স্বাস্থ্যখাতে হার্ডলাইনে সরকার


poisha bazar

  • সেলিম আহমেদ
  • ১৯ নভেম্বর ২০২০, ০৯:৪৬

রাজধানীসহ সারা দেশে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্যাথলজিতে চিকিৎসার নামে চলছে গলাকাটা বাণিজ্য। রোগীরা প্রতিনিয়ত প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।

সরকারি স্বাস্থ্যনীতির তোয়াক্কা না করে এসব প্রতিষ্ঠান চিকিৎসার নামে রোগীদের জীবন বিপন্ন করে তুলছে। রোগীর জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণেও সেবার নামে অপারেশন থিয়েটারে চলে অমানবিক গোপন বাণিজ্য। টাকা ছাড়া তারা কিছুই বোঝেন না।

এ ছাড়া ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা থেকে কমিশন বাণিজ্য, রোগী ভর্তি, নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের ওষুধ প্রেসক্রাইব, অপারেশন নিশ্চিত করা, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে লাইফ সাপোর্টে পাঠানো, কেবিনে রোগী ধরে রাখাসহ লাশ হস্তান্তর পর্যায়ের নানা ধাপে কমিশন লেনদেন হয়। আর রোগীকে দিতে হয় বড় অঙ্কের বাড়তি টাকা। স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এসব বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো অবাধে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসা সেবার নামে দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে দীর্ঘদিন থেকে চলা এসব অনিয়মের লাগাম টানতে অবশেষে কঠোর হচ্ছে সরকার।

বেসরকারি এসব হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সেবার মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক। পাশাপাশি অফিস চলাকালে সরকারি হাসপাতালের কোনো চিকিৎসক বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে থাকতে পারবেন না। আর কোনো কারণে কর্মরত অবস্থায় থাকলে টাস্কফোর্স ও সংশ্লিষ্টদের অবগত করতে হবে বলে সাফ জানিয়ে দেয়া হয়েছে। অবশ্য এর আগেও বেসরকারি হাসাপাতালগুলোর গলাকাটা বাণিজ্যের লাগাম টানতে সরকারিভাবে নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও স্বাস্থ্য অধিদফতরের উদাসীনতার কারণে তা কার্যকর হয়নি।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সরকারি অনুমোদন ছাড়াই দেশজুড়ে চলছে ডায়াগনস্টিক সেন্টার, প্যাথলজি ব্যবসার ছড়াছড়ি। অনুমোদন এবং যথাযথ সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছে দেশের ১১ হাজার ৯৪০টি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার-সম্প্রতি এমনটাই জানিয়েছে খোদ স্বাস্থ্য অধিদফতর। সাইনবোর্ডসর্বস্ব এসব প্রতিষ্ঠানে হাতুড়ে টেকনিশিয়ান দিয়েই চলে রোগ নির্ণয়ের সব পরীক্ষা। তারা মনগড়া রিপোর্ট তৈরি করে অহরহ ঠকাচ্ছে নিরীহ মানুষকে। একই রোগের পরীক্ষায় একেকটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে একেক রকম রিপোর্ট পাওয়ার অসংখ্য নজির রয়েছে। বিশেষ করে করোনার মহামারীকালেও থামেনি বেসরকারি হাসপাতালগুলোর অমানবিক বাণিজ্য।

ফলে বাধ্য হয়ে চলতি বছরের ৬ জুলাই বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত বা অযৌক্তিক ফি আদায়ের বিষয়ে ভুক্তভোগী ব্যক্তি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করতে পারবেন এবং সেই অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করতে দুদককে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। দেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যসেবার নানা অসংগতি তুলে ধরে করা কয়েকটি রিটের ওপর দেয়া আদেশের ধারাবাহিকতায় বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খান মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দেশের স্বাস্থ্যসেবা বরাবরই গলদে পরিপূর্ণ। দেশে চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত সরকারি হাসপাতাল না থাকার কারণে মানুষ বেসরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। তাই সেই সুযোগ নিচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালগুলো। দু-একটি ভালো বেসরকারি হাসপাতাল ছাড়া বাকিগুলো সেবার নামে মানুষের গলা কাটছে।’

তিনি বলেন, ‘বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করে আমাদের দেশে যে ধরনের ব্যবস্থা নেয়ার কথা ছিল সেগুলো করা হয়নি। প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর ফি নির্ধারণ, সেবার মান খতিয়ে দেখা কিংবা নিয়ন্ত্রণ করা হয় না। আবার অনেক বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে যাদের লাইসেন্স নেই, পর্যাপ্ত সরঞ্জাম নেই। এগুলো কিন্তু এক দিনে হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের খামখেয়ালির কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এখন যদি স্বাস্থ্য বিভাগ বিষয়টি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ না করে তাহলে এই জটিল সমস্যা থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব হবে না।’

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বেসরকারি খাতের চিকিৎসা সেবার মান নিয়ে মানুষের ব্যাপক হতাশা আছে বাস্তবসম্মত কারণে। হাসপাতাল-ক্লিনিকের নামে যেসব প্রতিষ্ঠান চলছে সেখানে বাস্তবে যারা প্রশিক্ষিত সেবা দানকারী থাকার কথা তার বিপরীতে বিভিন্ন অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে সেবা দানকারীরা সুযোগ নিচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ-ব্যবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এ-সংক্রান্ত আইনের ঘাটতির কারণে মুনাফাভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু হয়েছে। সেখানে আইনের নীতি প্রয়োগের ঘাটতি এবং নিয়ন্ত্রণ ও তদারকিতে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। ফলে দেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নেই।’

সার্বিক প্রসঙ্গে গতকাল বুধবার বেসরকারি হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ক্লিনিকগুলোর সেবা নিয়ে সচিবালয়ে এক পর্যালোচনা সভা শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সাংবাদিকদের বলেন, বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় শৃঙ্খলা আনতে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াও বিভিন্ন সেবার ‘ফি’ নির্ধারণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি সেবার মান ও সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ‘ক্যাটাগরিও’ নির্ধারণ করা হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আগামীতে প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিকের যেসব চার্জ হবে এবং উনারা (মালিকপক্ষ) সেবা দেবেন, সেই সেবার মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া হবে। সেটা উনাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে করা হবে। যে চার্জ নির্ধারণ করে দেয়া হবে সেগুলো ডিসপ্লে করতে হবে। সেখানে থাকবে-এই ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এই সেবা দেয়া হয়, এই সেবার মূল্য এই। যেটা তারা একটা বোর্ডে দিয়ে দেবেন, যেটা সরকারি হাসপাতালে আছে।’

বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ক্যাটাগরি নির্ধারণ করা নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বিভিন্ন হাসপাতালের মানও আলাদা, কোনো বড় হাসপাতাল বা ক্লিনিকে হয়তো অনেক অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। তাই ক্যাটাগরি নির্ধারণ করে দেয়া হবে এবং তাতে হাসপাতালগুলোও রাজি আছে।’

চিকিৎসা কেন্দ্রে সেবার মান কিভাবে বাড়ানো যায়, সেটাই এ সভার মূল্য উদ্দেশ্য ছিল জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘জনগণ যাতে প্রতারিত না হয়। জনগণ যাতে সঠিক মূল্যে চিকিৎসা পায়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা সঠিক মূল্যে করতে পারে। আমরা কমিটি গঠন করে দেব। কমিটি আস্তে আস্তে তাদের নিয়ে এই কাজগুলো করে সুন্দর একটি সমাধান দেবে।’

সভায় বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রের লাইসেন্স নিয়েও কথা হয়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বলেছি, স্বাস্থ্যসেবার মান আরো বাড়াতে হবে। যাদের লাইসেন্স নবায়ন করা নেই, তাদের তা নবায়ন করতে হবে, বিশেষ করে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের। যদি লাইসেন্স নবায়ন না থাকে, সরকারের নিয়ম-নীতির ভায়োলেশন থাকে, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। উনারা অনেক কিছুতে আমাদের সঙ্গে আন্তরিকভাবে একমত হয়েছেন।’

তিনি বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে অনুমোদন এবং যথাযথ সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই দেশের ১১ হাজার ৯৪০টি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৯১৬টি হাসপাতাল ও ক্লিনিক লাইসেন্সের জন্য কোনো আবেদনই করেনি। ৯ হাজার ২৪টি হাসপাতাল-ক্লিনিকের মধ্যে কোনো কোনোটি লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে চিকিৎসা দেয়া শুরু করলেও এখনো অনুমোদন পায়নি। আবার কোনো কোনোটির লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, সেই অর্থে সেগুলোও অবৈধ।

জাহিদ মালেক বলেন, একটি ক্লিনিক, হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কী ধরনের যন্ত্রপাতি, জায়গা ও জনবল অবশ্যই থাকতে হবে, সে বিষয়গুলোও নির্ধারণ করে দেয়া হবে। উনারা (বেসরকারি হাসপাতালের মালিকরা) একটা দাবি করেছেন যে, হাসপাতাল থেকে যে বর্জ্য সৃষ্টি হয়, সেটা ট্রিটমেন্ট করার একটা ব্যবস্থা করা। এ বিষয়ে আমরা দেখব কীভাবে সাহায্য করতে পারি।’

অন্যদিকে অফিস চলাকালে সরকারি হাসপাতালের কোনো চিকিৎসক বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে থাকতে পারবেন না। কোনো কারণে কর্মরত অবস্থায় থাকলে টাস্কফোর্স ও সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি জানাতে হবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন টাস্কফোর্স কমিটির সদস্যরা।

 






ads