ডিএসসিসির ৫৪ নং ওয়ার্ড

আতঙ্কের নাম কাউন্সিলর মাসুদ

চাঁদা ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে নিজস্ব বাহিনী


poisha bazar

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ০৯ আগস্ট ২০২০, ১৯:৪১,  আপডেট: ০৯ আগস্ট ২০২০, ২০:০৭

একসময় ভোট দিয়ে যাকে ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচিত করেছিলেন এলাকার মানুষ, সেই কাউন্সিলরই এখন তাদের সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসির) আওতাধীন ৫৪ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাজি মো. মাসুদের অত্যাচারে চরম আতঙ্কে দিন কাটছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।

ভোটের সময় যাদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে হাতে-পায়ে ধরে ভোটভিক্ষা করেছেন, তাদের ‘সাইজ’ করতেই কাউন্সিলর মাসুদ গড়ে তুলেছেন বিশাল এক পেটোয়া বাহিনী। বর্তমানে তার আতঙ্ক শুধু ৫৪ নং ওয়ার্ডেই সীমাবদ্ধ নেই, পুরো শ্যামপুর থানার এলাকাজুড়ে বিরাজ করছে সেই আতঙ্ক। তার নিজস্ব বাহিনী দ্বারা মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, চাঁদা আদায় ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণসহ সবকিছুই তার অধীনেই হচ্ছে। সবই ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে এসব অপকর্ম করছেন অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে মাসুদ শ্যামপুর থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে রয়েছেন।

জানা যায়, রাজধানী ঢাকা শ্যামপুরের করিমুউল্লার বাগ ৫৪ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাজি মো. মাসুদ। এমন কোনো অপকর্ম নাকি বাদ নেই তার যা তিনি করেন না। মাদক কারবারীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া, নিজের একটি বাহিনী সৃষ্টি করে নানা অপকর্ম করার সুযোগ করে নিজের আধিপত্য বজায় রাখা, বিভিন্নভাবে এলাকায় টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ভূমি দখলসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছেন তিনি।

ঈদুল আজহার আগের দিন রাতে পোস্তগোলা শ্মশান ঘাট গরুর হাটের একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিনি কয়েক রাউন্ড গুলি ছুঁড়েন। জাহিদ হাসান শুভ নামে এক ভলান্টিয়ারকে বেধড়ক মারপিট করেন নিজ হাতেই। এরই মধ্যে পুলিশের কাছে একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন শুভ।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, পোস্তগোলা শ্মশান ঘাটের গরুর হাট চলছিল। হাটের মধ্য দিয়ে মোটরসাইকেল, সিএনজি অটোরিকশাসহ যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করে কর্তৃপক্ষ। গত ৩১ জুলাই কাউন্সিলর মাসুদের ছেলে হিমু তার কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে মোটরসাইকেলের একটি মহড়া দিয়ে হাটে প্রবেশ করতে চান। এ সময় হাটের ভলান্টিয়াররা তাদের প্রবেশ করতে নিষেধ করেন। হাটের ৬ নম্বর গেটে মো. জাহিদ হাসান শুভ এগিয়ে গিয়ে তাদের বুঝিয়ে বলেন। এমন সময় তারা চলে গেলেও মিনিট ১০ পর আবার ১৫-২০ জনের একটি গ্রুপ আবার হাটে আসে। তখন হাটের লোকজন তাদের বিচারের আশ্বাস দিয়ে ফেরত পাঠালে কিছুক্ষণের মধ্যে কাউন্সিলর হাজি মো. মাসুদ হাটে এসেই এলোপাতাড়ি গুলি করেন। তার গুলির আওয়াজ শুনে লোকজন জমায়েত হলে তিনি তার বাহিনীকে দিয়ে মো. জাহিদ হাসান শুভকে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করেন।

এ বিষয়ে মো. জাহিদ হাসান শুভ বলেন, ‘আমি হাটের ভলান্টিয়ারের দায়িত্ব পালন করছিলাম। হঠাৎ করেই কাউন্সিলর এসে এলোপাতাড়ি গুলি করেন। পরে তার লোকজনসহ আমাকে রড দিয়ে অনেক পিটিয়েছেন। আমি শ্যামপুর থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছি।’

এ বিষয়ে শ্যামপুর থানার এসআই তন্ময় বলেন, ‘অভিযোগটি নিয়ে আমি তদন্ত করছি। এখন তদন্ত চলছে।’

সূত্র মতে, বেশ কয়েক বছর আগেও ক্যারম বোর্ড ও ভিডিও গেমস ভাড়া দিয়ে সংসার চালাতেন কাউন্সিলর মাসুদ। সময় বদলের সঙ্গে সঙ্গে অবস্থাও বদলাতে থাকে মাসুদের। বর্তমানে তিনি কয়েক শ কোটি টাকার মালিক। কমিশনার হওয়ার পর পোস্তগোলা বাজার সংলগ্ন একটি রুলিং মিল আর জুরাইন বালুর মাঠে একটি রোলিং মিল মালিক হয়েছেন হাজি মো. মাসুদ। তবে এই টাকার উৎস নিয়ে রয়েছে অনেক অভিযোগ। কেউ কেউ বলছেন একসময় নাকি তিনি ডাকাতি করতেন। তার নামে বেশ কয়েকটি ডাকাতি মামলাও ছিল। তার একটি মামলা নং ১১৭৭-২০০৫। পঞ্চম অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন ধারা ৩৯৫/৩৯৭ দণ্ডবিধি।

আরেক মামলা নং ১৩৮/২০০১ মেট্রো তৃতীয় অতিরিক্ত জজ আদালতে বিচারাধীন। এখন দুটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। কাউন্সিলর মাসুদ আন্তঃজেলা ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ভর্তি মালামাল মহাসড়ক থেকে ডাকাতি করতেন বলে তার ঘনিষ্ঠজনদের কাছ থেকে জানা গেছে। ডাকাতির সেই টাকা দিয়ে পরে লোহার ভাঙাড়ির ব্যবসাসহ খুলেছেন রুলিং মিলও।

এছাড়া বিভিন্ন নামে-বেনামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে বসেন তিনি। গত ডিএসসিসি নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করেছেন মাসুদ। প্রশাসন ও কিছু বর্তমান সরকারদলীয় নেতাদের ম্যানেজ করে ৫৪ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে যান। কাউন্সিলর মাসুদের অঢেল অর্থের মিল-কারখানা, বিলাসবহুল বাগানবাড়ি ও আট থেকে দশটি বহুতল ভবন। দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও বাড়ি-গাড়িসহ আরো শত শত কোটি টাকার সম্পত্তি রয়েছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে কাউন্সিলর মো. মাসুদকে বারবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি।

শ্যামপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জল হোসেন এ বিষয়ে মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘যখন কমিটি দিয়েছে তখন আমার অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকা-কলকাতা আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিলাম। আমার স্ত্রী ক্যানসারে আক্রান্ত ছিল। শাহে আলম মুরাদ কমিটি দিয়েছেন। আমি মনে করেছিলাম একটি ভালো কমিটি হবে। মাসুদ কিভাবে কমিটিতে এলো আমি জানি না। সে কমিটিতে ঢোকার পরই কাউন্সিলর হয়েছে। আমি তাদের (মাসুদ) থেকে দূরে থাকি। আমাকে একবারও জিজ্ঞাসা করেনি তাকে কমিটিতে নেয়ার বিষয়ে। তারা কিভাবে কাউন্সিলর হয় তাও বুঝি না। মানুষও নাকি এদের ভোট দেয়!’





ads







Loading...