গণপূর্তে জিকে শামীমের পতনের পর গোল্ডেন মনির সিন্ডিকেট


poisha bazar

  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ২২ নভেম্বর ২০২০, ০৯:২৮

আলোচিত ঠিকাদার জিকে শামীম সিন্ডিকেটের পতনের পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত অধিদফতরের কর্মকর্তারা। প্রকল্পসহ অন্যান্য কাজ বাস্তবায়নে ফিরে এসেছিল স্বাভাবিকতা। কিন্তু বছর না পেরুতেই ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ‘সিন্ডিকেট’।

তবে এবার জি কে শামীমের জায়গায় এসেছেন গোল্ডেন মনির নামের আরেক মাফিয়া। অভিযোগ রয়েছে দুর্নীতির দায়ে সাজা খেটে আসা গণপূর্ত মেট্রোপলিটন জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার বসুর সহযোগিতায় টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে একচ্ছত্র আধিপত্য চালাচ্ছে নয়া এই সিন্ডিকেটটি। ওপেন টেন্ডার হলেও বিশেষ একটি পদ্ধতির মাধ্যমে বড় বড় সব কাজ ভাগিয়ে সিন্ডিকেটের সদস্যদের মাঝে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়া হচ্ছে।

অবশ্য প্রদীপ কুমার বসুর বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে এরইমধ্যে জাতীয় সংসদের সাংবিধানিক কমিটি সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা পাঠিয়েছে। সভাপতি রুস্তম আলী ফরাজী এমপির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিটির ১২তম বৈঠকে এ নিয়ে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জাতীয় সংসদের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. মিজানুর রহমান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অনুবিভাগ-২) ও গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলীকে চিঠি পাঠিয়েছেন। কমিটির এই নির্দেশনার আলোকে গণপূর্ত অধিদফতর থেকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে দীর্ঘদিনেও কমিটির নির্দেশনা বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

এদিকে বিপুল পরিমাণ অর্থ, ৬০০ ভরি স্বর্ণ এবং একটি বিদেশি পিস্তলসহ গতকাল শনিবার টেন্ডার মাফিয়া গোল্ডেন মনিরকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। র‌্যাব জানিয়েছে, মোট এক হাজার ৫০ কোটি টাকার মতো সম্পদ আছে গোল্ডেন মনিরের। রাজধানীর বাড্ডা, গুলশান, নিকেতন, উত্তরা এলাকায় তার ৩০টির মতো ফ্ল্যাট রয়েছে।

গণপূর্ত অধিদফতর সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব বড় প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এর সিংহভাগই নিয়ে নিচ্ছে গোল্ডেন মনির সিন্ডিকেটের সদস্যরা। এক্ষেত্রে প্রকল্প কাজ একটি নির্দিষ্ট কমিশনে ভাগ-ভাটোয়ারা করে দেন প্রদীপ কুমার ও গোল্ডেন মনির। অভিযোগ রয়েছে, এই কমিশনের টাকা প্রদীপ বসু থেকে পৌঁছে যায় মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ হাত পর্যন্ত।

তথ্যমতে, রাজধানীর আগারগাওয়ে নিউরো সায়েন্স ইনস্টিটিউটের ১৫০ কোটি, র‌্যাব হেড কোয়ার্টারের ১৫০ কোটি, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল সার্ভিস কমপ্লেক্সের ৫৫ কোটি, ডেমরা পুলিশ টাওয়ারের ৯০ কোটি টাকার কাজসহ চলমান অন্যসব প্রকল্প থেকে কমিশন নিয়ে কাজ ভাগ-ভাটোয়ারা করে দেয়া হয়েছে। জানা গেছে, উত্তরার ঝমঝম টাওয়ারের একটি কক্ষে বসে লোকচক্ষুর অন্তরালে কাজ ও কমিশনের টাকার এই ভাগ-ভাটোয়ারা হয়।

গণপূর্ত ঢাকা মেট্রোজোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার বসু খুলনা জোন থেকে গত ১৫ জুলাই ঢাকায় যোগদানের পরই মাফিয়া ডন গোল্ডেন মনির তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান- যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। এরপরই তার বিষয়ে টনক নড়ে সবার। অনিয়মের মাধ্যমে শতকোটি টাকার মালিক হওয়া এই কর্মকর্তা গোপালগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগে কর্মরত থাকাকালে বঙ্গবন্ধুর স্ত্রীর নামে করা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্পের বাউন্ডারি, ওয়াল, মাটি ভরাট, ভবনের ছাদ, ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, রিজার্ভ ব্যাংকে কাজ অপূর্ণ রেখেই ঠিকাদারদের বিল প্রদান এবং প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করার অভিযোগে তাকে এক বছরের জন্য সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। তাছাড়া তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার কারণে একটি বিভাগীয় মামলাও করা হয়েছে।

এদিকে প্রদীপ কুমার বসুসহ অনিয়মে জড়িত প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক লুটপাট ও অনিয়মের প্রমাণ প্রাপ্তি সাপেক্ষে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করেছে গণপূর্ত অধিদফতর। এ ছাড়া নির্মাণকালের ২৬টি অনিয়ম তুলে ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় বরাবর সম্প্রতি চিঠি দিয়েছেন শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চক্ষু হাসপাতালের পরিচালক। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অনিয়মের সঙ্গে জড়িত প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাদের দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করে যথাযথ ক্ষতিপূরণ আদায়ের পরামর্শ দিয়েছে জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফুদ্দিন আহম্মেদের চিঠিতে হাসাপাতালের নির্মাণ কাজে বিভিন্ন অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়। সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা যায়, প্রদীপ কুমার বসুর এসব অনিয়মের বিষয়ে জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির ১২তম সভায় বিশদ আলোচনা হয়। কমিটির সভাপতি রুস্তম ফরাজীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে কমিটি সদস্যরা অংশ নেন। ওই বৈঠকে কমিটি দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত প্রদীপ বসুসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

এ বিষয়ে কমিটি সদস্য মো. শহীদুজ্জামান সরকার বলেন, গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলীকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি অভিযোগ সঠিক বলে স্বীকার করে বলেন, অনিয়ম হয়েছে, তবে কাজও সঠিকভাবে করা হয়েছে এবং কোনো তহবিল তছরূপ হয়নি।

কমিটির সভাপতি রুস্তম আলী ফরাজী বলেন, অধিকাংশ কাজই সঠিকভাবে হয়নি এবং অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। তাছাড়া দীর্ঘদিন বিলম্বিত করায় অধিদফতরের স্বেচ্ছাকৃত ভুলভ্রান্তি, দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করার মতো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।

তিনি বলেন, পিপিআর অনুযায়ী টার্নওভার নেয়া বাধ্যতামূলক এবং তা ব্যাংকের মাধ্যমে হতে হবে। কিন্তু তা করা হয়নি। প্রকল্প কাজে একজন ঠিকাদারকে মনোনয়ন দেয়ার পর ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ট্রেড লাইসেন্স, অন্যান্য কাজের স্টেটমেন্ট চাওয়ার মাধ্যমে টেন্ডার ম্যানিপুলেশন করা হয়েছে- যার অথরিটি গণপূর্ত অধিদফতরের নেই।

এদিকে গত ৪ নভেম্বর গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে বসুর অনিয়ম খতিয়ে দেখতে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পেকু সার্কেল) কাজী মো. ফিরোজ হাসানকে আহ্বায়ক এবং নির্বাহী প্রকৌশলী (পিপিসি) মোহাম্মদ মাহফুজুল আলমকে সদস্য সচিব করা হয়েছে।

কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- নির্বাহী প্রকৌশলী লিল্টু গাজী, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোর্শেদ ইকবাল ও নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তৌফিক আলম সিদ্দিকী। এ কমিটি সরেজমিন পরিদর্শন করে ইতোমধ্যে ব্যাপক অনিয়ম পেয়েছে বলে জানা গেছে।

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী মো. ফিরোজ হাসান এ বিষয়ে জানান, আমরা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। চ‚ড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে সময় লাগবে।

 






ads