ডিজির প্রশ্রয়ে ‘রেল বিশ্বাস’


poisha bazar

  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ২৭ অক্টোবর ২০২০, ২৩:২৪

গণপূর্তের টেন্ডার মাফিয়া জিকে শামীমের মতোই রেলওয়েতে উত্থান ঘটেছে নতুন এক মাফিয়ার। তার প্রকৃত নাম আফসার বিশ্বাস-তবে নিজস্ব মহলে তার পরিচিতি ‘রেল বিশ্বাস’ নামে। বাংলাদেশ রেলওয়ের সব টেন্ডারের নিয়ন্ত্রণ এই একজনের হাতেই।

রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. শামসুজ্জামানের প্রশ্রয়েই দিনের পর দিন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবিশ্বাস্য উত্থান ঘটেছে ঠিকাদার আফসার বিশ্বাসের। একক নিয়ন্ত্রক হিসেবে তিনি ও তার সিন্ডিকেট বাগিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার কাজ।

জাতীয় সংসদ ভবনে গত ২০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ বিষয়টি উঠে আসে। ডিজির উপস্থিতিতেই কমিটির সদস্যরা আফসার ঠিকাদারের নাম উল্লেখ করে বিষয়টি নিয়ে ডিজিকে ভর্ৎসনা করেন। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দেন। একইসঙ্গে এসব অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে একটি সংসদীয় সাব কমিটিও গঠন করে দেয়া হয়। বৈঠক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

কমিটির সভাপতি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে কমিটির সদস্য রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন, আসাদুজ্জামান নূর, শফিকুল ইসলাম শিমুল, মো. শফিকুল আজম খান, মো. সাইফুজ্জামান, গাজী মোহাম্মদ শাহ নওয়াজ ও বেগম নাদিরা ইয়াসমিন জলি অংশ নেন। রেলপথ মন্ত্রণালয়ে সচিব ও অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক, রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সচিব ও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ রেলওয়ের উন্নয়ন কাজ মানেই ঠিকাদার আফসার বিশ্বাস। নিজের ও আত্মীয়-পরিজনদের নামে-বেনামে ঠিকাদারি লাইসেন্স নিয়ে পুরো রেলের কাজ নিয়ন্ত্রণ করেন এই আফসার। তার খুঁটি রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি)। নিজেকে ডিজির লোক পরিচয় দিয়ে সব কাজ বাগিয়ে নেন তিনি।

বিষয়টি সংসদীয় কমিটির বৈঠকে তুলে ধরেন কমিটির সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুল। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এই আফসার জিকে শামীম ক্যাটাগরির। তিনি একাই সব নিয়ন্ত্রণ করেন। এভাবে সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হওয়ায় রেলওয়ের কাজের মান ঠিক থাকে না।

বৈঠক শেষে শফিকুল ইসলাম শিমুলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বৈঠকে আলোচনার বিষয় নিয়ে আমি কথা বলার কেউ না, কথা বলবেন সভাপতি। পরে জানতে চাওয়া হয় আফসার ঠিকাদার নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না? জবাবে তিনি বলেন, হ্যাঁ হয়েছে। তবে বিস্তারিত সভাপতি বলতে পারবেন।

এরপর যোগাযোগ করা হয় রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার গলার অবস্থা খুব খারাপ। আমি কথা বলতে পারছি না। আমার পিএসকে ফোন করেন, তিনি সব বলতে পারবেন।’

সভাপতির কথার সূত্র ধরে তার একান্ত সচিব (পিএস) এম মাসুমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেন বলেন, ‘আমি তো সার্বক্ষণিক বৈঠকে থাকি না। একবার যাই, আবার বের হই কাজে। ফলে আমি বিস্তারিত বলতে পারব না।’

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, রেলের কাজ সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি-এ নিয়ে সভাপতিসহ সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আলোচনায় উঠে আসে বাংলাদেশ রেলওয়ের মোট ৩৮টি তালিকাভুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থাকলেও মূলত ঠিকাদার মাত্র ৪-৫ জন। তারাই নামে-বেনামে ঠিকাদারি লাইসেন্স করে সব কাজ নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে অন্য যোগ্য ঠিকাদাররা সেখানে কাজ পান না। এটা কেন হচ্ছে-রেলওয়ের মহাপরিচালকের কাছে জানতে চান কমিটির সদস্যরা। একপর্যায়ে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আলোচনাকালে বলা হয়, রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রণ দফতর (সিওএস), কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানা, সৈয়দপুর ক্যারেজ কারখানা, চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ক্যারেজ কারখানা আফসার সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে।

এ ছাড়া বৈঠকে বাংলাদেশ রেলওয়ের ক্রয় পদ্ধতি, রেলওয়ের দুটি জোনকে চার জোনে রূপান্তর করার সর্বশেষ অবস্থা, চট্টগ্রামে বাংলাদেশ রেলওয়ের জমিতে পেট্রোল পাম্প স্থাপনের জন্য লিজ প্রণয়ন সম্পর্কে, চট্টগ্রামে বাংলাদেশ রেলওয়ের জমিতে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য লিজ প্রদানের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকে বাংলাদেশ রেলওয়ের জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ, বিভিন্ন পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও রেলওয়ের প্রয়োজন হবে না-এমন জায়গা সঠিক উপায়ে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আলোচনা হয়। পরে আলোচনা শেষে বৈঠকে ক্রয় নীতিমালা সঠিকভাবে অনুসরণ ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি খতিয়ে দেখার জন্য সাব-কমিটি গঠন করা হয়।

 






ads