অসময়ে হানা দিচ্ছে ডেঙ্গু

- ফাইল ছবি

poisha bazar

  • সেলিম আহমেদ
  • ৩০ নভেম্বর ২০২০, ০৯:৩৬

করোনা মহামারীর মধ্যে হঠাৎ করেই দেখা দিয়েছে ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ। সেই সঙ্গে রাজধানীজুড়ে বেড়েছে মশার উপদ্রব। সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর মূল মৌসুম শেষ হলেও এখনো প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। অসময়ে ডেঙ্গুর এই প্রকোপ দেখা দেয়ায় নগরবাসীর মধ্যে রয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। তবে গত বছরের তুলনায় এবারের ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুহারের সংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, সতর্ক থাকলে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় শুধু চলতি মাসের ২৯ দিনেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫২৩ জন রোগী-যা চলতি বছরের আক্রান্ত মোট রোগীর ৪৫ শতাংশ।

বর্ষা মৌসুমের শেষে কয়েকদিন থেমে থেমে বৃষ্টি এবং অক্টোবরে ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে এডিস মশার লার্ভা বিস্তারের সুযোগ পেয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বিশিষ্ট ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, বর্ষা মৌসুমের শেষে কয়েকদিন থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়াতেই এডিস মশার লার্ভা বিস্তারে সুযোগ পেয়েছে। তবে গত বছরের তুলনায় এবারের ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুহারের সংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৬ ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীসহ চলতি মাসের ২৯ দিনেই সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হযে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫২৩ জন রোগী। যা এ বছর এক মাসে সর্বোচ্চ।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত এক হাজার ১৫৫ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। তাদের মধ্যে এক হাজার ৬২ জন ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ৮৬ ডেঙ্গু রোগী। তাদের মধ্যে ৬৮ রোগী ঢাকায় এবং বাকিরা রাজধানীর বাইরে ভর্তি আছেন। এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত মাসওয়ারি পরিসংখ্যান অনুসারে- জানুয়ারিতে ১৯৯ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪৫, মার্চে ২৭, এপ্রিলে ২৫, মে মাসে ১০, জুনে ২০, জুলাইয়ে ২৩, আগস্টে ৬৮, সেপ্টেম্বরে ৪৭, অক্টোবরে ১৬৩ এবং নভেম্বরে ৫২৩ জন আক্রান্ত হয়েছেন।

সূত্র জানায়, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) ডেঙ্গু সন্দেহে এখন পর্যন্ত ছয়টি মৃত্যুর তথ্য পাঠানো হয়েছে। আইইডিসিআর চারটি ঘটনার পর্যালোচনা সমাপ্ত করে তিনটি মৃত্যু ডেঙ্গুজনিত বলে নিশ্চিত করেছে।

একাধিক স্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাধারণত বর্ষা মৌসুমে এডিস মশাবাহিত এই রোগটির প্রকোপ দেখা দেয়। তবে এবার বর্ষায় এর প্রকোপ ছিল না বললেই চলে। অথচ নভেম্বর মাসের শুরু থেকে বাড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গুর এই সংক্রমণ।

গত কয়েক বছরের ডেঙ্গু আক্রান্তেও হিসাব বলছে, বাংলাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কখনোই অক্টোবর কিংবা নভেম্বর মাসে চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকে না। গত বছরেও সর্বোচ্চ আক্রান্ত হয়েছিল আগস্ট মাসে। এরপর সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বরে ডেঙ্গুর প্রকোপ আস্তে আস্তে কমে আসতে থাকে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, চলতি বছর অক্টোবর মাসে ভারি বৃষ্টিপাতের সঙ্গে গরমের প্রকোপ ছিল অনেক বেশি, যা ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুক‚ল পরিবেশ তৈরি করেছে। ফলে মশা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্তের সংখ্যাও বেড়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাসার বলেন, ‘২০০০ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গুর যে ধরন, তা এবারের অক্টোবর-নভেম্বর মাসের ধরনের সঙ্গে মিলছে না। সাধারণত অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমে যায়, নভেম্বরে যা আরো কমে আসে। কিন্তু এবার আমরা নভেম্বরেও প্রচুর রোগী পাচ্ছি।’

এর কারণ বিশ্লেষণ করে এই কীটতত্ত্ববিদ বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এবার অক্টোবরে যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হলো, তাতে অনেক বেশি এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরি হয়েছে। এ কারণে এডিস মশার ঘনত্ব বাড়ার পাশাপাশি রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে।’

দুই দশক আগে ২০০০ সালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। এরপর গত বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে সবচেয়ে বেশি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয় ও মারা যায়। সরকারি হিসাবেই আক্রান্তের সংখ্যা ছিল লাখের বেশি। মৃত্যু হয় ১৭৯ জনের। তবে হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের দেয়া তথ্য অনুসারে এই সংখ্যা আরো বেশি। এ কারণে এবারো ডেঙ্গু নিয়ে জনমনে আতঙ্ক ছিল। তাই স্থানীয় সরকার বিভাগের পক্ষ থেকেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বছরব্যাপী মশক নিধন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়।

মানবকণ্ঠ/এসকে






ads