আবাসিক হোটেল ব্যবসায় ধস

ব্যবসায়ীদের চোখেমুখে হতাশা, বন্ধ করে দিয়েছেন অনেকে

মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • সেলিম আহমেদ
  • ১০ জুলাই ২০২০, ১০:৩৪,  আপডেট: ১০ জুলাই ২০২০, ১১:০৬

দেশের আবাসিক হোটেল ব্যবসা ভালো নেই। করোনার কারণে ইতোমধ্যে ধস নেমেছে। এই সংকটে অনেক ব্যবসায়ীরা হোটেল বন্ধ করে দিয়েছেন। চাকরি হারিয়ে হোটেলের স্টাফরা চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। তাদের অনেকেই রাজধানী ছেড়ে চলে গেছেন বাড়িতে। কেউ কেউ আবার জীবিকার তাগিদে ঢাকায় থাকলেও পাল্টেছেন পেশা।

রাজধানীর হোটেল ব্যবসায়ী ও হোটেলে চাকরি করছেন এমন অনেক কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

হোটেল ব্যবসায় পরিচিত এমন একজন ব্যবসায়ীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কী বলব ব্যবসার কথা। জুন মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে হোটেল খুলেছি। কিন্তু কোনো বোর্ডার (কাস্টমার) নেই। কোনো দিন একজন, কোনো দিন দুই থেকে তিনজন বোর্ডার আসে। যে টাকা পাই তা দিয়ে স্টাফ খরচ তো দূরের কথা বিদ্যুৎ বিলও দিতে পারি না। আগে আমাদের হোটেলে ২৫ জন স্টাফ ছিল এখন মাত্র ৪ জন স্টাফ দিয়ে কোনোমতে হোটেল চালাচ্ছি। আবার এখন বোর্ডারের কাছ থেকে আগের মতো সাড়া নেই। তারা যা দেন তাই নিতে হয়। এককথায় আগে একজন বোর্ডারের কাছ থেকে যে ভাড়া পেতাম এখন তার অর্ধেকও পাই না। আমাদের চরম দুরবস্থায় দিন যাচ্ছে। কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর ফকিরাপুলের হোটেল মোন স্টারের জেনারেল ম্যানেজার কামরুল ইসলাম।

একই অবস্থা হোটেল ফাইভ স্টারে। হোটেলটির ম্যানেজার মোহাম্মদ সোহাগ বলেন, ৩ মাস পর হোটেল খুলেছি। কিন্তু কোনো বোর্ডার নেই। বিদ্যুৎ বিল বাড়ি ভাড়া দিতে পারছি না। ১৫ জন স্টাফ ছিল এখন তা কমিয়ে ২ জনে এনেছি। তাদের বেতন দিতে পারছি না। যে টাকা আসে তা দিয়ে খাওয়ার টাকাও হয় না। হোটেল ইসলামের ম্যানেজার নাসির বলেন, আমাদের হোটেলে ২১৩টি রুম আছে। প্রতিটি রুমই বুকিং থাকতো। কিন্তু এখন ২-১ জন বোর্ডার আসে। তবে অধিকাংশ দিনই সবগুলো রুম ফাঁকা থাকে। হোটেল সাকিল ইন্টারন্যাশনালের রিসিভসন ম্যানেজার রাজিব দেওয়ান বলেন, আগে আমাদের হোটেলে ৭০-৮০ জন গেস্ট থাকতো এখন থাকে ৩-৪ জন। সব খরচই ভর্তুকি দিয়ে দিতে হয়।

হোটেল মোন স্টার, ফাইভ স্টার, ইসলাম আর সাকিল ইন্টারন্যাশনালের মতো রাজধানীর প্রতিটি হোটেলেরই একই অবস্থা। সবার চোখেমুখে হতাশার ছাপ। করোনাকাল শুরু হওয়ার পর সাধারণ ছুটি চলাকালে বন্ধ ছিল সবগুলো হোটেল। সাধারণ ছুটি তুলে নেয়ার পর হোটেলগুলো খোলা হলেও নেই কোনো বোর্ডার। বিদ্যুৎ বিল, বাসা ভাড়া, স্টাফদের বেতনসহ আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হোটেল মালিকদের। নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে চালাতে হয় এসব খরচ।

রাজধানীর সবচেয়ে বেশি আবাসিক হোটেল ফকিরাপুল এলাকায়। এলাকাটিতে বিভিন্ন মানের ৮৫টি আবাসিক হোটেল রয়েছে। যাতায়াত সুবিধার কারণে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রয়োজনের তাগিদে ঢাকায় আসা লোকজন এ এলাকায় হোটেলগুলোতে অবস্থান করতেন। মৌসুমের সময়ে হোটেলে সিট পাওয়াই যেত না। কিন্তু এখন প্রতিটি হোটেলই ফাঁকা। খরচ বহনে ব্যর্থ হয়ে হোটেল আইডিয়াল, জহুরা, হোটেল ডি ফ্লাসসহ অনেক হোটেলই বন্ধ রয়েছে। কেউ কেউ হোটেল বিক্রির জন্য নোটিশও টাঙিয়েছেন।

এদিকে গতকাল হোটেল আইডিয়ালে গিয়ে দেখা যায় গেটে বড় করে টু-লেট বিজ্ঞাপন লাগানো। বিজ্ঞাপনে দেয়া নাম্বার নিয়ে কল দিলে হোটেলের মালিক লাল মিয়া বলেন, করোনার কারণে আবাসিক হোটেল ব্যবসার খুবই খারাপ অবস্থা। বোর্ডার সংকটের কারণে অনেক হোটেল বন্ধ রয়েছে। আমার হোটেলটিও ছেড়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এখন আবার ভাড়া দেয়ার জন্য বিজ্ঞাপন দিয়েছি। অনেকে এসে দেখে যাচ্ছে কিন্তু কেউই ভাড়া নিচ্ছেন না।

সরেজমিনে ফকিরাপুল, আরামবাগ, ফার্মগেটসহ এলাকাটি ঘুরে দেখা যায়, সাধারণ ছুটি প্রত্যাহারের পর সীমিত পরিসরে সব কিছু খুলে দেয়ার পর খুলতে শুরু করে আবাসিক হোটেলগুলো। কিন্তু বোর্ডার না থাকায় অলস সময় পার করছেন হোটেল কর্তৃপক্ষ। আগের রেট অনুযায়ী ভাড়া দিচ্ছেন না কেউই। বোর্ডার খুশি হয়ে যে ভাড়া দেয় তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়।

ফকিরাপুলের বেশ কয়েকজন হোটেল ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফকিরাপুল, পল্টন, আরামবাগ, এয়ারপোর্ট, ফার্মগেটসহ অন্যান্য হোটেলে আসা বোর্ডারদের অধিকাংশই আসতেন বিদেশে যাওয়া-আসা, ডাক্তার দেখানোসহ চাকরির কাজে। কিন্তু বর্তমান সময়ে বিদেশের সঙ্গে ফ্লাইট বন্ধ, চাকরির নিয়োগ বন্ধ ও অধিকাংশ ডাক্তাররা প্রাইভেট চেম্বারে রোগী না দেখার কারণে এ পরিস্থিতি হয়েছে। তারা বলেন, করোনার ভয়ে এখন অনেকেই হোটেলে থাকতে চায় না। প্রয়োজনের তাগিদে আসলেও অনেকে বাস কাউন্টারে বসে রেস্ট নিয়ে কাজ সেরে আবার চলে যান।

করোনার এই সংকটের কারণে চাকরি হারিয়ে হোটেলের স্টাফরা চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। তাদের অনেকে রাজধানী ছেড়ে চলে গেছেন গ্রামের বাড়িতে। আবার কেউ কেউ জীবিকার তাগিদে ঢাকায় থাকলেও পাল্টেছেন পেশা। তাদের এমন একজন ফারুক মিয়া। রাজধানীর প্রান্থপথ এলাকায় ফুটপাতে এখন ফল বিক্রি করেন তিনি। ফারুক বলেন, আগে ফকিরাপুলের একটি হোটেলে ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করতাম। করোনার কারণে হোটেলটি বন্ধ রয়েছে। এই অবস্থায় কি করব। চলতে কষ্ট হচ্ছে। আমার আয়ে চলে পুরো পরিবার। তাই প্রয়োজনের তাগিদে রাস্তায় ফল নিয়ে বসেছি। এরকম আরো অনেকেই হোটেল ব্যবসা কিংবা হোটেলের চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। তাদের অনেকে জানান, কাস্টমার না থাকায় হোটেল ব্যবসার অবস্থা দিন দিন খুবই খারাপের দিকে যাচ্ছে। মূলত এ ব্যবসায় ধস নেমেছে। এ অবস্থায় তারা ছোটখাটো ব্যবসা কিংবা কাজ-কর্ম করে কোনোরকমে সংসার চালাচ্ছেন বলে জানান।

মানবকণ্ঠ/এইচকে

 





ads






Loading...