রাইড শেয়ারিং বন্ধে বিপাকে চালকরা


poisha bazar

  • সেলিম আহমেদ
  • ১০ আগস্ট ২০২০, ১০:২৬

শনিবার বেলা ১২টা। রাজধানীর প্রান্থপথ সিগন্যালে যাত্রীর অপেক্ষায় মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন পারভেজ মিয়া। পাশ দিয়ে কেউ হেঁটে গেলে ডাক দিয়ে বলছেন, ভাই কোথায় যাবেন? এগিয়ে গিয়ে কথা হয় পারভেজ মিয়ার সঙ্গে।

তিনি বলেন, ঢাকার কলেজ থেকে গত বছর মাস্টার্স পাস করেছেন তিনি। কিন্তু এখনো কোনো চাকরি পাননি। অভাবের সংসারের হাল ধরতে ২০১৮ সালে একটি মোটরসাইকেল কিনে অ্যাপসভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সেবা দেয়া শুরু করেন তিনি। প্রতিদিন ভালোই আয় হতো। খরচ বাদে কমপক্ষে এক হাজার টাকা নিয়ে বাসায় যেতে পারতাম। নিজের খরচ চালিয়ে গ্রামের বাড়িতে থাকা পরিবারের খরচও চালাতে পারতাম। কিন্তু করোনাকাল শুরু হওয়ার পর থেকেই বন্ধ রয়েছে রাইড শেয়ারিং সেবা। দীর্ঘদিন বাসায় বেকার বসে থাকতে থাকতে জমানো সঞ্চয়ও শেষ হয়ে গেছে। তাই বাধ্য হয়ে ফের রাস্তায় নেমেছি। এভাবেই রাস্তায় মোড়ে দাঁড়িয়ে ডেকে ডেকে যাত্রী সংগ্রহ করে চুক্তিভিত্তিক রাইড শেয়ার করছি। তবে আগের মতো এতো যাত্রী পাওয়া যায় না।

একই চিত্র কারওয়ান বাজার মোড়েও। একুশে টেলিভিশনের নিচে দিনের প্রায় সব সময়ই মোটরসাইকেল নিয়ে কয়েক চালক দাঁড়িয়ে থাকেন। সামনে দিয়ে কোনো পথচারী হেঁটে যাওয়ার সময় তারা জানতে চান কোথায় যাবেন। এ সময় যাত্রীদের সঙ্গে তাদের দর-দাম করতে দেখা যায়। তাদের একজন পাঠাও চালক ইলিয়াস উদ্দিন। রাইড শেয়ারিং সেবা বন্ধ থাকায় অনেকদিন কর্মহীন ছিলেন তিনি। এখন বাধ্য হয়েই রাস্তায় নেমে চুক্তিতে চলাচল করছেন।

চালকদের একজন জানান, অনলাইনে সেবা প্রদান বন্ধ আছে। তাই তারা এখন ‘অফলাইনে’ কাজ করছেন। তা ছাড়া দীর্ঘদিন ঘরে বসে থাকার কারণে তারা বাধ্য হয়ে চুক্তিভিত্তিক ভাড়া নিচ্ছেন।

বাংলাদেশে কোভিড-১৯ মহামারী দেখা দেয়ার পর গত ২৬ মার্চ থেকে রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে তাদের কার্যক্রম বন্ধ রাখতে চিঠি দেয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত অনলাইনভিত্তিক এই সেবা বন্ধ রয়েছে। ফলে চরম বিপাকে পড়েছেন রাজধানীর রাইড শেয়ার সেবা প্রদানকারীরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পাঠাও, উবার, ইজিয়ার, সহজ, ও ভাই, ওবোনসহ বিভিন্ন সেবার মাধ্যমে দুই লাখের বেশি মানুষ রাইড শেয়ারিং সেবার সঙ্গে যুক্ত। মোটরসাইকেলের চালকদের মধ্যে অধিকাংশই শিক্ষার্থী। তারা রাজধানীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার পাশাপাশি রাইড শেয়ার করেন। এ ছাড়াও কম বেতনে চাকরি করা ব্যক্তিরা এবং বিভিন্ন বয়সী বেকার তরুণরাও রাইড শেয়ার করে থাকেন।

২০১৬ সালে উবার প্রথম ঢাকায় রাইড শেয়ারিং সেবা চালু করে। এরপর স্থানীয় কিছু কোম্পানিও রাইড শেয়ারিং সেবা চালু করে। বর্তমানে ১২টি রাইড শেয়ার প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত মোটরসাইকেল রয়েছে দুই লাখেরও বেশি। রাইড শেয়ারিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ‘পাঠাও’ জানিয়েছে, সারা দেশে তাদের নিবন্ধিত মোটরসাইকেল সাড়ে তিন লাখ। এর মধ্যে ঢাকাতেই আড়াই লাখ। এ ছাড়া ৫০ হাজারের বেশি নিবন্ধিত গাড়ি রয়েছে। তিন মাস বন্ধের পর ২ জুলাই থেকে ঢাকায় দুই হাজার গাড়ি চলাচল শুরু করেছে। ২০১৮ সালে এ নিয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করে সরকার।

উবার জানিয়েছে, ঢাকায় তাদের অধীনে পাঁচ হাজার নিবন্ধিত গাড়ি চলাচল করছে। আর মোটরসাইকেল রাইড বন্ধ থাকায় চালকেরা উবার কানেক্টে যুক্ত হতে পারছেন। এর ফলে সহজেই পার্সেল পৌঁছানো যাচ্ছে। এ ছাড়া উবারের অন্য সেবায় যুক্ত হতে পারছেন মোটরসাইকেলের চালকরা। তবে সেই সংখ্যা কম বলে জানা গেছে।

ও ভাইয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, করোনা শুরুর পর মোটরসাইকেল রাইড অনেক কমে গিয়েছিল। এখন সেই ধাক্কা সামলে রাইড আবার ভালো হচ্ছে। এখন যেহেতু মোটরসাইকেলের চালকরা অ্যাপসের মাধ্যমে রাইড নিতে পারছেন না, তাই তাঁদের অনেককে ও ভাই পার্সেল সার্ভিসে কাজ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া করোনার শুরুতে চালকদের আর্থিক সহায়তাও দেয়া হয়েছে। করোনাকাল শুরু হওয়ার পর অ্যাপসভিত্তিক রাইড শেয়ার কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বিপাকে থাকা রাইড শেয়ারকারারা রাজধানীতে ঠিকে থাকতে চুক্তিভিত্তিক রাইড শেয়ার করছেন। রাজধানীর প্রায় প্রতি রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে তারা যাত্রীদের সঙ্গে দর-দাম করে সেবা দিচ্ছেন।

রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেল চালক বেলাল আহমদ বলেন, ‘একটু ভালো থাকার আশায় ২০০৩ সালে শেরপুর থেকে ঢাকায় আসি। প্রতি মাসে সাড়ে তিন হাজার টাকা বেতনে কাভার্ডভ্যান চালানো শুরু করি। ধীরে ধীরে বেতনও বাড়ছিল। তবে কাভার্ডভ্যান চালানোর কোনো সময়সীমা ছিল না। দিনরাত বলে কিছু ছিল না। এর পরও ২০১৮ সাল পর্যন্ত কাভার্ডভ্যান চালাই। পরে দেশে বিভিন্ন কোম্পানি রাইড শেয়ারিং সেবা চালু করলে তা দেখে কাভার্ডভ্যান ছেড়ে ২০১৯ সালের শুরুতে মোটরসাইকেল কিনলাম। পাঠাওয়ে নিবন্ধন করে যাত্রী বহন শুরু করি। এতে জীবন ভালোভাবে চলতে শুরু করে। প্রতিদিন খরচ বাদে এক হাজার টাকা নিয়ে বাসায় যেতে পারতাম।’ ‘এখন সারা দিন ঘুরেও ৫০০ টাকা হয় না। অ্যাপস বন্ধ থাকায় সড়কে ঘুরে ঘুরে যাত্রী খুঁজতে হয়।’

এদিকে ট্রাফিক পুলিশ বলছে, করোনাকালে রাইড শেয়ারে যেমন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, তেমনি যাত্রী ও চালকের আইনগত সুরক্ষা না থাকায় তৈরি হচ্ছে দুর্ঘটনার শঙ্কা। এসব বিবেচনায় অবৈধ রাইড শেয়ারের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর কথা বলছে বিআরটিএ। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর সীমিত আকারে কার রাইড শেয়ারের অনুমতি দেয়া হলেও, শারীরিক দূরত্ব মানা সম্ভব নয় এমন যুক্তিতে মোটরসাইকেল শেয়ারিং বন্ধ রেখেছে বিআরটিএ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অধিকাংশ চালকই মানছেন না স্বাস্থ্যবিধি। মোটরসাইকেলে কোনো প্রকার জীবাণুনাশক স্প্রে তো করা হচ্ছেই না বরং একই হেলেমেট ব্যবহার হচ্ছে বারবার। মৌখিক চুক্তির ভিত্তিতে চড়ে বসা যাত্রী বা চালক উভয়ই অপরিচিত, কারো তথ্যই কারো কাছে থাকছে না। এতে দুজনই হতে পারেন দুজনের বিপদের কারণ।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আব্দুর রাজ্জাক বলেন, অ্যাপ ছাড়া রাইড শেয়ারিং চালক ও যাত্রী উভয়ের জন্যই হুমকি, হতে পারে জীবননাশের কারণও। বিআরটিএ পরিচালক লোকমান হোসেন মোল্লা বলেন চুক্তিভিত্তিক চলা এসব মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে। দেশে ১২টি রাইড শেয়ার প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত মোটরসাইকেল রয়েছে এক লাখের অধিক।

 





ads







Loading...