জামিন পেতে ক্যাসিনো হোতাদের তোড়জোড়


poisha bazar

  • শাহীন করিম
  • ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৯:০৯

প্রায় এক বছর আগে দেশজুড়ে তোলপাড় করা ক্যাসিনোবিরোধী (জুয়ার আসর) র‌্যাবের সাঁড়াশি অভিযানে বেরিয়ে আসে ঢাকার ক্লাবপাড়ার ভয়ঙ্কর চিত্র ও সরকারি দলের নাম ভাঙ্গিয়ে চলা কতিপয় প্রভাবশালী নেতার থলের বিড়াল।

বন্ধ হয়ে লাল-নীল রংয়ের আলোতে চলা অন্ধকার জগতের ঝলকানি ও ভয়াবহ চাঁদাবাজি। বেরিয়ে আসে সিন্দুকভর্তি অবৈধ নগদ টাকা আর হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি। ২০১৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া ক্যাসিনোবিরোধী সেই সাড়া জাগানো অভিযানে গ্রেফতারকৃত টাকার কুমির ও ক্যাসিনো হোতারা জামিনে মুক্তি পেতে তোড়জোড় চালাচ্ছেন। কেউ কেউ ইতোমধ্যেই জামিনে মুক্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

এলিট ফোর্স র‌্যাবের সেই সাড়া জাগানো প্রায় অর্ধশত অভিযানের ৩২টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে ২০টি মামলায় চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ। আরো কয়েকটির তদন্ত চলছে। তবে করোনা সংকটসহ নানা কারণে আলোচিত এসব মামলাল বিচার প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি। গ্রেফতারকৃত প্রভাবশালীরা তাদের সহযোগীদের দিয়ে ও ওই সময়ে পলাতক থাকার পর ফিরে আসা অন্ধকার জগতের ডনদের কেউ কেউ নিজেদের হারানো সেই সাম্রাজ্য ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন বলে বলে সূত্রগুলো দাবি করেছে।

একই সূত্র মতে, প্রায় এক বছর আগে শুরু হওয়া সে অভিযানের কারণে যারা গা ঢাকা দিয়েছিলেন, গ্রেফতার এড়াতে পাড়ি জমিয়েছিলেন বিভিন্ন দেশে, তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে দেশে ফিরে এসেছেন। চলে গিয়েছিলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে, ফিরেছেন জনসমক্ষে। তাদের কেউ কেউ জামিন নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। গা ঢাকা দেয়া সেসব প্রভাবশালীদের মধ্যে কেউ কেউ জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিতও হয়েছেন। গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকা ও বর্তমানে মুক্ত থাকা কতিপয় তথাকথিত প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ নিজ নিজ এলাকায় সহযোগী ক্যাডারদের ফের সক্রিয় করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন জানা গেছে।

ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান প্রথম শুরু হয় রাজধানীর ফকিরাপুলের ইয়ংমেনস ক্লাবে। অভিযানের দিন সন্ধ্যায় যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর একে একে গ্রেফতার করা হয় যুবলীগের আরো অনেক নেতাকে। তাদের মধ্যে রয়েছেন টপ টেন্ডারবাজ এসএম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জিকে শামীম, মো. লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, ক্যাসিনোর মূল হোতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, সম্রাটের সহযোগী এনামুল হক আরমান প্রমুখ। পরে তাদের যুবলীগ থেকে বহিষ্কারও করা হয়।

এ ছাড়া মোহাম্মদ শফিফুল আলম ফিরোজ, অনলাইন ক্যাসিনোর প্রধান সমন্বয়কারী সেলিম প্রধান, ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান, আলোচিত কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীব এবং ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা ময়নুল হক ওরফে মনজুকেও গ্রেফতার করা হয়।

ওই সময়ে অভিযানে গ্রেফতার হওয়া কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজ ও মোহামেডান ক্লাবের পরিচালক লোকমান হোসেন ভুঁইয়া জামিনে বেরিয়ে গেছেন। বাংলাদেশ ফিন্যানসিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, সাবেক দফতর সম্পাদক আনিসুর রহমান ও সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের ব্যাংক হিসাব তলব করে। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তিন সংসদ সদস্যসহ ২৩ জনের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

সূত্র জানায়, গ্রেফতারকৃত জিকে শামীম ও সম্রাটসহ রাঘব বোয়ালরা জামিন পেতে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। আদালতে আইনজীবী নিয়োগ করে মুক্ত হতে তোড়জোড় চলছে। তবে মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি আগ থেকেই অবহিত করলে এসব বড় মাপের ক্রিমিনালদের জামিন পাওয়া সোজা হবে না বলে জানিয়েছেন সরকার পক্ষের একাধিক আইনজীবী।

ইয়ংমেনস ক্লাব ছাড়াও ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান চালানো দেশের আলোচিত ক্লাবের মধ্যে রয়েছে-মতিঝিলের ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্র, কলাবাগান ক্রীড়াচক্র, ধানমণ্ডি ক্লাব, ফু-ওয়াং ক্লাব, চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ক্লাব, আবাহনী ক্লাব, মোহামেডান ক্লাব। এ ছাড়া বনানীর গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি ক্যাসিনোতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এছাড়া অভিযানের মধ্যেই ক্যাসিনোকাণ্ডে দখলবাজি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত অনেকেই দেশ ছেড়ে পালান; কেউ বা দেশেই গা ঢাকা দেন।

সূত্র জানায়, প্রায় তিন মাস ধরে ক্যাসিনোবিরোধী মোট ৪৯টি অভিযান পরিচালিত হয়। এর মধ্যে ৩২টি র‌্যাব ও ১৭টি অভিযান পুলিশ পরিচালনা করে। এসব অভিযানে ২৭৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে ঢাকায় ২২২ জন ও ঢাকার বাইরে ৫৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযান শেষ হওয়ার পরে দেশে ফেরেন যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক মমিনুল হক সাঈদ, কেন্দ্রীয় সদস্য মিজানুর রহমান, ছাত্রলীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সভাপতি শেখ রবিউল ইসলাম সোহেল, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্রের ইজারাদার আলী আহমেদ ও গুলিস্তান এলাকার দেলোয়ার হোসেন ওরফে দেলুসহ অন্তত ৩০-৩৫ জন।

সূত্র জানায়, ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে গ্রেফতারকৃতরা ও পলাতক থেকে পরে ফিরে আসা প্রভাবশালীদের কেউ কেউ নতুন করে নিজ এলাকায় বাহিনী গড়ে তুলে চাদাবাজিসহ নানা অপকর্মে জড়িত হওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন। তারা গুলিস্তান, ফুলবাড়িয়া, মতিঝিল, ফকিরাপুল, খিলগাঁও, শাহজাহানপুর, কমলাপুর ও পুরান ঢাকার কিছু কিছু এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে মরিয়া হয়ে উঠছেন।

জানা গেছে, ক্যাসিনোবিরোধী সেই সাঁড়াশি অভিযানে ৮ কোটি ৪৫ লাখ নগদ টাকা, ১৬৬ কোটি টাকার এফডিআর, ১৩২টি বিভিন্ন ব্যাংকের চেক বই এবং ১১ কোটি ৭৭ লাখ টাকার চেক জব্দ করা হয়। এছাড়া আট কেজি স্বর্ণ, ২২টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ ও ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনায় দায়ের করা ৩২টি মামলার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ১৪টি মামলার তদন্ত করে র‌্যাব। এর মধ্যে ১৩টি মামলার চার্জশিট আদালতে প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া এখনো একটি মামলা তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া বাকি ১৮টি মামলা তদন্ত করে পুলিশ। এর মধ্যে সাতটি মামলায় আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে তারা। এর মধ্যে গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এনামুল হক এনু ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রুপন ভুঁইয়ার বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের পাঁচটি মামলার মধ্যে চারটির চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

সিআইডির ডিআইজি মো. ইমতিয়াজ আহমেদ জানিয়েছিলেন, পুরান ঢাকার দুই ভাই এনু-রুপনের কাছ থেকে জমিসহ ২০টি বাড়ি, ১২০টি ফ্ল্যাট, ২৫ কাঠা জমি ছাড়াও ৯১টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রায় ১৯ কোটি টাকা পাওয়া গেছে।

জামিনে মুক্ত ফিরোজ ও লোকমান: ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে গ্রেফতার হওয়া কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের তৎকালীন সভাপতি ও কৃষক লীগ নেতা শফিকুল আলম ফিরোজ ও মোহামেডান ক্লাবের পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়া জামিনে বেরিয়ে গেছেন। গত ১৯ মার্চ লোকমান হোসেন ভূঁইয়া কাশিমপুর-১ থেকে ও ১ জানুয়ারি শফিকুল আলম ঢাকা কেন্দমুক্তি পান। আর শীর্ষ টেন্ডারবাজ কাম কথিত রাজনীতিক জি কে শামীমও জামিন পেয়েছিলেন, পরে তা বাতিল করা হয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, র‌্যাবের কাছে থাকা মামলাগুলোর মধ্যে একটি ছাড়া সব তদন্ত শেষে চার্জশিট প্রদান করা হয়েছে। বাকি মামলাটির চার্জশিটও শিগগিরই দেয়া হবে। মামলায় অভিযুক্ত কেউ দেশে ফিরে এলে তদন্ত কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

এই র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, জামিনের বিষয়টি মূলত আদালতের এখতিয়ার। তবে নতুনভাবে কেউ একই জাতীয় অপরাধে জড়াতে চাইলে বা আস্তানা গড়ে তোলার চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।





ads







Loading...