• বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২১
  • ই-পেপার

ইসি সচিবালয় ও কমিশনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ

ইসি সচিবালয় ও কমিশনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ
- সংগৃহীত

poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১২ জানুয়ারি ২০২১, ২৩:৫০

জাহাঙ্গীর কিরণ

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না নিয়ে নতুন পদ সৃষ্টির মাধ্যমে সরকারের ৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয় ও কমিশন পরিচালনাকারীগণ। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি), নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন কমিশন সচিবসহ সাংবিধানিক এই সংস্থাটির অনেকেই ‘বিশেষ বক্তা’, ‘প্রশিক্ষণ উপদেষ্টা’সহ বিভিন্ন পদের বিপরীতে তারা এ সরকারি ভাতা নিয়েছেন।

বাংলাদেশের কম্পট্রোলার এন্ড অডিটর জেনারেলের কার্যালয় (সিএজি) একাদশ জাতীয় নির্বাচন এবং উপজেলা পরিষদ নির্বাচন উপলক্ষে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের নামে নির্বাচন কমিশনের এই আর্থিক অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ নিরীক্ষা সংস্থাটি ইসিকে অনিয়মের বিষয়টি জানিয়ে প্রশিক্ষণের নামে নেয়া এই অর্থ ফেরত দিতে বলেছে।

এদিকে সিএজির এই অডিট আপত্তির বিষয়ে প্রবল আপত্তি জানিয়েছে সাংবিধানিক সংস্থা নির্বাচন কমিশন। কোনো অনিয়ম হয়নি দাবি করে নির্বাচন আয়োজনকারী এই সংস্থাটি বলছে, সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে নিজেদের নামে বরাদ্দকৃত অর্থ খরচ করতে নির্বাচন কমিশনের কারো অনুমোদন নেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। সিএজির আপত্তির ব্যাপারে জবাব তৈরি করা হচ্ছে জানিয়ে রাষ্ট্রীয় নিরীক্ষা সংস্থাটিকে এই সপ্তাহেই সবকিছু অবহিত করা হবে বলেও জানায় ইসি।

২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় নির্বাচন এবং ২০১৯ সালের মার্চ ও জুনে উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে কর্মকর্তাদের জন্য এই প্রশিক্ষণের আয়োজন করে নির্বাচন কমিশনের ইলেক্টোরাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (ইটিআই)। প্রধান নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিবসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা ‘বিশেষ বক্তা’ হিসেবে প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেন। নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশন সচিব ‘প্রশিক্ষণ উপদেষ্টা’ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এবং সচিব ও ইটিআই মহাপরিচালক উপস্থিত ছিলেন ‘প্রশিক্ষণ পরিচালক’ হিসেবে।

এই প্রশিক্ষণ কর্মশালাগুলোতে খরচ করা ৭ কোটি টাকারও বেশি অর্থের ব্যাপারে এই আপত্তি তোলে সিএজি অফিস। এর মধ্যে দেশব্যাপী নির্বাচনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে ‘বিশেষ বক্তা’ ও ‘প্রশিক্ষণ উপদেষ্টা’র মতো ‘অননুমোদিত’ পদে যারা ছিলেন তাদের দেড় কোটি টাকা ভাতা দেয়ার বিষয়ে আপত্তি উত্থাপন করা হয়েছে অডিটে। একই কারণে রাজধানীর ইটিআই প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে ব্যয় করা ৪৭ লাখ ৪৪ হাজার টাকা নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে।

একই ব্যক্তি, একই তারিখে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে একাধিক সম্মানী গ্রহণ করেছেন বলেও অডিট আপত্তিতে জানানো হয়েছে। সিএজির অভিযোগ, প্রশিক্ষণ পরিচালকরা সারা দেশে প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার সময় তাদের জন্য নির্ধারিত হারের থেকে অধিক হারে ভাতা নিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের নথি অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে ‘বিশেষ বক্তা’, ‘প্রশিক্ষণ উপদেষ্টা’ এবং অন্যদের উপস্থিতির কোনো প্রমাণ না দেখিয়েই প্রশিক্ষণ ভাতা সংগ্রহ করা হয়েছে। ‘প্রশিক্ষণ পরিচালক’রা ইটিআই প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য তাদের জন্য বরাদ্দকৃত ভাতার চেয়ে বেশি সংগ্রহ করেছেন।

তৎকালীন নির্বাচন কমিশন সচিব, অতিরিক্ত সচিব এবং ইটিআই মহাপরিচালকের ভাতা আদায়ের বিষয়েও আপত্তি তোলে সিএজি। সিএজির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইটিআই প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত প্রশিক্ষণে অননুমোদিত ‘প্রশিক্ষণ উপদেষ্টাকে প্রশিক্ষণ ভাতা প্রদান করায় সরকারের ১৯ লাখ ৭৬ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে। এছাড়াও অননুমোদিত বিশেষ বক্তাদের ভাতা প্রদান করায় সরকারকে ১২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে। প্রশিক্ষণ পরিচালকরাও তাদের জন্য বরাদ্দকৃত ভাতার চেয়ে ১৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকা বেশি আদায় করেছেন।

অডিট আপত্তি উত্থাপনের কোনো সুযোগ নেই: অবশ্য ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের অডিট আপত্তি উত্থাপনের কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচন কমিশন যেহেতু কোনো মন্ত্রণালয় বা সরকারি বিভাগের আওতাধীন নয়, তাই কোনো বিশেষ বক্তা বা প্রশিক্ষণ উপদেষ্টাকে সম্মানী প্রদানের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর এ বিষয়ে বলেন, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন-২০০৯ অনুসারে কমিশন নিজেই বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করার জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত। বিশেষ বক্তা, প্রশিক্ষণ উপদেষ্টা এবং প্রশিক্ষণ পরিচালকের মতো পদগুলোর অনুমোদন দিয়েছিল কমিশন। এতে অনিয়ম কিছু হয়নি।

তিনি বলেন, সিএজি আমাদের কাছে এর জবাব চেয়েছে কিংবা অর্থ ফেরত দিতে বলেছে। আমরা জবাব প্রস্তুত করছি। ইতোমধ্যে আমরা থানা, জেলা পর্যায়ে নির্বাচন কমিশন অফিস এবং ইটিআই-এ চিঠি দিয়ে তাদের জবাব চেয়েছি। তাদের মধ্যে কয়েকজন ইতোমধ্যে জবাব দিয়েছে এবং কমিশন তাদের অনুমোদন দিয়েছে। আমরা এ সপ্তাহে এই জবাব সিএজির কাছে পাঠাব।

এদিকে ইটিআই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিএজি গত বছরের মার্চ মাসে অডিট আপত্তি তুলেছিল। যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করে ইটিআই কর্মকর্তারা এর জবাব দিয়েছিলেন। তবে সিএজি কর্মকর্তারা তাদের জবাব মেনে নেননি। তারপর, আপত্তি নিষ্পত্তির জন্য সিএজি এবং ইটিআই কর্মকর্তারা একটি বৈঠক করেন, যা ‘এক্সিট মিটিং’ নামে পরিচিত। সিএজি কর্মকর্তারা এক্সিট মিটিংয়েও ইটিআইয়ের জবাব গ্রহণ করেনি এবং ইটিআই কর্মকর্তাদের অর্থ ফেরত দিতে বলেন। বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশন, সিএজি এবং ইটিআই কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি ত্রিপাক্ষিক বৈঠক হবে। সমস্যা সমাধানে ত্রিপাক্ষিক বৈঠকটি ব্যর্থ হলে বিষয়টি সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হবে বলে জানান ইটিআই কর্মকর্তারা।

‘আর্থিক অসদাচরণ ও অনিয়ম’ অভিযোগটি অসত্য: ইটিআইয়ের মহাপরিচালক নুরুজ্জামান তালুকদার সিএজি অডিটের আপত্তি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নুরুল হুদা এই অডিট আপত্তির প্রেক্ষিতে বলেন, বিশেষ বক্তা হিসেবে বক্তৃতা দেয়ার নামে দুই কোটি টাকার মতো ‘আর্থিক অসদাচরণ ও অনিয়ম’ মর্মে অভিযোগটি অসত্য। যা ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি বলেন, বিশেষ বক্তাদের জন্য একাদশ জাতীয় নির্বাচনে বরাদ্দ ছিল এক কোটি চার লাখ টাকা এবং পঞ্চম উপজেলা নির্বাচনে বরাদ্দ ছিল ৪৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এ সকল ব্যয় অডিটযোগ্য। অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি না হলে ব্যয়কৃত অর্থ কোষাগারে ফেরত যাবে। সেক্ষেত্রে আর্থিক অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই।






ads