নারী ক্ষমতায়নে প্রতিবন্ধক ক্ষমতাবান নারীরাই!


poisha bazar

  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ১৩ জুলাই ২০২০, ০৯:৪৭,  আপডেট: ১৩ জুলাই ২০২০, ১১:৩৫

সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা ও স্পিকারসহ সিনিয়র অনেক এমপি নারী। এরপর সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রধান চালিকাশক্তি সার্বভৌম জাতীয় সংসদে কাক্সিক্ষত নারী নেতৃত্ব এখনো প্রতিষ্ঠা পায়নি। ইসির সিদ্ধান্ত মতে রাজনৈতিক দলগুলো নারী নেতৃত্বের ৩৩ শতাংশে উন্নীত করতে ব্যর্থ হয়েছে।

বছরের পর বছর সময় নিয়েও ইসির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেনি এই দলগুলো। এরজন্য ক্ষমতাবান নারীদেরই দায়ী করেছেন রাজনৈতিক দলের প্রবীণ নেতারা। তাদের মতে নারী ক্ষমতায়নে আনতে প্রতিবন্ধক ক্ষমতাবান নারীরাই। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে প্রায় অর্ধশত বছর হলেও এখনো সংসদে থাকা নারী আসনগুলো পূর্ণ করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংরক্ষিত নারী সদস্য নির্বাচিত করতে হচ্ছে। দলের একজন নারী প্রধান থাকলেই সব কিছু হয় না। দলের নেতৃত্বে নারীদের সংখ্যা বাড়াতে হবে।

দলের নেতৃত্ব গড়ে না উঠার কারণে দফায় দফায় সংবিধান সংশোধন করে নারীদের জন্য সদস্য পদ সংরক্ষিত করতে হচ্ছে সংসদকে। নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্টরা মনে করেছিলেন, নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোকে চাপ প্রয়োগ করলে হয়তো কাজ হতে পারে। কিন্তু ইসির সেই আশায় গুঁড়েবালি।

টানা তিন দফা ক্ষমতার মসনদ ধরে রাখা আওয়ামী লীগ, টানা দুইবার প্রধান বিরোধী দলের আসনে থাকা জাতীয় পার্টি এবং রাজপথের অন্যতম বড় দল বিএনপির নেতৃত্ব নারীদের হাতে থাকলেও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নির্ধারিত কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব পূরণে ব্যর্থ হয় দলগুলো। বছরের পর বছর সময় নিয়েও এ পর্যন্ত একটি দলও সরকার, সংসদ এমনকি নিজ দলে নারীদের জন্য এই কোঠা পূরণ করতে না পেরে ইসির কাছে এ বিষয়ে অনির্ধারিত সময় দাবি করে বসেছে।

দলগুলোর এই প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়ে ইসিও রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধনের জন্য করা নতুন আইনের খসড়ায় এই বিধান তুলে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ইসির এই সিদ্ধান্তে নতুন করে গোল বাঁধে। ইসির এই সিদ্ধান্তকে নারীর অগ্রগতির পথে বাধা হিসেবে অভিহিত করে এর বিরোধিতা করতে শুরু করেছেন নারী আন্দোলনের পুরোধা। যে কারণে নিবন্ধন আইনের এই প্রস্তাবনা নিয়ে অনেকটা বিপাকে পড়ে গেছে নির্বাচন কমিশন।

ইসি সূত্র জানায়, ২০০৮ সালে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের সময় রাজনৈতিক দলগুলোতে নারী নেতৃত্বের সর্বোচ্চ হার ছিল ১০ শতাংশ। ওই সময় আইন করা হয়, ২০২০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোতে নারী নেতৃত্বের হার ৩৩ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। কিন্তু গত ১২ বছরেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। এখনো বেশিরভাগ দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীদের উপস্থিতি ১০ শতাংশের নিচে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রধান দলগুলোর নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে নারীদের হাতেই। এ অবস্থায়ও তারা নির্ধারিত কোটা পূরণ করতে পারছে না। অর্থাৎ নারীরা নিজেরা ক্ষমতাবান হয়েও নারীর ক্ষমতায়নের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। এমনটি চললে ৩৩ শতাংশে নারী নেতৃত্ব উন্নীত করার আইনটি প্রতিপালন করা একরকম অসম্ভব। আর আইনটি প্রতিপালন না হলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও রাজপথের বিরোধী দল বিএনপিসহ বেশিরভাগ দলের নিবন্ধনই বাতিল করতে হবে।

এ পরিস্থিতিতেই রাজনৈতিক দলগুলোকে ‘বাঁচাতে’ ইসি আইনটি পরিবর্তন করতে যাচ্ছে বলে মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের। শুধু তাই নয়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তাদের সর্বশেষ সম্মেলনে ২০২০ সালের মধ্যে কমিটির সর্বস্তরে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করার শর্ত শিথিল করেছে। আইনটি পরিবর্তনে এ সিদ্ধান্তও ভ‚মিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন ইসি সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে ইসির পক্ষ থেকে সরাসরি কিছু বলা না হলেও ইসির সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, আলোচনা করার মাধ্যমে নতুন আইনে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন শর্তাবলী সংযোজন বা বিয়োজন করা হবে। আগামীতে পর্যায়ক্রমে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন।

তিনি বলেন, সরাসরি বা চিঠি দিয়ে কিংবা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেয়া হবে। কিভাবে সংলাপ হবে, তা নির্ভর করছে করোনা পরিস্থিতির ওপর।

এদিকে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোতে নারী নেতৃত্ব রাখার বিধান তুলে দিতে ইসির করা প্রস্তাবের বিরোধিতা শুরু করেছেন নারী এমপিরা। তারা বলেন, আমাদের দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে নারীদের সেই অবস্থান এখনো তৈরি হয়নি। তাই আমরা চাই, নারী অগ্রযাত্রায় এই ৩৩ শতাংশ কোটা বহাল থাকুক।

নারী নেত্রী ও সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য খোদেজা নাসরিন আক্তার হোসেন বলেন, এখন তো সময়ের সাথে অনেক কিছুর গতিশীলতা এসেছে। আর আমাদের দেশের নারীরা এখন অনেক সচেতন। রাজনৈতিকভাবে সামাজিকভাবে নারীরা এখন পশ্চাৎপদ নেই। আমি কোটা রাখার পক্ষেই বলব।

ওয়াসিকা আয়েশা খান এমপি বলেন, যেখানে প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধু কন্যা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তৃণমূলের নারী নেতৃত্বকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করেন, সেখানে নির্বাচন কমিশন কেন এ নারী কোটা তুলে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে, আমি জানি না। এরকম কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কিনা তাও তিনি জানেন না বলে মন্তব্য করেন এই নারী এমপি।

সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ইসির কমিশন সভায় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২-এর এ সংক্রান্ত খসড়া উপস্থাপন করা হয়। এছাড়া আরপিও বাংলায় অনুবাদ করার বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়। সিইসি কে এম নুরুল হুদা নিজেই নতুন আইনের খসড়া তৈরি করে কমিশনারদের মাঝে দিয়েছেন।

এর আগে আইন করে ২০২০ সালের মধ্যে এই শর্ত পালন করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্দেশ জারি করেছিল ইসি। সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের ভিত্তিতে এ ধারাটি যোগ করা হয়েছিল।





ads






Loading...