ডোজপ্রতি বেক্সিমকো নিচ্ছে এক ডলার


poisha bazar

  • সেলিম আহমেদ
  • ১৭ জানুয়ারি ২০২১, ১১:০৮,  আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০৩

করোনার টিকা ‘কোভিশিল্ড’-এর প্রথম চালান বাংলাদেশে আসছে ২৫ জানুয়ারি। পর্যায়ক্রমে আসবে অর্ডার দেয়া বাকি আড়াই কোটি ডোজ টিকা। সবকিছু ঠিকটাক থাকলে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকেই শুরু হবে টিকা প্রয়োগ। সেরামকে প্রতিডোজ টিকার জন্য ৪ ডলার ছাড়াও এই তিন কোটি ডোজ টিকার ব্যবস্থপনার জন্য বেক্সিমকোকে ডোজপ্রতি এক ডলার করে দিচ্ছে সরকার।

এতে ব্যাপক পরিমাণ সরকারি অর্থ অপচয় হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এদিকে ক্রয়নীতিকে পাশ কাটিয়ে বেক্সিমকোকে পুরো দায়িত্ব দেয়া সরকারের দুর্নীতির অংশ বলে মনে করছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত করোনার টিকা ‘কোভিশিল্ড’ তিন কোটি ডোজ টিকার জন্য গত বছরের ৫ নভেম্বর ভারতের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সেরাম ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশের বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করেছে সরকার। চুক্তি অনুযায়ী ভারত থেকে টিকা দেশে আসার পর তা সংরক্ষণেরও দায়িত্ব দেয়া হয় বেক্সিমকোকে।

চুক্তির সময় বলা হয়, সেরাম ভারতে যে দামে টিকা বিক্রি করবে সেই দামেই বাংলাদেশের কাছে বিক্রি করা হবে। কিন্তু গত সোমবার আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সেরাম বাংলাদেশের কাছে প্রতি ডোজ টিকা বিক্রি করবে চার মার্কিন ডলারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর দাম পড়ে প্রায় ৩৪০ টাকা (১ ডলার=৮৪.৯৬ টাকা হিসেবে)। সেরামের কাছ থেকে ভারত সরকার প্রতি ডোজ টিকা কিনছে ২০০ রুপি বা ২.৭২ ডলার দরে। বাংলাদেশি মুদ্রায় তা ২৩১ টাকার মতো। এই হিসাবে বাংলাদেশকে টিকার প্রতি ডোজ কিনতে ভারতের চেয়ে প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম জানান, ‘বেক্সিমকো ডোজ প্রতি চার ডলার করে নিচ্ছে। আর টিকা আনার খরচ, শুল্ক, ভ্যাট ইত্যাদির খরচের জন্য নেবে ডোজ প্রতি এক ডলার করে। সরকার নিজস্ব অর্থে তিন কোটি ডোজ টিকা কিনে তা বিনামূল্যে দেবে।’

টিকার ব্যাবস্থপনা প্রসঙ্গে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশীদ মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার বেক্সিমকোকে একটি অনৈতিক সুবিধা দিচ্ছে। এটা নিয়ে সবাই সমালোচনা করছে। বাংলাদেশ সরকারের টিকা দানের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের সক্ষমতা রয়েছে। ইতোমধ্যে আমার দেখেছি সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) সরকারের একটি সফল কর্মসূচি। ইপিআই-এর মাধ্যমে সারা বছরই বিভিন্ন টিকাদান কর্মসূচি হয়ে থাকে। করোনার টিকাও ইপিআই স্টোর হাউজ এবং কর্মীবাহিনী দিয়ে পরিচালিত হবে। এখানে বেক্সিমকোর দায়িত্ব কিন্তু খুবই কম। তারা শুধু বিদেশ থেকে টিকাটি বাংলাদেশের শাহজালাল বিমান বন্দর পর্যন্ত আনবে শুধু। তারপর থেকে বাদবাকি কাজ সরকারি ব্যবস্থাপনায় হবে। মাঝে থেকে বেক্সিমকো বিরাট লাভ নিয়ে যাচ্ছে।’

বেসরকারিভাবে টিকা কিভাবে প্রয়োগ করা হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আবদুল মান্নান বলেন, ‘বেসরকারিভাবে টিকা কীভাবে প্রয়োগ হবে, সেটাও সরকার থেকে নির্ধারণ করে দেয়া হবে। তবে অবশ্যই সরকারি টিকা প্রদানের আগে নয় বলেও নিশ্চিত করেন তিনি। তিনি বলেন, এদিকে দেশে করোনার টিকা উৎপাদনের বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়মমতো হলে তবেই অনুমোদন দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

টিকার দামের বিষয়ে ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, যখন আমাদের সঙ্গে কথা হয়েছে তখন বলা হয়েছিল ভারতকে সেরাম যে দামে বিক্রি করবে আমরাও সেই দামেই পাবো। যে সময়ে আমরা কথা বলেছি সেটা পাঁচ-ছয় মাস আগের কথা। এখন অনেক টিকা বাজারে আসছে। কিন্তু সেই সময় আমাদের কাছে এছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না।

টিকা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বেক্সিমকোকে দেয়া প্রসঙ্গে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার সেরামের কাছ থেকে টিকা কিনবে। সেখানে এজেন্ট হিসেবে বেক্সিমকোকে নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। এতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু আমরা দেখলাম টিকা ক্রয়ের ক্ষেত্রে চুক্তিটা হয়েছে ত্রি-পক্ষীয়। সেখানে দেখলাম ক্রয়ের ক্ষেত্রে আমরা ভারতের থেকে ৪৭ শতাংশ দাম বেশি দিচ্ছি। আবার প্রতি ডোজ টিকার জন্য বেক্সিমকোকে ১ ডলার করে দিচ্ছি। সেটা আসলে অযৌক্তিকভাবে বেশি। এই কাজটি সরকারের তত্ত্বাবধানে করা উচিত ছিল। এটি বেক্সিমকোর হাতে দেয়াতে জনগণের ব্যাপক অর্থের অপচয় ঘটেছে।’

সরকারের সক্ষমতা থাকার পরো বেক্সিমকোকে কেন সব দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে দেশের প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘টিকার জন্য সবাই তাড়াহুড়ো করছে। সরকারিভাবে এটা করলে সময় লেগে যেত। যেমন, সেরাম একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান। সেখানে বাংলাদেশ-ভারত সরকারের সঙ্গে চুক্তি করত, ভারত সরকার আবার সেরামের সঙ্গে চুক্তি করত এতে অনেক সময় লেগে যেত। প্রাইভেটকে দেয়ার উদ্দেশ্য হলো দ্রুত যাতে টিকা পাওয়া যায়।’

অন্যদিকে টিকা নিয়ে বাণিজ্য বন্ধ করে দেশের সব মানুষকে বিনামূল্যে টিকা দেয়ার দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। ইতোমধ্যে জাতীয় প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন স্থানে এ দাবিতে মানববন্ধনসহ গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছেন তারা।

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেন, কারোনাকালে সরকারের ব্যর্থতা ও মাস্ক, পিপিই নিয়ে দুর্নীতির চিত্র মানুষ দেখেছে। এখনো অক্সফোর্ডের টিকা ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে ৩ ডলারে কিনে দেশে ৫ ডলারে বিক্রির কথা বলা হচ্ছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সরাসরি সেরামের কাছ থেকে টিকা না কিনে বেক্সিমকো নামক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কেনার চুক্তি করেছে। যখন এ ধরনের চুক্তি করা হয় তখনই দেশবাসী আশঙ্কা করেছিল টিকা নিয়েও বাণিজ্য ও দুর্নীতির দ্বার খুলে দেয়া হলো।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এক সংবাদ সম্মেলনে দেশে করোনা টিকা নিয়ে মুনাফাকেন্দ্রিক যে কোনো প্রকার ব্যবসা ও মধ্যস্বত্বভোগী রাখার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করার দাবি করেন। তিনি বলেন, করোনার টিকা নিয়ে দেশের মানুষ কোনো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি হতে পারে না। সরকারও কোনো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের ব্ল্যাকমেইলের শিকার হতে পারে না।

তিনি বলেন, বেক্সিমকো সরকারকে জিম্মি করে সরকারের কাছেও টিকা বিক্রি করবে, আবার আরো উচ্চমূল্যে খোলা বাজারেও টিকা বিক্রি করে ব্যাপক মুনাফা হাতিয়ে নেবার পায়তারা করছে।

শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ সমাবেশে যুব ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হাফিজ আদনান রিয়াদসহ বক্তারা বলেন, স্বাস্থ্য খাতে অব্যবস্থাপনা-দুর্নীতির যে বিষবৃক্ষ শেকড় গেড়েছে, তারই ধারাবাহিকতায় আজকে টিকা নিয়ে বাণিজ্যের পাঁয়তারা চলছে। সরকারি ক্রয়নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গলি দেখিয়ে, কোনো মানদণ্ডে বেক্সিমকোকে চুক্তিবদ্ধ করা হলো জনগণ তা জানতে চায়? যে কোনো যুক্তিতেই করা হোক না কেন, এটি সুস্পষ্ট দুর্নীতি যিনি বা যারাই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারাও এ দুর্নীতিতে অংশ।

মহড়া ও অ্যান্টিবডি পরীক্ষা ছাড়াই টিকা দেয়ার পরিকল্পনা: অ্যান্টিবডি পরীক্ষা কিংবা কোনো ধরনের মহড়া ছাড়াই আগামী মাস থেকে টিকা দেয়া শুরু করার পরিকল্পনা করেছে সরকার। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই টিকার জন্য অ্যান্টিবডি পরীক্ষা এবং মহড়া দুটোই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, মহড়ায় সব ধরনের সম্ভাব্য সমস্যা প্রকাশ পায় এবং সমাধানের সুযোগ পাওয়া যায়। এই প্রক্রিয়া টিকা ডোজের সম্ভাব্য অপচয় কমাতে সহায়তা করে। তারা আরো জানান, ভ্যাকসিনের কোনো বিরূপ প্রভাব আছে কি না, তা জানার জন্য হলেও এই মহড়া দরকার।

অ্যান্টিবডি পরীক্ষার মাধ্যমে কারো শরীরে কোভিড-১৯’র অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না, তা জানা সম্ভব। এতে করে ভ্যাকসিনের প্রাথমিক ডোজগুলো আগে কাদের মাঝে বিতরণ করতে হবে, তা নির্ধারণ করা সহজ হবে।

করোনার টিকা ম্যানেজমেন্ট টাস্কফোর্সের সদস্য সচিব ডা. শামসুল হক বলেন, ‘আমরা যদি মহড়া দিতে পারতাম তাহলে ভালো হতো। তবে আমরা পাইলটিং করব। সাধারণ মানুষকে দেয়ার আগে নার্স ও স্বেচ্ছাসেবীদের টিকা দেয়া হবে। এতে করে আমরা কিছুটা হলেও বুঝতে পারব যে, কী ধরনের সমস্যা হতে পারে।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়-বিএসএমএমইউর ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান বলেন, ‘মহড়া খুব জরুরি ছিল। এই মহড়ার মাধ্যমে সমস্যা চিহ্নিত করা যায় এবং সমাধান পাওয়া যায়।’

তিনি আরো বলেন, ‘সরকারকে উপজেলা, জেলা ও শহর পর্যায়ের অন্তত ২০০ কেন্দ্রে মহড়া চালাতে হবে। তা না হলে টিকা কার্যক্রম চালানোর সময় বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে পতে পারে।’ স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘আমরা অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করব না। এটি করা থাকলে আরো ভালো হতো। তবে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটি বাধ্যতামূলক করেনি।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করা সম্ভব হলে অনেক মানুষকে দুই ডোজের বদলে এক ডোজ টিকা দিলেই হয়ে যেত।’

 






ads
ads