করোনায় মৃত্যু-শনাক্ত দুটোই কম


poisha bazar

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৯:২১

বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ দেখা দেয়ার সপ্তম মাসে এসে দিন দিন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমে আসতে শুরু করেছে। গত একদিনে (মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) করোনায় মারা গেছেন ২১ জন। যা গত ৪৬ দিনের মধ্যে সবচেয়ে কম। এই একদিনে নতুন করে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে আরো ১ হাজার ৬১৫ জন।

এর আগের দিন গত মঙ্গলবার ১ হাজার ৭২৪ জনের শরীরে পাওয়া গিয়েছিল করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি। তবে সংক্রমণের এ ধীরগতি দেখে সন্তুষ্ট নন দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সংক্রমণের গতি কিছুটা ধীর হয়েছে। তবে রোগী শনাক্তের হার এখনো অনেক বেশি। জনসংখ্যার অনুপাতে নমুনা পরীক্ষাও কম হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্র জানায়, এর আগে কোরবানীর ঈদের দিন গত ১ আগস্ট দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২১ জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এরপর গত দেড় মাসে প্রতিদিনই মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ২১ জনের বেশি। এর চেয়েও কম মৃত্যুর খবর সর্বশেষ এসেছিল রোজার ঈদের তিন দিন পর ২৮ মে, সেদিন মারা গিয়েছিলেন ১৫ জন। গত এক দিনে মারা যাওয়া ২১ জনকে নিয়ে দেশে করোনা ভাইরাসে মোট ৪ হাজার ৮২৩ জনের মৃত্যু হল। গত একদিনে আরো ১ হাজার ৬১৫ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়ায় দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৩ লাখ ৪২ হাজার ৬৭১ জন হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা সংক্রমণের বর্তমান পরিস্থিতিতে আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোনো সুযোগ নেই। যে কোনো সময় সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে। শীতকালে ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কাও করছেন কেউ কেউ। মানুষের মধ্যে সার্বজনীন মাস্ক ব্যবহার, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, হাত ধোয়ার অভ্যাস বাড়ানো এবং পরীক্ষা ও আইসোলেশনের মতো স্বাস্থ্যবিধির কঠোর প্রয়োগের ওপর এ রোগের বিস্তার অনেকটা নির্ভর করবে।

সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক তথ্য না থাকলেও অনেকেই আশঙ্কা করছেন, শীতকালের আবহাওয়ায় বাংলাদেশে সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে। তাদের আশঙ্কা, আর্দ্রতা, সূর্যের তাপ, ভিটামিন ডিয়ের অভাব এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়াসহ শীতকালে অন্যান্য ভাইরাস ও ফ্লু জাতীয় শ্বাসকষ্টের রোগের লক্ষণ দেখা দেয় বলে এ সময় মানুষ করোনা ভাইরাস নিয়ে আরো বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠতে পারে।

এদিকে শুরুর দিকে করোনা ভাইরাস নিয়ে মানুষের মধ্যে যে ভয়ভীতি ছিল, এখন তা আর নেই বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করেছেন। মানুষ অনেকটা বেপরোয়াভাবে চলাফেরা করছেন। মানুষের এই ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ সংক্রমণ বাড়িয়ে দেয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং খ্যাতিমান মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ মানবকণ্ঠকে বলেন, দেশে করোনা সংক্রমণ এখন কিছুটা কমার দিকে। কিন্তু এখন কম-বেশি বলা মুশকিল। এক মাস পরিস্থিতি দেখে বলা যাবে, কোন দিকে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, এখনতো টেস্ট কম হচ্ছে, তাই শনাক্ত কম হচ্ছে। জনগণও টেস্ট করাতে অহীনা দেখাচ্ছে। টেস্ট যদি বেশি বেশি করানো হয় তাহলে বুঝা যাবে করোনা কমছে কী না।

আগামী শীতে সংক্রমণ বাড়ার শংকা রয়েছে কী না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি, এটা বলা মুশকিল। করোনা নিয়েতো আমাদের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। যখন আমাদের দেশে করোনা শুরু হয় তখন শীতকাল ছিল না। তবে তখন চীনে শীত ছিল, চীনে সংক্রমণও বেড়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি বাংলাদেশেও সংক্রমণ বাড়ার শংকা রয়েছে।

হেলথ অ্যান্ড হোপ স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী মানবকণ্ঠকে বলেন, দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ এখনো পুরোটা নিয়ন্ত্রণে আসেনি, এমতাবস্থায় অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে অফিস-আদালত, কল-কারখানা, যানবাহন সব কিছু খুলে দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মানুষের মধ্যে করোনার স্বাস্থ্যবিধি না মানার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মাস্ক ছাড়াই মানুষের চলাচল যেমন বেড়েছে, তেমনি মানুষে মধ্যে নিরাপদ শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে অনীহা দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ নিম্নমুখী, ঊর্ধ্বমুখী বা একই ধারায় প্রবাহমান- এটা বোঝার জন্য যত সংখ্যক টেস্ট হওয়া দরকার সেটি হচ্ছে না। যে পরিমাণ কমিউনিটি জরিপ হওয়া দরকার সেটিও হচ্ছে না। ফলে এই পরীক্ষা দিয়ে করোনার গতি-প্রকৃতি, ধরন বলা সম্ভব নয়। আমরা একটা জিনিস বুঝতে পারছি, মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুবরণও করছে। আমরা করোনায় মৃত্যুর যে খবর পাই, সেখানেও সমগ্র দেশের সব হাসপাতালের মৃত্যুর খবর আসে না। শুধু দেশের সরকারি কিছু হাসপাতালের মৃত্যুর খবর পাই। ফলে এই অপ্রতুল তথ্য থেকে করোনা ভাইরাসের বর্তমান পরিস্থিতি বলা সম্ভব না।

বুধবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা স্বাক্ষরিত করোনাবিষয়ক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩ হাজার ৩৬০ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। শনাক্তের হার ১২ দশমিক ০৯ শতাংশ। আগের দিন এই হার ছিল ১২ দশমিক ২৭ শতাংশ। আগের দিনের তুলনায় গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা কমেছে। আগের দিন ৪৩ জনের মৃত্যুর তথ্য ছিল।

গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্তের খবর জানানো হয়। এর ১০ দিনের মাথায় ১৮ মার্চ করোনায় দেশে প্রথম মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করে সরকার। এখন দেশে সংক্রমণের সপ্তম মাস চলছে। শুরুর দিকে সংক্রমণ ধীর থাকলেও মে মাসের মাঝামাঝি থেকে পরিস্থিতি খারাপ হতে শুরু করে। জুনে তা তীব্র আকার নেয়।

জুলাইয়ের শুরু থেকে নতুন রোগী শনাক্তের সংখ্যা কমতে থাকে। এ সময় পরীক্ষাও কম হয়। অবশ্য গত আগস্ট মাস থেকে নতুন রোগী শনাক্তের সংখ্যার পাশাপাশি পরীক্ষার তুলনায় সংক্রমণ শনাক্তের হারও কমতে দেখা গেছে। তবে মৃত্যু সেভাবে কমছে না।





ads







Loading...