হুমকির মুখে রাষ্ট্রীয় ডাটাসেন্টার


poisha bazar

  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ০২ ডিসেম্বর ২০২০, ০৯:৪৪

নির্বাচন কমিশনের ডাটাসেন্টার (ডিসি) এবং ডিজাস্টার রিকভারি সিস্টেমের (ডিআরএস) সার্ভার, হার্ডওয়্যার, কম্পিউটার ও ইকুইপমেন্ট সামগ্রীর কার্যক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। ২০১১ সাল হতে ব্যবহার করা এসব পুরনো যন্ত্রপাতি দেশের নাগরিকদের তথ্য সুরক্ষা দিতে অনেকটাই হুমকির মুখে পড়েছে।

যে কারণে এসব ইকুইপমেন্ট প্রতিস্থাপন, আপগ্রেডেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ সম্পন্ন না হলে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ডাটাসেন্টার হুমকির সম্মুখীন হতে পারে বলে মনে করছে ইসি। এতে ব্যাহত হতে পারে পরিচিতি সেবাও। তবে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার কথা রয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় নির্বাচন কমিশনের সেবা বৃদ্ধিতে অন্যান্য পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন ইসি সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সার্ভারের সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ নতুন ইকুইপমেন্ট সংগ্রহের লক্ষ্যে এরইমধ্যে মেগা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ইসি। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সভায় নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের ‘আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং একসেস টু সার্ভিসেস (আইডিইএ) (২য় পর্যায়)’ প্রকল্পে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুমোদন দিয়েছেন। যার খরচ ধরা হয়েছে এক হাজার ৮০৫ কোটি ৯ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

ইসির এনআইডি উইং সূত্রে জানা গেছে, ডাটাসেন্টার এবং ডিজাস্টার রিকভারি সিস্টেমের সার্ভার, হার্ডওয়্যার, কম্পিউটার সামগ্রী, ইকুইপমেন্ট ইত্যাদি যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিসহ নতুন ইকুইপমেন্ট সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। একইসঙ্গে এই প্রকল্পের আওতায় রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে সকল পরিষেবা যথাযথভাবে নিশ্চিত করার মাধ্যমে শান্তি-শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত এবং নিবন্ধনযোগ্য সকল নাগরিকের ১০ আঙ্গুলের ছাপ ও আইরিশ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, বায়োমেট্রিক ম্যাচিং সম্পন্ন করার মাধ্যমে দ্বৈততা পরিহারকরণ, খসড়া ও চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রস্তুতকরণ, নতুন ভোটার নিবন্ধন, স্থানান্তর, কর্তন, তথ্যের ভুল সংশোধন সংক্রান্ত কার্যক্রম বাস্তবায়ন এবং অধিকতর দক্ষতা ও স্বচ্ছতার সাথে নাগরিক সেবা প্রদান, ভোটার তালিকা প্রস্তুতকরণ এবং অনূর্ধ্ব ১৮ নাগরিকদের নিবন্ধনের জন্য গাইডলাইন প্রস্তুতকরণ ও কর্মপ্রক্রিয়া সুনির্দিষ্টকরণ, নিবন্ধন, সংশোধন, স্থানান্তরজনিত দলিলাদির হার্ড ও স্ক্যান কপি সংরক্ষণের জন্য ডাটা ওয়্যারহাউস প্রস্তুত, আইডি কার্ডে ১০ ডিজিট বিশিষ্ট ইউনিক পরিচিতি নম্বর প্রদান করাসহ ইউনিক আইডি নম্বর বিভিন্ন সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে সংযুক্ত করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

এদিকে জন্মনিবন্ধন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে একটি শিশুর জন্মের পরপরই তাকে এই ১০ ডিজিটের ইউনিক আইডি নম্বর প্রদান করার পরিকল্পনা রয়েছে ইসির। ফলে আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে শুধুমাত্র পরিচিতিই নয় বরং ব্যক্তির সামগ্রিক অধিকার রক্ষা ও আমৃত্যু সামাজিক সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করবে এটি। এছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকগদের দ্রুততম সময়ে নিবন্ধন, পরিচয়পত্র প্রদান এবং ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি, প্রকল্পের আওতায় ৯ কোটি নাগরিকের তথ্য ধারণ এবং ৪টি প্রতিষ্ঠানকে পরিচিতি যাচাই সেবা প্রদানে সক্ষমতা সম্পন্ন ডাটাসেন্টার প্রস্তুত, নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্মার্ট কার্ড উৎপাদন ও বিতরণের লক্ষ্যে দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা সৃষ্টি, নিজস্ব দক্ষ জনবল সৃষ্টি, আমদানির পরিবর্তে রফতানির সুযোগ সৃষ্টি এবং সরকারি অর্থের অপচয় রোধ করা হবে।

এনআইডি উইংয়ের তথ্যমতে, এরইমধ্যে দেশব্যাপী নির্বাচন কমিশনের মাঠ পর্যায়ের কার্যালয়সমূহে (৫১৯টি উপজেলা/থানা, ৬৪টি জেলা ও ১০টি আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়) যথাযথভাবে ভিপিএন কানেক্টিভিটি প্রদান করা হয়েছে এবং দেশব্যাপী পরিচিতি সেবা বিকেন্দ্রীকরণসহ অনলাইন এনআইডি সেবা চালু করা হয়েছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, ত্রাণ সহায়তাসহ ৫টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগী চিহ্নিতকরণে পরিচিতি যাচাই সেবার প্রচলন করা হয়েছে।

জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ, মাঠ পর্যায়ের নির্বাচন কর্মকর্তা/কর্মচারী ও প্রকল্পের প্রায় ২ হাজার ২৪০ জন কর্মকর্তা/কর্মচারীকে প্রশিক্ষণ প্রদানের লক্ষমাত্রা নির্ধারিত থাকলেও ৪ হাজার ২৬০ জনকে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে দক্ষতার উন্নয়ন করা হয়েছে। বেতন নির্ধারণ, পেনশন প্রাপ্তি, টিআইএন নিবন্ধন, মোবাইল সিম নিবন্ধন/পুনঃনিবন্ধন, বেওয়ারিশ লাশের পরিচিতি নির্ণয়, অপরাধী শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে জাতীয় তথ্যভাণ্ডার ব্যবহারের ফলে দ্বৈততা পরিহার ও ভুয়া সুবিধাভোগী চিহ্নিতকরণ সম্ভব হয়েছে।

এতে করে সামাজিক সমতা, সঠিক সুবিধাভোগী নির্ধারণ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অধিকতর উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। দেশব্যাপী এনআইডি সেবা বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগে অনুমোদিত ৭১ জন জনবল অত্যন্ত অপ্রতুল বিধায় প্রকল্পের এক হাজার ৪৬৩ জন জনবলের সহায়তায় এ সেবা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হচ্ছে। এনআইডি উইংয়ের চলমান কার্যক্রম সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে স্বচ্ছতার সাথে সেবা প্রদান নিশ্চিতকরণ, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুর্নীতি হ্রাস, সুশাসন আনয়নসহ সময়, শ্রম ও অর্থের অপচয় রোধ করছে। এছাড়াও, অনলাইন এনআইডি সেবা প্রচলনের মাধ্যমে নাগরিকের হাতের মুঠোয় সেবা পৌঁছে দেয়া সম্ভব হয়েছে।

এনআইডির আইডিইএ প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দুর্নীতি হ্রাস পাবে, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে সকল পরিষেবা যথাযথভাবে নিশ্চিত হবে এবং সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে যা সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভ‚মিকা রাখার পাশাপাশি ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে মূল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

উল্লেখ্য, দেশের সকল নাগরিকের জন্য নিরাপদ, সঠিক ও নির্ভরযোগ্য জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবস্থা চালুকরণ, অধিকতর নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য সংবলিত জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান, ২টি সরকারি এবং ২টি বেসরকারি সংস্থাকে নতুন জাতীয় পরিচয় শনাক্তকারী ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে জুলাই ২০১১ হতে জুন ২০১৬ মেয়াদে নির্বাচন কমিশনের অধীনে আইডিইএ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের জনবলের সহায়তায় দেশব্যাপী নির্বাচন কার্যালয়গুলোতে নাগরিকদের পরিচিতি সেবা প্রদান, স্মার্ট কার্ড বিতরণ, নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার ইত্যাদি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

এছাড়াও প্রকল্পের জনবলের মাধ্যমেই ডাটাসেন্টার পরিচালনাসহ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিচিতি যাচাই সেবা প্রদান নিশ্চিত করা হচ্ছে। দেশব্যাপী পরিচিতি সেবা, স্মার্ট কার্ড বিতরণ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেয়া এনআইডি যাচাই সেবার গুরুত্ব বিবেচনা করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে বিভিন্ন পর্যায়ে আইডিইএ প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। চলমান প্রকল্পটি চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে।

 






ads