পর্দার আড়ালেই গডফাদার


poisha bazar

  • শাহীন করিম
  • ২৫ অক্টোবর ২০২০, ০৯:০৫

নানা অপরাধে জড়িত কিংবা তৃণমূলের দুর্নীতিবাজরা গ্রেফতার হলেও তাদের গডফাদার বা মদদদাতারা সব সময় থাকছেন পর্দার আড়ালে। দৃশ্যমান অভিযুক্তদের কাছ থেকে যারা সুবিধা নেন, সেই পৃষ্ঠপোষকদের নামও কখনো প্রকাশ হচ্ছে না। এমন দৃশ্যমান অপরাধী কিংবা বিতর্কিত ব্যক্তিরা গ্রেফতারের পর তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়ার পর সাজাও হচ্ছে।

কিন্তু ক্ষমতার প্রভাব বিস্তারের জন্য কারা পেছন থেকে অপরাধীদের সহযোগিতা করেছেন, তাদের নাম কখনো প্রকাশ হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্মকর্তারাও নেপথ্যের গডফাদারদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণের অভাবে মদদদাতারা অধরা থাকেন বলে দাবি তদন্তকারীদের।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব কারণে একজন মালেক, সাহেদ, পাপিয়া, সম্রাট ধরা পড়লেও কিছুদিন পর আরেকজন নতুন করে তৈরি হচ্ছেন। যারা তাদের তৈরি করছে তাদের আইনের আওতায় আনতে পারলে এই ধরনের দুর্নীতিবাজ কিংবা অপরাধীরা আবার নতুন করে সৃষ্টি হতো না।

ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে টাকার কুমির বনে যাওয়া স্বাস্থ্য অধিফতরের গাড়িচালক আবদুল মালেক ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী আবজাল দম্পতি সম্প্রতি ধরা পড়েন। শত কোটি টাকার মালিক এই গাড়িচালককে গ্রেফতারের পর বেরিয়ে এসেছে তার সম্পদের বিস্ময়কর তথ্য। এ ছাড়া স্বাস্থ্যখাতে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী আবজাল ও তার স্ত্রীর নামে অবৈধ সম্পদের তদন্তে বেরিয়ে আসছে যেন ‘কেঁচো খুঁড়তে সাপ’। অঢেল সম্পদের মালিক এই দম্পতির অষ্ট্রেলিয়া ও কানাডায় বিলাসবহুল ২টি বাড়ি ছাড়াও ১৮টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকার তথ্যের খবর প্রকাশ পায়। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কিন্তু এদের পৃষ্ঠপোষক নেপথ্যের হোতারা থেকে যায় অধরা।

এর আগে করোনা পরীক্ষার নামে প্রতারণা করে গ্রেফতার হন রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদ ওরফে সাহেদ করিম। একই ধরনের প্রতারণা করে গ্রেফতার হন জেকেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ ও তার স্বামী আরিফ চৌধুরী। প্রশ্ন উঠে, কীভাবে এই দুই প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে অনুমতি পেল। কারা তাদের কাজ পেতে সহযোগিতা করেছেন।

গত ফেব্রুয়ারিতে গ্রেফতারের পর আলোচনায় আসেন নরসিংদীর যুব মহিলা লীগের নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়া ও তার স্বামী সুমন চৌধুরী। নরসিংদীর এই নারী নেত্রী কীভাবে এত প্রভাব বিস্তার করে পাঁচ তারকা হোটেল ভাড়া করে অপকর্ম করলেন, কারা তাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন- তা নিয়ে মিডিয়ায় আলোচনা হলেও তদন্তকারীরা কাউকে আইনের আওতায় আনতে পারেননি। এমনকি সুবিধাভোগীদের কাউকেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। ফলে কিছুদিন পরই থেমে গেছে আলোচনা।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে কঠোর অভিযান শুরু হলে অবৈধ ক্যাসিনোর হোতা বা গডফাদাররা অন্তরালে চলে যায়। অভিযানে সারা দেশে দুর্নীতিবাজ ও অপরাধীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। ওই অভিযানের ইসমাইল হোসেন সম্রাট, খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া, টেন্ডারবাজ জিকে শামীম, ঢাকার একাধিক ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ খোদ সরকারি দলের প্রভাবশালী বেশ কয়েকজন নেতা ধরাশায়ী হন।

সূত্রগুলো বলছে, ওই সময় গডফাদারদের কেউ বিদেশে কেউবা দেশেই আত্মগোপনে যান। এ উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণের অভাবে অনেককে গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ নিয়ে তখন জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়।

পর্দার আড়ালে থাকা গডফাদারদের গ্রেফতার না হওয়া প্রসঙ্গে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘পেছনে থেকে যারা এদের সাহেদ বা পাপিয়া বানিয়েছে, তাদের কখনই ধরা হয় না। এ কারণে আজ এদের বিস্তৃতি ঘটছেÑএটা শতভাগ সত্যি। আসলে এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। ফলে একজন ধরা পড়লেও আরেকজন তৈরি হচ্ছে। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা এ বিষয়ে আরো মনোযোগী হবেন বলে আশা করছি।’

এর আগে বিএনপির শাসনামলেও ছিল একই অবস্থা। অঘোষিত ডন হয়েছিলেন গিয়াসউদ্দিন আল মামুন। এছাড়া হারিছ চৌধুরী, এম এ এইচ সেলিমসহ (সিলভার সেলিম) অনেকেই সরকারি প্রভাব খাটিয়ে হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। যদিও বিএনপির শাসনামলে তাদের কাউকেই গ্রেফতার করা হয়নি। মামুন গ্রেফতার হলেও হারিছ চৌধুরী পালিয়ে যান। তিনি এখন কোথায় আছেন কেউ জানেন না। শুধু নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টু এমপি থাকা অবস্থায় একবার গ্রেফতার হন। এছাড়া বিএনপির সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তেমন কাউকেই গ্রেফতার করেনি। একের পর এক বিচারহীনতার সংস্কৃতি তাদের ‘দানব’ বানিয়েছিল।

২০১৮ সালে সারাদেশে প্রথম একযোগে মাদকবিরোধী অভিযান শুরুর পর থেকে আত্মগোপনে যান মাদকের শীর্ষ হোতারা। নিজেকে রক্ষা করতে অনেকে আশ্রয় নেন রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে। গডফাদার, প্রভাবশালী আশ্রয়দাতা, বিনিয়োগকারী ও পৃষ্ঠপোষকের নাম বেরিয়ে এলে অনেকেই বিপাকে পড়েন। তখন এ নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন দেখা দেয়। পরবর্তীতে অনেকেই প্রকাশ্যে আসেন। ওই সময় রাঘব বোয়ালরা গ্রেফতার না হওয়ায় পরবর্তীতে ফের অবাধে মাদকের সরবরাহ বাড়তে থাকে। দুই বছরের মাথায় সেই আগের চিত্র ফিরে এসেছে। বরগুনার আলোচিত রিফাত হত্যা ও টেকনাফে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান নিহতের ঘটনায় সারা দেশে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

অপরদিকে নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) কার্যক্রম হুমকির মুখে পড়তে বসেছে। জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি, সংশোধন, দ্বৈত ও রোহিঙ্গাদের ভোটার করার সঙ্গে জড়িত হচ্ছেন কতিপয় ডাটা এন্ট্রি অপারেটরা। এসব কাজে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকাও লেনদেন হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জালিয়াতির মাধ্যমে সংশোধিত এনআইডি দিয়ে জাল দলিল, জমি দখলসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজ করছেন সংশ্লিষ্টরা। ডাটা এন্ট্রি অপারেটররা একাই জালিয়াতির কাজ করছেন না। হাতেগোনা কয়েকজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলেও তাদের নেপথ্যে থাকা গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছেন।

জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক ও মুখপাত্র লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ মানবকণ্ঠকে বলেন, সরাসরি অপরাধকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেফতারের পাশাপাশি আমরা নেপথ্যের পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করি। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, তথ্য-প্রমাণ না মেলায় ক্ষেত্রবিশেষে পেছনের ব্যক্তিদের গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করা মুশকিল হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে একই প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) মো. সোহেল রানা বলেন, কোনো অপরাধীকেই পুলিশ ইচ্ছাকৃত ছাড় দেয় না। প্রত্যেকটি অভিযানের আগে পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। তবে যারা নেপথ্যে থেকে কাজ করেন, তারা অনেক ক্ষেত্রেই সাক্ষী-প্রমাণ রাখেন না। সেক্ষেত্রে সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে গ্রেফতার করা যায় না কিংবা বিচারে দোষী প্রমাণিত হয় না।






ads