এনআইডি জালিয়াতির পেছনে ‘অস্থায়ী’ কর্মীরা!


poisha bazar

  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৯:২৪

ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাসের জাল সনদ তৈরি ও বিতরণ করে এখন কারাগারে কথিত রিজেন্ট গ্রুপের কর্ণধার মো. সাহেদ ও জেকেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা। আলোচিত এই ঘটনাটি চাপা পড়ার আগেই সামনে চলে আসে এনআইডি জালিয়াতি করে কুষ্টিয়ায় জমি হাতিয়ে নেয়ার ঘটনাটি। এ অভিযোগে জালিয়াত চক্রের মূল হোতা গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারও হন। এর আগে জাল ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি এনআইডি প্রদানের ঘটনাও আলোচনায় আসে।

এত সব ঘটনার পরও জালিয়াত চক্রের সন্ধানের বিষয়টি অনুসন্ধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন (ইসি) এ নিয়ে শুদ্ধি অভিযান শুরু করায় বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল। জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের ‘আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং একসেস টু সার্ভিসেস (আইডিইএ)’ প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই গুরুতর এই অপরাধে জড়িত। রাজস্ব খাতের কর্মচারী না হওয়ায় চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণেই তারা বাড়তি টাকা আয়ের জন্য এই অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নিজেদের আখের গুছিয়ে নিতে চাকরির শর্ত ও অঙ্গীকার ভুলে তারা নিজ কর্মস্থলকে ঠেলে দিচ্ছেন হুমকির মুখে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এসব অনিয়ম, অপকর্ম ও দুর্নীতির অভিযোগে এরই মধ্যে চাকরি খুইয়েছেন প্রায় অর্ধশত কর্মকর্তা-কর্মচারী; যাদের সবাই প্রযুক্তিতে দক্ষ। তবে এদের মধ্যে একজনও ইসির নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারী নেই। চাকরিচ্যুতরা হলেনÑআইডিয়া প্রকল্পের একজন সহকারী পরিচালক, তিনজন টেকনিক্যাল এক্সপার্ট, চারজন টেকনিক্যাল সাপোর্ট, ৩০ জন ডেটা এন্ট্রি অপারেটর এবং একজন মেসেঞ্জার।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ছবিসহ ভোটার তালিকা কার্যক্রম ২০০৭ সালে শুরু হলেও স্মার্টকার্ড প্রকল্প (২০১২ সাল) হাতে নেয়ার আগ পর্যন্ত দুর্নীতির কোনো খবর ছিল না এখানে। সীমিত জনবল দিয়ে এনআইডির বিশাল কর্মযজ্ঞ চলতে থাকে। এনআইডির ক্ষেত্র বাড়ায় সীমিত জনবল দিয়ে দৈনন্দিন কার্য সম্পাদন করা দুরূহ হয়। সরকারের কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী জনবল না পাওয়ায় পরবর্তীতে আইডিইএ প্রকল্পে যুক্তদের এখানে নিয়োগ দিয়ে এনআইডির কাজ চালিয়ে নেয়া হচ্ছে।

সেই অর্থে বলা যায়, আইডিইএ প্রকল্পের কর্মীদের মাধ্যমে এনআইডিতে দুর্নীতি শুরু হয়। গত ৭ বছরে যে ৩৯ জন চাকরি হারিয়েছেন তাদের সবাই এ প্রকল্পের। ২০১৩ সালের নভেম্বরে অনৈতিক কাজের দায়ে চাকরি হারান টেকনিক্যাল এক্সপার্ট মোহাম্মদ জাকির হোসাইন। ওই বছরের ডিসেম্বরে টেকনিক্যাল সাপোর্ট মো. ইয়াসির আরাফাত একই অপরাধে চাকুরিচ্যুত হন। এর পরও দুর্নীতি থামেনি বরং ধাপে ধাপে বেড়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫ সালে এনআইডি জালিয়াতিতে জড়িত থাকায় তিনজনের চাকরি যায়। এরা হলেনÑসহকারী পরিচালক মোস্তফা হাসান ইমাম, টেকনিক্যাল এক্সপার্ট মাহমুদুল হাসান ও ইকবাল হোসাইন। পরের বছর ২০১৬ সালে দুর্নীতির দায়ে চাকরি যাওয়া ৯ জনই ডেটা এন্ট্রি অপারেটর।

তারা হলেন- সাবেদুল ইসলাম, জাকির হোসেন, বাবুল আহমেদ, মোস্তফা ফারুক, আবু বক্কর সিদ্দিক, মারজিয়া আক্তার লিজা, শেখ সেলিম শান্ত, সোলায়মান ও সুতপা রানী। পরের বছর আরো আটজনের চাকরি যায়। এরা হলেনÑইকবাল হোসেন, মাহমুদুল ইসলাম, রবিউল করিম, সুব্রত কুমার বিশ্বাস, আবদুল জলিল মিয়া, তারেক আজিজ, জামাল উদ্দিন ও ইকবাল আহমেদ। তার পরের বছরে চাকরি যাওয়া তিনজন হলেন টেকনিক্যাল এক্সপার্ট সাদেক হোসাইন, ডেটা এন্ট্রি অপারেটর ইউসুফ আলী চৌধুরী রাব্বী ও সুমন দেব। গত বছরে সর্বোচ্চ ১০ জনের চাকরি যায়।

এরা হলেন টেকনিক্যাল সাপোর্ট মির্জা আসিফ ইবনে আশরাফ, ডেটা এন্ট্রি অপারেটর রিয়াজ উদ্দিন, আল আমিন, হাফিজুর রহমান, তাহমিনা আক্তার তুহিন, জাহাঙ্গীর আলম, পাবেল বড়ুয়া, জাহেদ হাসান, শাহীন ও মেসেঞ্জার আশিকুল ইসলাম পিন্টু। চলতি বছর এখন পর্যন্ত তিনজনের চাকরি গেছে বলে জানা গেছে। এদের মধ্যে রয়েছেন ডেটা এন্ট্রি অপারেটর অবিনাশ চন্দ্র রায়, সিদ্ধার্থ সংকর সূত্রধর ও আনারুল ইসলাম।

এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে অন্যের সম্পত্তি বিক্রিতে সহায়তা করার জন্য নকল এনআইডি তৈরি করে দেয়া, ব্যাংকঋণ পাইয়ে দিতে ভুয়া এনআইডি তৈরি করা এবং টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের ভোটার করা। এ ছাড়া করোনার সনদ জালিয়াতির হোতা রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদকে এনআইডি সংশোধন করে দেয়া ও জেকেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনাকে দ্বিতীয় আইডি পেতে সহায়তা করেন তারা।

নির্বাচন কমিশন ও এনআইডি কর্মকর্তারা জানান, ইসির অস্থায়ী চাকরিজীবীরা বেশি জড়িয়ে পড়ছেন অনিয়মে। এর কারণ একটি প্রকল্পের পর বিকল্প আরেকটি কর্মসংস্থান না পাওয়া থেকে অনেকের মধ্যে এক ধরনের হতাশা ভর করে। অনিশ্চিত জীবন, সংসার খরচ ও পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণসহ নানা চিন্তায় তারা আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়ার জন্য দুর্নীতিতে নেমে পড়েন। লক্ষ্য নির্ধারণ করে নেন কিভাবে বিকল্প পথে কম সময়ে ধনী হওয়া যায়। আইডিইএ প্রকল্পের কর্মীদের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ এটিই বলে মনে করছেন অনেকে।

ইসির এক কর্মকর্তা বলেন, যেকোনো প্রকল্প নেয়ার আগে সরকারকে ঠিক করে দেয়া উচিত কোনটি রাজস্ব খাতে স্থানান্তর হবে, কোনটির মেয়াদ শেষে কার্যক্রম বন্ধ হবে। এটি নির্ধারণ না থাকায় প্রকল্পের সঙ্গে যুক্তরা রাজস্ব খাতে ঢুকতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। এ নিয়ে প্রকল্পের সঙ্গে রাজস্ব খাতের কর্মীদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বও শুরু হয়।

এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ বলেন, যারা ইসির নিজস্ব কর্মকর্তা তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি এক ধরনের দায়বদ্ধতা রয়েছে। জবাবদিহির মধ্যে চাকরি করতে হয়। এমনকি প্রতিষ্ঠানের সুনামের কথা ভেবে দুর্নীতি করার আগে একটু হলেও চিন্তা করেন। তবে প্রকল্পে যারা যুক্ত হন তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়বদ্ধতা কম থাকে। তাই সহজে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। এতসংখ্যক কর্মীদের দুর্নীতির দায়ে চাকরি যাওয়ার ঘটনা বিরল; যা ইসির ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এখনই দুর্নীতির লাগাম টেনে পদক্ষেপ নেয়া জরুরি বলে মত দেন তিনি।

এদিকে, আইডিয়া প্রকল্পের কর্মীদের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ায় প্রকল্পের পিডি ও এনআইডির ডিজি ব্রি. জে. মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম নিজেও কিছুটা বিব্রত বলে এনআইডি সূত্রে জানা গেছে। প্রকল্পের কর্মকর্তাদের চাকরি রাজস্ব খাতে স্থায়ী করতে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অথচ তার অধীনস্থরা দুর্নীতিতে জড়িয়ে চাকরিচ্যুত হওয়ায় অনেকটা হতাশ হয়ে পড়েছেন তিনি। তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দুর্নীতি থেকে ফেরাতে আইডিইএ প্রকল্পের পক্ষ থেকে কাউন্সেলিং শুরু করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার আইডিইএ প্রকল্পের অফিসার ইনচার্জ অপারেশন প্ল্যানিং এবং কমিউনিকেশন স্কোয়াড্রন লিডার কাজী আশীকুজ্জামান অধীনস্থদের দুর্নীতি থেকে ফেরাতে জুমের সহায়তায় নানা পরামর্শ দিচ্ছেন প্রতিনিয়ত।

এ বিষয়ে এনআইডি উইংয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রি. জে. মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি জালিয়াত চক্রের সঙ্গে আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগ পাওয়া অস্থায়ী কর্মী ডেটা এন্ট্রি অপারেটরদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এর বাইরে চক্রের অনেকে জড়িত থাকার তথ্য আসছে। বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে রাজধানীর পাশাপাশি মাঠপর্যায়েও অনিয়ম রোধে অভিযানের পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। গত মঙ্গলবার থেকে রাজধানী ঢাকার সব থানায় শুদ্ধি অভিযান চলছে। পরবর্তীতে ঢাকার বাইরে ৫১৩টি থানা নির্বাচন অফিসসহ জেলা আঞ্চলিক অফিসে এ অভিযান অব্যাহত রাখা হবে। দুর্নীতিবাজ কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।





ads







Loading...