শেষ রক্ষা হয়নি সাবরিনার


poisha bazar

  • শাহীন করিম
  • ১৩ জুলাই ২০২০, ০৯:২৮

রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালের কার্ডিয়াক সার্জন ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী ওরফে সাবরিনা শারমিন হোসেন। সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তিনি কথিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জোবেদা খাতুন সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার (জেকেজি হেলথকেয়ার) চেয়ারম্যান।

ডাক্তারদের সংঠনের নেত্রীর পরিচয়ে ও উপর মহলে যোগাযোগের প্রভাব খাটিয়ে তার স্বামী আরিফুল হক চৌধুরীকে বুথে বসিয়ে করোনা টেস্ট করানোর কাজ বাগিয়ে দেন। নিজেও সম্পৃক্ত হন। জেকেজি ও তার স্বামীর পক্ষে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ও মাঠ পর্যায়ে গুণগান গান সাবরিনা। চিকিৎসক হিসেবে বাসায় বসে ভুয়া সনদ তৈরির মন্ত্রও স্বামীকে শিখিয়ে দেন।

টেস্ট বাণিজ্য করে এই দম্পতি হাতিয়ে নেন অন্তত আট কোটি টাকা। কিন্তু সম্প্রতি হঠাৎ ধরা পড়ে মোট ২৭ হাজার করোনা টেস্টের মধ্যে ১৬ হাজারই ভুয়া ও মনগড়া পজিটিভ-নেগেটিভ সনদ। বিপদ আঁচ করতে পেরে জেকেজি থেকে নিরাপদ দূরত্বে যেতে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সম্পর্ক না থাকার দাবি করেন চতুর চিকিৎসক সাবরিনা। এমনকি দায় এড়াতে মাত্র কয়েকদিন আগে স্বামী আরিফকে দেন ডিভোর্স (তালাক)। কিন্তু ভোল পাল্টেও শেষ রক্ষা হয়নি হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের সার্জন ও জেকেজি চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী ওরফে সাবরিনা শারমিন হোসেনের। রোববার দুপুরে তাকে আটক করা হয়। করোনা টেস্টের নামে মহাজালিয়াতির ঘটনায় তেজগাঁও থানা দায়ের হওয়া একটি মামলায় ডাক্তার সাবরিনাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

এর আগে এই নারী চিকিৎসককে প্রতারণার অভিযোগে প্রায় দেড় ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একই মামলায় ২৪ জুন গ্রেফতার হন তার স্বামী ও ‘জেকেজির’ ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আরিফুল হক চৌধুরী। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদের কার্যালয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা।

এ সময় অধিকাংশ প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী। তিনি দাবি করেন, চেয়ারম্যান তো দূরের কথা জেকেজির সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই। করোনা টেস্টের নামে জালিয়াতির বিষয়টি প্রথমে তার জানা ছিল না। শেষের দিকে জানতে পেরে তিনি বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদফতরকে জানিয়েছেন। ভুয়া সনদ তৈরি প্রক্রিয়ার সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন না। তার স্বামী আরিফকে গ্রেফতার ও জেকেজির গুলশান কার্যালয়ে অভিযানের পর পলাতক ছিলেন না বলে দাবি করেন বহুরূপী সাবরিনা।

এদিকে রোববার সন্ধ্যায় চিকিৎসক সাবরিনাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এর আগে বিকেলে তেজগাঁওয়োর ডিসি মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন, ডা. সাবরিনাকে আদালতে পাঠিয়ে সোমবার রিমান্ডে আনা হবে। করোনা ভাইরাস পরীক্ষার নামে জালিয়াতির অভিযোগে জেকেজির যেসব সদস্য গ্রেফতার হয়েছেন তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাদের সবাই বলেছেন সাবরিনাই জেকেজির চেয়ারম্যান। গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে তার স্বামী আরিফও পুলিশকে জানিয়েছেন, তার স্ত্রীই প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান। এ ছাড়া তেজগাঁও কলেজে জেকেজির বুথে হামলার অভিযোগ উঠলে সাবরিনাই প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র হিসেবে সংবাদমাধ্যমে বক্তব্য দেন। অভিযানের একদিন আগে তিনি নিজে প্রতিষ্ঠান থেকে সরে যান। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি কখনই কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করতে পারেন না।

ডিসি হারুন বলেন, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ডা. সাবরিনা কোনো প্রশ্নেরই সদুত্তর দিতে পারেনি। তার স্বামী আরিফুল হক চৌধুরীকে যে মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, সাবরিনাকেও সেই একই মামলার আসামি করা হয়েছে। নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা নিয়ে যে ঘটনা ঘটেছে ডা. সাবরিনা তার দায় এড়াতে পারেন না বলেও মন্তব্য করেন হারুন অর রশিদ। এ

তদিন পর গ্রেফতার করা কেন হলো জানতে চাইলে বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা তার সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছেন। অপর একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, কয়েকদিন ধরে আত্মগোপনে ছিলেন সাবরিনা। তিনি হাসপতালেও যাননি। দায় এড়াতে প্রতারণা দায় ও গ্রেফতার এড়াতে স্বামী আরিফকেও ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন এই ভয়ঙ্কর নারী। ব্যক্তিগত জীবনে বহুমাত্রিক ও নেতিবাচক চরিত্রের উচ্ছৃঙ্খল সাবরিনা ভণ্ড ব্যবসায়ী আরিফের চার নম্বর স্ত্রী।

কে এই ডা. সাবরিনা ও তার স্বামী: করোনা মহামারীতে মানুষের জীবন নিয়ে নির্মম বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত জেকেজির চেয়ারম্যান ও জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের ডা. সাবরিনা চৌধুরী ও তার স্বামী প্রতারক আরিফ চৌধুরী। তার করোনা টেস্টের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। ডা. সাবরিনা ও তার স্বামী আরিফ চৌধুরীর জীবনও রূপকথার মতো। আরিফের চতুর্থ স্ত্রী সাবরিনা। আরিফের এক স্ত্রী থাকেন রাশিয়ায়, অন্য একজন লন্ডনে। আর আরেকজনের সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। ছাড়াছাড়ির পরও সাবেক ওই স্ত্রী বিভিন্ন জায়গায় আরিফের জন্য দেনদরবার করে যাচ্ছেন।

তদন্ত সংশ্নিষ্টরা বলছেন, মূলত সাবরিনার হাত ধরেই করোনার স্যাম্পল কালেকশনের কাজটি বাগিয়ে নেয় অনেকটা অখ্যাত জেকেজি নামে এই প্রতিষ্ঠান। প্রথমে তিতুমীর কলেজে মাঠে স্যাম্পল কালেকশন বুথ স্থাপনের অনুমতি মিললেও প্রভাব খাটিয়ে ঢাকার অন্য এলাকা আরো অনেক জেলা থেকেও নমুনা সংগ্রহ করছিলেন তারা। স্বামী-স্ত্রী মিলে করোনা টেস্ট করলেও তাদের দাম্পত্য জীবন সুখের নয়। স্ত্রীর সঙ্গে অশালীন অবস্থায় দেখতে পেয়ে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের এক চিকিৎসককে মারধর করেন আরিফ চৌধুরী। পরে এ ঘটনায় স্বামীর বিরুদ্ধে শেরেবাংলানগর থানায় জিডি করেন ডা. সাবরিনা। বিএমএর নেতার পরিচয় ভাঙিয়ে চলাফেরা করেন সাবরিনা।

স্বামীকে অস্বীকার করলেন সাবরিনা: করোনার ভুয়া রিপোর্ট কেলেঙ্কারিতে ফেঁসে যাওয়া জেকেজি হাসপাতালের এমডি কাম প্রধান নির্বাহী (সিইও) আরিফ চৌধুরীর সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অস্বীকার করেছেন জেকেজির গ্রেফতারকৃত চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা। তিনি দাবি করেছেন, আরিফ চৌধুরী এ মুহূর্তে আমার স্বামী না। আমরা আলাদা থাকছি। ডিভোর্স লেটার পাঠিয়েছি। আরো দুই মাস বাকি আছে (ডিভোর্স কার্যকর হতে)।

আরিফ চৌধুরীর সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলে তাহলে তার প্রতিষ্ঠানে কেন গেলেন বা কেন কাজ করছেন- গণমাধ্যমের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জেকেজির স্বাস্থ্যকর্মীদের আমি ট্রেনিং দিতাম। আমি শুধু ট্রেনিং সেন্টার পর্যন্ত যেতাম। তিনি জেকেজির চেয়ারম্যান নন বলেও দাবি করেন।

কর্মীদের খুশি রাখতে ‘আনন্দ ট্রিপ’: কোভিড-১৯ এর এই ভুয়া সনদ দেয়ার বিষয়টি জেকেজির প্রায় সব কর্মীই জানত। তারা যাতে বিষয়টি বাইরে প্রকাশ না করে সেজন্য বাড়তি অর্থ দেয়ার পাশাপাশি কিছু ভিন্ন কৌশল হাতে নেন আরিফ-সাবরিনা দম্পতি। সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করার পর এক দিন ‘আনন্দ ট্রিপ’ হিসেবে ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে একজন নারী ও একজন পুরুষ কর্মীকে থাকতে পাঠানো হতো। কর্মীদের কাছে সেটা ছিল ‘হানিমুন ট্রিপ’। এমনকি মহাখালীতে তিতুমীর কলেজের মাঠে জেকেজি যে বুথ স্থাপন করেছিল সেখানে প্রতি রাতে মদ সেবনের আসর বসত। জেকেজির কর্মীরা রাতভর সেখানে নাচানাচি করত। তারা নারী-পুরুষ জোড়ায় জোড়ায় কলেজের বিভিন্ন কক্ষে অবস্থান করত। তিতুমীর কলেজের নিরাপত্তাকর্মী মো. সানাউল্লাহ ও গাড়িচালক শাহাবুদ্দীন এসব তথ্য জানিয়েছেন।

মাদক না দেয়ায় থানার সিসি ক্যামেরা ভাঙেন আরিফ: তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, করোনা পরীক্ষার মনগড়া রিপোর্ট দেয়া নিয়ে সব মহলে আলোচনায় জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী। অপকর্মের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানের এমডি, তার স্বামী আরিফ চৌধুরীসহ ৬ জন কারাগারে।

তারা জানান, ২৪ জুন গুলশানে জেকেজির কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে ডা. সাবনিার চৌধুরীর স্বামী আরিফুল হক চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়। পরে এ সংক্রান্ত মামলায় আরিফকে তেজগাঁও থানাহাজতে রাখা হয়। তিনি চরম মাদকাসক্ত। গারদে বসেই তিনি পুলিশ সদস্যদের কাছে ইয়াবা চান। না দেয়ার কারণে সিসি ক্যামেরা ভেঙেছে আরিফ। এ ছাড়া তাকে ছাড়িয়ে নিতে জেকেজির কর্মীরা তেজগাঁও থানার গেটে হামলা করে। রিমান্ড শেষে আরিফসহ গ্রেফতারকৃতরা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

যেভাবে কেলেঙ্কারি ফাঁস: ২৩ জুন জেকেজি হেলথ কেয়ারের নার্স তানজিনা পাটোয়ারী ও তার স্বামী হুমায়ূন কবিরকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পুলিশের কাছে তথ্য ছিল, তারা করোনার ভুয়া রিপোর্ট দেয়।

তাদের গ্রেফতারের পর জানা যায়, জেকেজি হেলথ কেয়ারে তানজিনার বেতন ছিল ৩০ হাজার টাকা। ভুয়া করোনা পরীক্ষা করে কোটি কোটি টাকা কামানো দেখে তানজিনা প্রতিষ্ঠানটির কাছে বেশি বেতন দাবি করে। বিষয়টি জেকেজির কর্ণধার আরিফ চৌধুরী জেনে তানজিনা ও তার স্বামীকে চাকরিচ্যুত করে। পরে তারা দুজন বাসায় বসে নিজেরাই করোনার ভুয়া টেস্ট করে মানুষকে রিপোর্ট দেয়া শুরু করেন।

তানজিনা মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করতেন, আর ঘরে বসে তার স্বামী রিপোর্ট তৈরি করতেন। গ্রেফতার হওয়ার পর তানজিনা ও তার স্বামী পুলিশের কাছে আরিফ-সাবরিনা দম্পতির সব অপকর্ম প্রকাশ করে দেন। এরপর ২৪ জুন জেকেজি গুলশান কার্যালয়ে অভিযান করে করোনার ভুয়া সনদ দেয়া, জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগে আরিফুলসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করে তেজগাঁও থানা পুলিশ। এরপরই বেরিয়ে আসে মহা কেলেঙ্কারির ঘটনা।

 





ads






Loading...