করোনাকালে অন্য রকম কোরবানি ঈদ

করোনাকালে অন্য রকম কোরবানি ঈদ
করোনাকালে অন্য রকম কোরবানি ঈদ - ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • এস এম মুন্না
  • ৩১ জুলাই ২০২০, ০১:২৮

আল্লাহর রাহে কোরবানির তাগিদ নিয়ে বছর ঘুরে সমাগত ঈদুল আজহা। আগামীকাল শনিবার সারা দেশে পালিত হবে মুসলিম সম্প্রদায়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় এই উৎসব।

তবে এবার এমন এক সময় ঈদ উদযাপিত হতে যাচ্ছে যখন প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) বৈশ্বিক মহামারী চলছে। একই সঙ্গে দেশের বেশ কয়েকটি জেলা বন্যাকবলিত। ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকাতেও শোনা যাচ্ছে বন্যার পদধ্বনি। তাই এবারের ঈদ আনন্দের চেয়ে বিষণ্নতায় ভরা। চলতি বছরে ঈদুল ফিতরও উদযাপিত হয়েছে করোনা ভাইরাসের কারণে বিধিনিষেধের বেড়াজালের মধ্যে।

ঈদুল আজহা মানে- লোক দেখিয়ে বহুদামে কেনা পশু জবাই নয়। রুটি-গোশত খাওয়ার দিনও নয়। নয় দানের নামে লোক দেখিয়ে গোশত বিলানো। আল্লাহভীতি থেকে আত্মত্যাগের শিক্ষায় উজ্জীবিত হয়ে আল্লাহর পথে কোরবানি করাই হলো ঈদের শিক্ষা। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়- ‘চাহি নাকো গাভী দুম্বা উট, কতটুকু দান? ও দান ঝুট। চাই কোরবানি, চাই না দান।’

ঈদুল আজহাতে চাঁদ দেখার আনন্দময় অনিশ্চয়তা নেই। কারণ ১০ দিন আগেই ২২ জুলাই নিশ্চিত হয়ে গেছে পবিত্র ঈদুল আজহার দিনক্ষণ। সে অনুযায়ী পছন্দের কোরবানির পশু কিনেছেন সামার্থ্যবানরা। করোনার কারণে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও চলছে অর্থনৈতিক সংকট। যারা গতবার কোরবানি দিয়েছেন তাদের অনেকেই এবার কোরবানি দেয়া সামর্থ্য হারিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কোরবানি দিতে পারছেন না প্রায় ৩০ শতাংশ ধর্মপ্রাণ মুসলমান। তারপরও ঈদের অনেক কিছুই চলবে চিরাচরিত ধারা মেনে। মানুষ একে-অপরকে শুভেচ্ছা জানাবেন। রাজনীতিবিদরাও দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাবেন।

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদসহ শীর্ষ রাজনীতিকরা আলাদা বাণী দেবেন। শুভেচ্ছা জানাবেন। তবে বহু বছরের মধ্যে এই দ্বিতীয়বার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এবং গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঈদের দিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন না। গত ঈদুল ফিতরেও শুভেচ্ছা বিনিময় হয়নি।

শর্ত সাপেক্ষে খোলা আছে শপিংমল ও বিপণিবিতান। কিন্তু সেখানেও রয়েছে ক্রেতাসংকট। পসরা সাজিয়ে বসে আছেন বিক্রেতা, অথচ ক্রেতা পাচ্ছেন না। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এমন ঈদ তারা জীবনেও দেখেননি।

ঈদের শুরুটা হয় ঈদগা সবাই মিলে নামাজ পড়তে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। করোনার কারণে স্মরণকালে ঈদুল আজহার মতো জামাত হবে না ঈদগায়। গত ৫০ বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো জাতীয় ঈদগা ময়দানে নেই জামাতের আয়োজন। করোনার বিস্তার রোধে দেশের কোথাও এবার ঈদগায় জামাত হবে না।

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে ঈদুল আজহার প্রথম জামাত সকাল ৭টায় অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘এ বছর জাতীয় মসজিদে ঈদের দিনে ছয়টি জামায়াত অনুষ্ঠিত হবে। সামাজিক দূরত্ব এবং স্বাস্থ্য নির্দেশিকা বজায় রেখে ঈদের জামায়াত অনুষ্ঠিত হবে।’

প্রথম ঈদের জামাতে ইমামতি করবেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম মুফতি মিজানুর রহমান। প্রথম জামাতের পর দ্বিতীয়টি সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে, পরের চারটি জামাত যথাক্রমে সকাল ৮টা ৪৫, ৯টা ৩৫, সাড়ে ১০টা এবং বেলা ১১টা ১০ মিনিটে সর্বশেষ জামাত হবে।

সরকার বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবজনিত প্রেক্ষাপটে ঈদুল ফিতরের মতো ঈদুল আজহার নামাজের জামাতও খোলা জায়গার পরিবর্তে নিকটস্থ মসজিদে আদায়ের জন্য আহ্বান জানিয়েছে। ঈদের নামাজের জামাতের সময় মসজিদে কার্পেট বিছানো যাবে না। নামাজের পূর্বে সম্পূর্ণ মসজিদ জীবাণুনাশক দ্বারা পরিষ্কার করতে হবে। মুসল্লিরা প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্বে জায়নামাজ নিয়ে আসবেন।

প্রত্যেককে নিজ নিজ বাসা থেকে অজু করে মসজিদে আসতে হবে এবং অজু করার সময় কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধ নিশ্চিতকল্পে মসজিদে অজুর স্থানে সাবান/হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখতে হবে এবং মসজিদের প্রবেশদ্বারে হ্যান্ড স্যানিটাইজার/হাত ধোয়ার ব্যবস্থাসহ সাবান-পানি রাখতে হবে।

ঈদের নামাজের জামাতে আগত মুসল্লিকে অবশ্যই মাস্ক পরে মসজিদে আসতে হবে। মসজিদে সংরক্ষিত জায়নামাজ ও টুপি ব্যবহার করা যাবে না। শিশু, বৃদ্ধ, যেকোনো ধরনের অসুস্থ ব্যক্তি এবং অসুস্থদের সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তি ঈদের নামাজের জামাতে অংশগ্রহণ করা যাবে না।

করোনা ভাইরাস মহামারী থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পবিত্র ঈদুল আজহার নামাজ শেষে মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে দোয়া করার জন্য খতিব ও ইমামগণকে অনুরোধ করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় নির্দেশের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার জন্য ইমাম ও মসজিদগুলোর পরিচালনা কমিটির প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

বাঙালির কাছে ঈদ শুধু আনন্দের নয়, সব ভেদাভেদ ভুলে পরম শত্রুকেও বুকে টেনে নেয়ার দিন। কিন্তু করোনার সংকটে এখানেও বাধা রয়েছে। ঈদ জামাতের পর কোলাকুলি করা যাবে না, হাত মেলানো যাবে না।

ঈদের আগের কয়েকদিনে কোটি মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে যান পরিবারের সঙ্গে আনন্দ উদযাপনে। গোটা দুনিয়ায় যা বাংলাদেশের ‘ঈদযাত্রা’ নামে পরিচিত পেয়েছে। কিলোমিটারের পর কিলোমিটার যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকে অপরিসীম দুর্ভোগ সয়ে প্রিয়জনের কাছে ফেরার যে আনন্দ, তা দুনিয়ায় আর কোনো জাতি জানে না! কিন্তু এবার ঈদযাত্রার আনন্দময় দুর্ভোগ সহ্য করতে হচ্ছে না। গলদ্ঘর্ম সেই ভিড় নেই সড়ক, নৌ, রেল ও আকাশপথে।

প্রতিবছর ঈদে সরকারি ভবন, সড়ক সাজানো হয় রঙিন বাতি ও পতাকায়। বহু বছর পর এবারই নেই কোনো সাজসজ্জা। প্রতিবছর ঈদে নতুন করে সাজে চিড়িয়াখানা, শিশুপার্ক, বিনোদন কেন্দ্র। লাখো মানুষের ভিড় হয়। এবার করোনা ঠেকাতে সব বন্ধ। তবে সরকারি আশ্রয়কেন্দ, হাসপাতাল, কারাগারে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে। করোনার কারণে নাটক, সিনেমার শুটিং বন্ধ। তাই নেই নতুন টিভি অনুষ্ঠান।

৪ হাজার বছর আগে মুসলমানদের আদি পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.) স্বপ্নে আদিষ্ট হন সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোরবানি করার। ছেলে হজরত ইসমাইল (আ.) ছিলেন তার সবচেয়ে আদরের ধন। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে নিজ ছেলেকেই কোরবানি করার উদ্যোগ নেন তিনি। কিন্তু পরম করুণাময়ের অপার কুদরতে হজরত ইসমাইল (আ.)- এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি হয়।

হজরত ইব্রাহিম (আ.)- এর সেই ত্যাগের মহিমা স্মরণ করে মুসলমানরা প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখে আল্লাহ পাকের অনুগ্রহ লাভের আশায় তার পথে পশু কোরবানি করেন। ঈদের পরের দুই দিনও পশু কোরবানির বিধান রয়েছে। আগামী ৩ আগস্ট আসরের ওয়াক্ত পর্যন্ত কোরবানি করা যাবে। সামর্থ্যবানদের জন্য কোরবানি ফরজ হলেও ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হবে না দরিদ্ররাও। কোরবানির পশুর গোশতের তিন ভাগের এক ভাগ তাদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়ার বিধান আছে।

ঈদ মুসলমানদের সার্বজনীন অনুষ্ঠান হলেও অন্যান্য দেশের তুলনায় বাঙালি মুসলমানরা জৌলুসপূর্ণ ঈদ উদযাপন করেন। বাংলাদেশে ইসলামের প্রথম যুগে ঈদ সাদামাটাভাবে উদযাপন করা হলেও মোগল ও নবাব আমলে তা উৎসবের রূপ পায়। ১৭ শতকে পরিব্রাজক মীর্জা নাথানের ‘বাহরিস্তানে গায়েবি’ বইয়ে বাঙালির বর্ণিল ঈদের বর্ণনা পাওয়া যায়।

তার বর্ণনা অনুযায়ী, ‘ঈদে বাঙালি মুসলমানরা একে-অন্যের বাড়ি যেতেন। সেখানে আহারের ব্যবস্থা থাকত। ঈদের দিন মুসলমান নারী-পুরুষ ও ছেলেমেয়ে সুন্দর কাপড় পরত। সুন্দর পোশাক-পরিচ্ছদে সজ্জিত হয়ে শোভাযাত্রা সহকারে ঈদগাহে যেত। অবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তিরা মুক্ত হস্তে অর্থ ও উপহারাদি ছড়িয়ে দিতেন। আর সাধারণ মুসলমানরা গরিবদের দান-খয়রাত করতেন।’

ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশবাসীকে মুঠোফোনে অডিওবার্তায় ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুভেচ্ছা বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসসালামু আলাইকুম, আমি শেখ হাসিনা, বছর ঘুরে আবার পবিত্র ঈদুল আজহা আমাদের মাঝে এসেছে। আমি পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে আপনাকে এবং আপনার পরিবারের সবাইকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।’

শেখ হাসিনা আশা প্রকাশ করেন, করোনা ভাইরাস মহামারীর সব অন্ধকার কাটিয়ে ঈদুল আজহা সবার মাঝে আনন্দ বয়ে আনবে। প্রধানমন্ত্রী ত্যাগের মহিমায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশ ও জনগণের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।

বার্তাটির শেষে, তিনি করোনা ভাইরাসের বিস্তার বন্ধে স্বাস্থ্য নির্দেশিকাগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করার জন্য অনুরোধ জানিয়ে সবার উদ্দেশে বলেন, ‘ভালো থাকুন এবং সুরক্ষিত থাকুন, ঈদ মোবারক!’

কোরবানিকৃত পশুর বর্জ্য দ্বারা যাতে দুর্গন্ধ না ছড়ায় সে বিষয়ে সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে স্ব স্ব কর্তৃপক্ষ। ঈদুল আজহার পূর্ববর্তী আজ জুমার খুৎবায় এ বিষয়ে মুসল্লিদের সচেতন করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশন।

করোনার কারণে ঈদুল ফিতরে ‘ঈদ সংখ্যা’ প্রকাশ করতে পারেনি জাতীয় দৈনিকগুলো। তবে এবার সীমিত পরিসরে হলেও ‘ঈদুল আজহা সংখ্যা’ প্রকাশিত হয়েছে। ঈদ উপলক্ষে সরকার তিন দিনের (৩১ জুলাই, ১ ও ২ আগস্ট) ছুটি ঘোষণা করেছে। আজ থেকেই ছুটি শুরু হয়েছে। তবে পত্রিকার অফিস বন্ধ থাকবে চারদিন অর্থাৎ ৩ আগস্ট পর্যন্ত। মঙ্গলবার কোনো পত্রিকা প্রকাশ হবে না।

তবে দৈনিক মানবকণ্ঠসহ জাতীয় দৈনিকগুলো অনলাইন কার্যক্রম বিশেষ ব্যবস্থায় অব্যাহত থাকবে। ঈদ মানেই তো ভেদাভেদ ভুলে যাওয়ার দিন। নজরুলের কবিতার মতো সবার প্রাণ বলে উঠবে- ‘ঈদ মোবারক, ঈদ মোবারক।/দোস্ত দুশমন পর ও আপন/সবার মহল আজি হউক রওনক/যে আছ দূরে যে আছ কাছে/সবারে আজ মোর সালাম পৌঁছে’।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ

 





ads






Loading...