শিগগিরই কমবে চালের দাম

শিগগিরই কমবে চালের দাম
- মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • ছলিম উল্লাহ মেজবাহ
  • ২৭ জানুয়ারি ২০২১, ০১:১২

চালের দাম শিগগিরই কমে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, আমদানির খবরে এরই মধ্যে চালের দাম বস্তাপ্রতি ৩৫-৫০ টাকা কমেছে। তবে খুচরা পর্যায়ে চালের দাম এখনো স্বাভাবিক হয়ে আসেনি। এখনো বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে দাম। সরু চালের চেয়ে মোটা চালের দাম তুলনামূলক বেশি। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বেশ কয়েকটি পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে।

ভরা মৌসুমে চালের দাম বাড়তি কেনো-এ প্রশ্নের জবাবে বাদামতলী ও বাবুবাজার চাল আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মাদ নিজাম উদ্দিন মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘বাস্তবতা কেউ বুঝতে চায় না, সবাই বলে কেন চালের দাম বাড়ে। এ প্রশ্ন সবাই করে। নানা কারণে কিছু কিছু সময় চালের বাজার উঠা-নামা করে। এটা স্বাভাবিক। কিন্তু যদি সরকার চাল আমদানি না করত তাহলে আরো দাম বাড়ত।’ তিনি আরো বলেন, ‘ভারত থেকে চাল আমদানির কারণে বাজার এখন স্থিতিশীল রয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বাজারে চালের দাম আরো সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে। এদিকে চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। এর ফলে দাম বাড়ার প্রবণতা কিছুটা হলেও কমেছে।

বাবু বাজার চাল আড়তদার মহিউদ্দিন রুকন বলেন, এখন পর্যন্ত বাজারে ভারতীয় চাল দেখা যায়নি। কোনো আমদানিকারকও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। রশিদ মিনিকেটের বস্তা ২ হাজার ৯৫০ টাকায় নেমেছে। একইভাবে পাইজাম চালের বস্তা ২ হাজার ৪০০ টাকা হয়েছে। ডলফিন, মোজাম্মেল, জোড়া কবুতরসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের চালের দাম একই হারে কমেছে।

গত দুই-তিন সপ্তাহ আগেও চালের বাজার ছিল অস্থির। কারওয়ান বাজারে চাল বিক্রেতা আবু রায়হান জগলু বলেন, ‘ভারতীয় চাল বাজারে চলে আসলে দাম কমবে, এই কারণে নতুন করে দেশি চাল তুলছি না। ১০ জানুয়ারির মধ্যে আমদানি করা চাল আসার কথা শুনলেও এখনো কোনো খবর নেই। বেশি দাম পাওয়ার আশায় ভারতীয় চালের বস্তা বদলে দেশি চাল হিসেবে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে কিনা প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এমন শঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে সে ধরনের কোনো কিছু এখনো হয়েছে বলে মনে হয় না। যেহেতু চাল আসতে দেরি হচ্ছে তাই প্রশাসনকে এখনই এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’

দেশে চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি শুল্ক ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করে বেশ কিছু শর্তসাপেক্ষে আমদানির সুযোগ করে দিয়েছে সরকার। বেসরকারি পর্যায়ে গত ৬ জানুয়ারি থেকে তিন ধাপে ১৮৫টি প্রতিষ্ঠানকে চার লাখ ৮৭ হাজার টন চাল আমদানির অনুমতি দেয়া হয়। সরকারিভাবেও ৩৪ টাকা কেজি দরে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টন চাল আমদানির প্রক্রিয়া চলছে। চাল আমদানি ও বিপণন পর্যবেক্ষণ করতে একটি মনিটরিং সেলও গঠন করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। আমদানির খবরে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে এক-দুই টাকা করে কমতে শুরু করেছিল। কিন্তু আমদানি ও সরবরাহের ধীরগতিতে চলতি সপ্তাহে থেমে গেছে সেই ধারা। খাদ্য মন্ত্রণালয় বলছে, সরকারি পর্যায়ে বা জিটুজি ভিত্তিতে ভারত থেকে স্বর্ণা, গুটিসহ কয়েক জাতের মোটা চাল আমদানিতে প্রতি মেট্রিক টনের দাম পড়ছে ৪০৭ ডলার অর্থাৎ ৩৪.৫১ টাকা কেজি। আতপ প্রতি টনের খরচ পড়েছে ৪১৭ ডলার, কেজিতে ৩৫.১৬ টাকা। সে হিসাবে খুচরা বাজারে আসতে আসতে দাম বেড়ে যাচ্ছে কেজিতে ১০ টাকার বেশি।

অবশ্য খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, আমদানি করা এসব চাল পাইকারি দরে কেনাতেই কেজিতে ৪৩ থেকে ৪৫ টাকা পড়ছে তাদের। খুচরা বাজারে এসব চাল বিক্রি হচ্ছে কেজি ৪৭ থেকে ৪৯ টাকা। বাজার ঘুরে দেখা যায়, দেশীয় স্বর্ণা ও গুটিজাতীয় মোটা চাল পাওয়া যাচ্ছে ৪৩ থেকে ৪৬ টাকা কেজি। এই দামও গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে দুই-চার টাকা বেশি। দেশে চাল আমদানি শুরু হলে গত সপ্তাহে এসব চালের দাম কমে ৪১ থেকে ৪২ টাকায় নেমেছিল। গত সপ্তাহে মাঝারি ও সরু চালের দামও কেজিতে দুই-তিন টাকা পর্যন্ত কমে আসে। চলতি সপ্তাহে আর নতুন করে কমেনি এসব চালের দাম। গত সপ্তাহের দামেই বিক্রি হচ্ছে। বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৫৭ থেকে ৬৪ টাকা। এসব চাল ৬০ থেকে ৬৬ টাকায় বিক্রি হয়েছে সপ্তাহ তিনেক আগেও। আমদানি ও সরবরাহের ধীরগতির কারণে দেশীয় চালের বাজারে যে প্রভাব পড়ার কথা, সেটা না পড়ে বরং উল্টোটা ঘটছে।

বিক্রেতারা বলছেন, আমদানির চাল দ্রুত ও পর্যাপ্ত পরিমাণ বাজারে এলে এবং দাম কম হলে চালের বাজার নিম্নমুখী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তা না হলে দেশীয় চালের দামও আবার বেড়ে যাবে।

রাজধানীর উত্তর বাড্ডা, মুগদা, মানিকনগর, সেগুনবাগিচা, মালিবাগসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, ভারত থেকে আনা স্বর্ণা, গুটি, আটাশসহ কয়েক ধরনের মোটা চাল দু-একটি দোকানে বিক্রি হচ্ছে। এসব চালের দাম বেশি হওয়ায় এবং সরবরাহকারীরা অগ্রিম টাকা চাওয়ায় বাকিরা রাখেননি।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, ‘ব্যবসায়ীরা আমদানির তথ্য জানান না। ব্যবসায়ীরা চাল এনে বিক্রি শেষ হয়ে যাওয়ার পর আবার অনুমতির জন্য আসেন। নিয়ম অনুযায়ী তারা আমদানির তথ্য জানান না। এর কারণ জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, আমদানি শুল্কজনিত একটি জটিলতার কারণে বেসরকারি আমদানিকারকদের চাল আমদানিতে সমস্যা হচ্ছিল, এটা সমাধান হয়ে গেছে। এ কারণে সময় একটু বেশি লাগছে। তবে কৌশলগত কারণেও আমদানিকারকরা তথ্য জানান না বলে কর্মকর্তারা জানান। তারা বলেন, দেশে চালের দাম এখন বাড়তি থাকায় কম দামে আমদানি করে বেশি দামে বিক্রি করতে পারার সুযোগ নিতে পারেন ব্যবসায়ীরা। আমদানির তথ্য যদি ফলাও করে প্রচার হয় তাহলে দেশীয় মজুদকারীরাও বাজারে চাল ছেড়ে দিলে দাম অনেক কমে যাবে। এসব কৌশলের ক্ষেত্রেও এক ব্যবসায়ী থেকে অন্য ব্যবসায়ী এগিয়ে থাকতে চান।

গত ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত মন্ত্রণালয় থেকে দুই লাখ ৬০ হাজার টন চাল কেনার দরপত্র দেয়া হয়েছে। আর সরকারি পর্যায়ে ভারত থেকে আসবে দেড় লাখ টন চাল। অর্থাৎ সরকারিভাবে মোট চার লাখ ১০ হাজার টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। জিটুজি পদ্ধতিতে ভারত থেকে চাল চলতি মাসের শেষে আসা শুরু করবে বলে আশা করছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। তবে ঠিক কবে আসতে পারে নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারেননি। বেসরকারিভাবে গত সোমবার পর্যন্ত ১০ লাখ ১৪ হাজার ৫০০ টন চাল আমদানির অনুমতি দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে কী পরিমাণ চাল দেশে এসে পৌঁছেছে তার হিসাব খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে নেই। চাল আমদানিকারকদের গড়িমসি এবং সরকারের কিছু নিয়মের জটিলতায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চাল আমদানির টার্গেট পূরণ করা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বেসরকারি চাল আমদানিকারকরা হাজার হাজার টন চাল আমদানির অনুমতি নেয়ার পরও প্রক্রিয়া শুরু করতে বিলম্ব করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারি কর্মকর্তারা বলেছেন, বোরো ধান না আসা পর্যন্ত অর্থাৎ আগামী এপ্রিল মাস পর্যন্ত প্রায় ১৫ লাখ টন চাল আমদানি করা গেলে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।

বাজারে চালের দাম কমছে জানিয়ে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘কিছু জটিলতা ছিল এবং সেগুলোর নিরসন করা হয়েছে। এখন হিলি স্থলবন্দরসহ বিভিন্ন বন্দর দিয়ে অপেক্ষায় থাকা চাল দেশে প্রবেশ করবে।’ তিনি দাবি করে বলেন, ‘সামনের দিনগুলোতে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। সরকার-বেসরকারি আমদানিকারকদের মাধ্যমে পাঁচ লাখ টন চাল আমদানির টার্গেট নিয়েছে। আমদানিকারকরাও হাজার হাজার টন চাল আমদানির সরকারি অনুমতি নিয়েছেন। কিন্তু অনুমতি নিলেও বেশিরভাগ আমদানিকারকই ঋণপত্র বা এলসি খোলাসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াগুলো এখনো শুরু করেননি।

 






ads
ads