শীতে করোনা নিয়ে শঙ্কা


poisha bazar

  • সেলিম আহমেদ
  • ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৯:২১

করোনা ভাইরাসের প্রথম দফার ধাক্কা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি বাংলাদেশ। এরই মধ্যে দ্বিতীয় দফার ধাক্কা নিয়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা ও সংশয়। শীত মৌসুম চলে আসছে। অক্টোবরের শেষ কিংবা নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে দেশে বাড়তে পারে শীতের প্রকোপ।

শীত মৌসুমে দ্বিতীয় দফার ধাক্কায় দেশে করোনা প্রাদুর্ভাব আরো ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সরকারে বিভিন্ন পর্যায়ের মন্ত্রী, এমপি ও সরকারদলীয় নেতারা সবাইকে সতর্ক করে করোনা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। দ্বিতীয় দফার করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে ফের রূপরেখা তৈরির কাজ শুরু করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারের পক্ষ থেকেও বিশেষ প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতের সময় অনেকক্ষণ জীবাণু বাতাসে ভেসে বেড়ায়। বিশেষ করে শীতকালে বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকায় হাঁচি, কাশি দেয়া হলে জীবাণুর ক্ষুদ্র কণাগুলো অনেকক্ষণ ধরে ভাসতে থাকে। গরম মৌসুমে এটা দ্রুত ধ্বংস হয়ে যায়। শীতের সময় সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকায় মানুষের মধ্যে ইতোমধ্যে নানা ধরনের সংশয় শুরু হয়েছে। বাংলাদেশে মানুষের ঘনবসতি থাকায় আরো বেশি শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা ভাইরাসের জন্য বিশেষ করে চার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বিশেষ অনুক‚ল বলে দেখা গেছে। সূর্যের আলোয় যে অতিবেগুনি রশ্মি থাকে তা ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। কিন্তু শীতের সময় অতিবেগুনি রশ্মির পরিমাণও কম থাকে। যদিও শীতকালে করোনা ভাইরাসের বিস্তার বেশি হয়, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্যপ্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

অনেক সময় দেখা যায়, সাধারণ সর্দি-কাশির মতো অনেক রোগ শীতকালে বেড়ে যায়। কিন্তু কর্মকর্তারা বলছেন, এখানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে সাধারণ ফ্লু থেকে করোনা ভাইরাসকে আলাদা করা। কারণ করোনা ভাইরাস এবং সাধারণ ফ্লুর লক্ষণ অনেক সময় একই রকমের হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে পরীক্ষার সংখ্যা যেমন বাড়াতে হবে, সর্দি-কাশির লক্ষণ দেখা দেয়ার পর পরীক্ষা করানোর ব্যাপারে মানুষজনকেও আগ্রহী হয়ে উঠতে হবে।

ইতোমধ্যে দেশে করোনা সংক্রমণ দেখা দেয়ার ৬ মাস পেরিয়ে গেলে সংক্রমণ কোন পর্যায়ে আছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই সরকারের কাছে। যারা নিজে থেকে করোনা ভাইরাস পরীক্ষা করাতে যাচ্ছেন, কেবল তাদের তথ্যই সরকারি খাতায় আসছে। যাদের উপসর্গ সেভাবে নেই, তারা হিসাবের বাইরেই থেকে যাচ্ছেন। এছাড়াও প্রতিদিন স্বাস্থ্য অধিদফতর যে মৃত্যুর তালিকা দিচ্ছে তার বাইরেও প্রতিদিন অনেকে করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা যাচ্ছেন। কিন্তু করোনা উপসর্গ নিয়ে যারা মারা গেছেন তাদের হিসেবও মৃত্যু তালিকায় আসছে না।

বিশেষজ্ঞরা করছেন, এই দীর্ঘ সময়ে করোনা মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট অনেকের খামখেয়ালিপনার কারণে সংক্রমণ পুরো সারাদেশের গ্রামগঞ্জেও ছড়িয়ে পড়েছে। শীতকালে পরিস্থিতি জটিল সংকট তৈরি করতে পারে বলে তারা মনে করছেন। তাদের মতে, গ্রামে স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা সীমিত, কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাতের নাগালের বাইরে। আবার গ্রামের মানুষের মধ্যে সচেতনতাও কম রয়েছে। পাশাপাশি শীতকালে সামাজিক দূরত্বও কমে আসে।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং খ্যাতিমান মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ মানবকণ্ঠকে বলেন, যখন আমাদের দেশে করোনা শুরু হয় তখন শীতকাল ছিল না। তবে তখন চীনে শীত ছিল, চীনে সংক্রমণও বেড়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি বাংলাদেশেও সংক্রমণ বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. এ লেলিন চৌধুরী বলেন, জনসংখ্যা অনুপাতে পরীক্ষা হচ্ছে না। পর্যাপ্ত পরীক্ষা হলে বাস্তব পরিস্থিতি উঠে আসবে। তাছাড়া করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা আসছে, পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। এতে বিপুল সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়ে যাবে। ইউরোপ, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনামে দ্বিতীয় ওয়েব দেখা দিয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে যে অবস্থা চলছে সে রকম পরিস্থিতি তৈরি হলে হাজার হাজার মানুষ মারা যাবে।

এদিকে প্রথম সংক্রমণের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এই দফায় অধিকতর সতর্কতা অবলম্বনের বিষয়ে জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে নতুন কোনো কৌশলের সন্ধান মিলছে না। আগের কৌশল থেকে বেশ কিছু বিষয় বাদ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আরো কঠোরভাবে কার্যকর করার কৌশলে এগোচ্ছে সরকার। সরকারের সামনে মূলমন্ত্র হয়ে উঠেছে সতর্কতা। বিশেষজ্ঞরাও সরকারকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, দ্বিতীয় ধাপের করোনা সংক্রমণ রোধে এবার লকডাউনে না গিয়ে আগের নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে কঠোর হওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে সায় পাওয়া গেছে। এর জন্য শপিং মল, যানবাহন, হাট-বাজার, অফিস-আদালতসহ জনবহুল এলাকায় মাস্ক ব্যবহারে মানুষকে বাধ্য করতে দ্রুত প্রশাসনিক অভিযান শুরু হবে। যারা মাস্ক পরবে না, তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতেও বাধ্য করা হবে। এ জন্য মাঠে নামবে মোবাইল কোর্ট ও সমন্বিত মনিটরিং টিম।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘দ্বিতীয় সংক্রমণ যে হবেই, সেটা এখনো নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে আগের মতো পরিস্থিতি যাতে না হয় সে জন্য আগাম প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে একটি রোডম্যাপও করা হয়েছে। নতুন কৌশল পাওয়া সহজ নয়। তাই আগের কৌশলগুলো আরো কার্যকর করার ওপরই আমরা বেশি জোর দিচ্ছি। মানুষকে আরো সচেতন করতে হবে। সচেতন না হলে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

 





ads