• বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২১
  • ই-পেপার

শিক্ষার ক্ষতি পোষানোই চ্যালেঞ্জ


poisha bazar

  • সেলিম আহমেদ
  • ১১ জানুয়ারি ২০২১, ১১:০৪

করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় নতুন বছর এলেও কাটছে না শিক্ষাঙ্গনের স্থবিরতা। নতুন বছরে বই বিতরণের পর রাজধানীসহ সারাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইনে ক্লাস নেয়ার নোটিশ ইতোমধ্যেই দেয়া হয়েছে। তবে ক্লাসে উপস্থিত হয়ে অংশ নেয়ায় শিক্ষা কার্যক্রমের প্রতি শিক্ষার্থীদের যে মনোসংযোগ থাকে, অনলাইন ক্লাসের সময় তা থাকে না।

এ কারণে শিক্ষাবিদরা বলেন, এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘জ্ঞান ঘাটতির’ সৃষ্টি হয়। এটা যেকোনো শিক্ষার্থীর জন্যই বিপদজনক। এ থেকে রক্ষা পেতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করার কোনো বিকল্প নেই। তবে করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে-এমন আশঙ্কায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতেও পারছে না সরকার।

এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, করোনার কারণে শিক্ষায় যে ক্ষতি হয়েছে তা কীভাবে পোষানো যায়। এজন্য শিক্ষার গতি ফিরিয়ে আনতে নতুন বছরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা যায় কিনা-এমন সম্ভাবনাসহ একগুচ্ছ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলে জানা গেছে।

এদিকে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপ বলছে, করোনাকাল শেষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললেও সব শিক্ষার্থী ক্লাসে ফিরবে না। ঝরে পড়তে পারে অন্তত ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী। এতে শুধু প্রাথমিকে নয়, শিক্ষার প্রতিটি স্তরেই প্রভাব ফেলবে। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স বলছেন, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে শিক্ষার্থীদের ৮০ শতাংশ পড়ালেখা এখন কম হচ্ছে।

২০ শতাংশ শিক্ষার্থী পরিবারের আয়মূলক কাজে জড়িয়ে পড়েছে। করোনায় নিম্ন আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলছে। কারণ, বাবা-মায়েরা সন্তানদের কাজে পাঠিয়েছে সংসারের অর্থ সংস্থান করতে। প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা তথ্য বলছে, করোনা-পরবর্তী স্কুলে ফিরতে সমস্যা হবে ২৪ শতাংশ শিক্ষার্থীর, ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী স্কুলে আসতে পারবে আর ১০ শতাংশ শিক্ষার্থীর পক্ষে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ায় রয়েছে অনিশ্চয়তা।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, করোনায় শিক্ষা ক্ষেত্রে যে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে উত্তরণে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন করা যায়নি। এমনকি শিক্ষাঙ্গন খোলার বিষয়েও কোনো রোডম্যাপ চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে আলোচনা চলছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে ফেব্রুয়ারি মাসের কোনো একটা সময় পরবর্তী উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের জন্য সীমিত সংখ্যক প্রতিষ্ঠান খোলার চিন্তা আছে। যদিও এরও ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে করোনা পরিস্থিতির ওপর।

‘সবার আগে কোটি কোটি শিক্ষার্থীর জীবন রক্ষা’-এমন নীতির কথা মনে করিয়ে দিয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, শিক্ষার্থী, শিক্ষকসহ শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার চিন্তাও করা যাচ্ছে না। তাছাড়া অনলাইনে পড়ালেখা অব্যাহত থাকায় শিক্ষা থেকে শিক্ষার্থীরা একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি বলেই মনে করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এস এম হাফিজুর রহমান মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দেশে যে কারিকুলাম অনুযায়ী পড়ালেখা হয়, তা বেশিরভাই একটা ক্লাসের সঙ্গে অন্য ক্লাসের বিষয়াদির ধারাবাহিকতা থাকে- যাকে আমরা ভারটিক্যাল বা উলম্ব বিন্যাস বলে থাকি। অর্থাৎ এই ধারাবাহিকতা না থাকলে আগের কনসেপ্টের সঙ্গে পরের কনসেপ্টটা বুঝতে অসুবিধা হয়। সব বিষয়েই এই সমস্যটা হয়। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দীর্ঘ সময় প্রভাব পড়ে। এখন করোনার সময় অনলাইনে ক্লাস হলেও তা নানা কারণে পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। এ ক্ষেত্রে আমরা যতটুকু জানি এনসিটিবি বিভিন্ন রকম পরিকল্পনা দাঁড় করাচ্ছে। কিন্তু বার বার তা হোঁচট খাচ্ছে। এই গ্যাপগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে’।

তিনি বলেন, ‘করোনা পরবর্তী সময়ে এই গ্যাপগুলো পূরণ করার বড় দায়িত্ব পড়বে শিক্ষকদের উপর। তারা তখন যে কনসেপ্টটা পড়াবেন, এই রিলেটেড কনসেপ্টটা তার আগের বছর মিস হয়েছে কিনা সেটা খেয়াল রাখতে হবে। মিস হলে তা পূরণ করতে হবে। সেক্ষেত্রে এনসিটিবি ‘লোড ডিস্ট্রিবিউশনটা’ (আগের ক্লাসের পড়াশুনার ঘাটতি পূরণ) পুনর্বন্টন করে দিতে পারে। এজন্য এনসিটিবিকে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে। তাদের যথাযথভাবে গাইড করতে হবে। শিক্ষকদের সচেতনভাবে এগুতে হবে। অভিভাবকসহ সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে।

করোনায় শিক্ষার্থীরা বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে উল্লেখ করে গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মেনে স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করা যেতে পারে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ১২টি নির্দেশনা দেয়া আছে। সেগুলো সঠিকভাবে পালন করা হলো কিনা তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের আবার শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার জন্য এখন স্কুল খোলার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, বিধি-বিধান মেনে, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া উচিত। অনির্দিষ্টকালের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে শিক্ষায় বিপর্যয় নেমে আসবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর আগের ক্লাসের পড়াশোনার ঘাটতি থাকলে আগে সেই জ্ঞান বিতরণ করতে হবে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে। এরপর চলতি শিক্ষাবর্ষের পাঠদান করতে হবে। আগের বছরের পাঠের ঘাটতি রেখে যদি চলতি বছরের পাঠদান করানো হয়, তবে তারা পরীক্ষায় ফেল করবে, শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়বে।

তিনি বলেন, আগে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাতে হবে তারপর পরীক্ষায় বসাতে হবে। পাঠদান না করে শুধু পরীক্ষায় বসিয়ে লাভ নেই। সরকারকে শিক্ষা খাতে গতি আনার চ্যালেঞ্জ নিতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

করোনার বিস্তার ঠেকাতে গত বছর ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ রাখা হয়েছে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি। সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি আছে। শিক্ষায় গতি ফিরিয়ে আনতে স¤প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি আগামী ফেব্রুয়ারিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার আভাস দিয়েছিলেন।

এ ছাড়া চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা পিছিয়ে জুন মাসে এবং এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা জুলাই-আগস্ট মাসে নেয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। তবে এর আগে এসএসসি ও এইচএসসি স্তরের শিক্ষার্থীদের সিলেবাস ‘পুনর্বিন্যাস’ করে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস এবং এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত স্কুল-কলেজে নিয়ে ক্লাস করানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রী।

করোনা সংক্রমণের আগে প্রতিবছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা ১ ফেব্রুয়ারি এবং এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা ১ এপ্রিল থেকে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা বলছেন, সাড়ে ৯ মাসের বেশি সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে বইয়ের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। সংসদ টেলিভিশন ও অনলাইনের বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের পাঠদানে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করা হলেও তা তেমন একটা কাজে আসেনি বলে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

সর্বশেষ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে মূল্যায়নের চেষ্টা করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর-মাউশি। কিন্তু এতেও শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা যায়নি। একারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনায় ফিরিয়ে আনার দাবি অভিভাবকদের। কারণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি কোচিং সেন্টারগুলোও করোনার প্রকোপে বন্ধ থাকায় বৃহৎ এ শিক্ষার্থীদের বাড়িতে পড়াশোনাই ছিল বড় ভরসা। কিন্তু দীর্ঘদিন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় বাড়ির পাঠেও মন বসেনি শিক্ষার্থীদের।

 






ads