ভ্যাকসিন দেওয়ার পর পোস্ট ওয়েটিং রুমে ভ্যাকসিন গ্রহীতাদের জন্য জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে তারা ৩০ মিনিট পর্যবেক্ষণে থাকবেন। আর এই সময়ে তাদের পর্যবেক্ষণের জন্য থাকবে একটি মেডিক্যাল টিম এবং স্ট্যান্ডবাই আরেকটি মেডিক্যাল টিম থাকবে যেখানে একজন ইন্টারনাল মেডিসিন স্পেশালিস্ট, দুইজন রেসিডেন্স এবং একজন আইসিইউ স্পেশালিস্ট থাকবেন।

টিকার সুষ্টু ব্যবস্থপনা প্রসঙ্গে দেশের প্রখ্যাত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী মানবকণ্ঠকে বলেন, টিকা প্রয়োগ নিয়ে জাতীয়ভাবে যে গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে তার উপর ভিত্তি করে যেন টিকা প্রয়োগ করা হয়। তার যেন কোনো ব্যাত্যয় না হয়। এই সঙ্গে মানুষের মাঝে টিকা নিয়ে যে সংশয় বা দ্বিধা রয়েছে সেগুলো দূর করার জন্য সরকারে একটা উদ্যোগ নিতে হবে। জাতীয়ভাবে প্রচারমাধ্যম ব্যবহার করে জনসাধারণকে এটা জানানো দরকার যে, যারা টিকা নিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে এটি অবৈজ্ঞানিক। এতে কান দেয়ার দরকার নেই।

তিনি বলেন, পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ টিকা নিয়েছে। এদের মধ্যে খুব নগণ্য একটি অংশ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার শিকার হয়েছেন। তারা আবার ভালোও হয়ে গেছেন। আর মৃত্যুর মতো ঘটনা যেগুলো ঘটেছে প্রায় সবগুলোই খোঁজখবর নিয়ে দেখা গেছে এর সঙ্গে করোনার টিকার কোনো যোগসূত্র নেই। অতএব আমরা সবাই করোনার টিকা নিতে পারি। আমাদের দেশে সংক্রমণের গতিটা কমে এসেছে, এটিকে আমার যদি আরো কিছুদিন ধরে রাখতে পারি, সাথে টিকা নিতে পারি তাহলে আমাদের সুরক্ষাটা নিশ্চিত করতে পারব। ব্যক্তি, সমাজ, পরিবার সবার স্বার্থেই আমাদের টিকাটা নিতে হবে।

প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবিএম আব্দুল্লাহ মানবকণ্ঠকে বলেন, অনেক প্রতিক্ষার পর মানুষ টিকা পেতে যাচ্ছে। এটি অত্যন্ত খুশির খবর। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশ আগেই টিকা পাচ্ছে- এর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। প্রধানমন্ত্রী টিকার পেছনে সরাসরি লেগে ছিলেন ফলে টিকা দ্রুত পাওয়া সম্ভব হয়েছে।

গত সোমবার এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বিশেষ ফ্লাইট টিকার ওই চালান নিয়ে ঢাকা পৌঁছায়। পরে তা নিয়ে যাওয়া হয় টঙ্গীতে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের ওয়্যারহাউজে। সেখান থেকে প্রতিটি লটের নমুনা পরীক্ষার জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরে পাঠানো হয়।

তিনি বলেন, এই ভ্যাকসিন অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি। যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ সংস্থা এই টিকা ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে এবং সেদেশে এটি প্রয়োগ করা হচ্ছে। ভারতের সেরাম ইন্সটিটিউট বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী বিশ্বামানের টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। গত ১৬ জানুয়ারি থেকে ভারতে এই ভ্যাকসিন প্রয়োগ করছে। ভারতের সেই সব কাগজও পরীক্ষা করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, করোনাভাইরাস মহামারীর এক বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর আশা হয়ে এসেছে এই টিকা। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা ‘কোভিশিল্ড’ ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটেও তৈরি হচ্ছে। এই টিকার তিন কোটি ডোজ কিনতে গত ৫ নভেম্বর সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ সরকার।

চুক্তি অনুযায়ী টিকার প্রথম চালানে ৫০ লাখ ডোজ টিকা দেশে পৌঁছেছে গত মঙ্গলবার। এর আগে ২১ জানুয়ারি দেশে আসে ভারত সরকারের উপহার দেয়া ২০ লাখ ডোজ টিকা। এই ৭০ লাখ টিকার ভেতরে ৬০ লাখ টিকা দেওয়া হবে প্রথম মাসে, দ্বিতীয় মাসে দেয়া হবে ৫০ লাখ, তৃতীয় মাসে দেয়া হবে আবার ৬০ লাখ। প্রথম মাসে টিকা পাওয়াদের দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হবে তৃতীয় মাসে। আর এ হিসাবে ভ্যাকসিন বিতরণ পরিকল্পনা ইতোমধ্যে করা হয়ে গেছে।

ভারত থেকে আসা উপহারের টিকা রাখা হয়েছে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের সরকারি সম্প্রসারিত টিকাদান কেন্দ্র (ইপিআই) স্টোরেজে আর বাংলাদেশের কেনা টিকা রাখা হয়েছে টঙ্গীতে অবস্থিত বেক্সিমকোর ওয়্যারহাউজে। সেখান থেকে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের জেলায় জেলায় টিকা পৌঁছে দেবে বেক্সিমকো।






ads
ads