ভয়ঙ্কর ধূর্ত রিজেন্টের সাহেদ

রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মোহাম্মদ সাহেদ
রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মোহাম্মদ সাহেদ - সংগৃহীত

poisha bazar

  • শাহীন করিম
  • ০৯ জুলাই ২০২০, ০৮:০৭,  আপডেট: ০৯ জুলাই ২০২০, ০৮:১০

বিলাসবহুল পাজেরো গাড়ি হাঁকিয়ে চলতেন রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মোহাম্মদ সাহেদ। তার গাড়িতে ভিভিআইপি ফ্ল্যাগ স্ট্যান্ড, সাইরেনযুক্ত হর্ন, তার আগে-পিছে আরো দুই গাড়িতে অবৈধ ওয়ারল্যাস সেট আর অস্ত্রসহ প্রহরায় থাকত দেহরক্ষীরা।

চলাফেরা ছিল ভিআইপিদের মতো। প্রভাবশালীদের হাত করেই এ কার্যক্রম চালিয়েছেন সাহেদ। রিজেন্ট হাসপাতাল বন্ধের পর পর্যায়ক্রমে তার উত্থান-পতনের কাহিনী বের হয়ে আসছে।

এদিকে সাহেদের ফেসবুক প্রোফাইলে নিজের পরিচয় দেয়া আছে আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য ও রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান। অতীতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর, লে. কর্নেল, কর্নেল ও এমনকি প্রধানমন্ত্রীর দফতরের কর্মকর্তা হিসেবেও নিজেকে পরিচয় দিতেন তিনি। বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী ও সরকারি বিভিন্ন ঊর্ধ্বতন কর্তা-ব্যক্তিদের কাছের লোক পরিচয় দিয়ে দাপিয়ে বেড়াতেন।

চালাতেন তদবির-বাণিজ্য। যদিও আগে প্রতারণার অভিযোগে দুইবার জেল খেটেছেন। সর্বশেষ করোনা ভাইরাস মহামারীতে তার মালিকানাধীন রিজেন্ট হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার নামে ভয়াবহ ও জঘন্য বাণিজ্যে মেতে ওঠেন ভয়ঙ্কর এই প্রতারক মোহাম্মদ সাহেদ। গুরুত্ব¡পূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তার ছবি পুঁজি করে নিছক প্রতারণা, তদবির ও চাপাবাজির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার মালিক বনে যান বহুল আলোচিত এই ব্যক্তি।

সাতক্ষীরার সিরাজুল করিমের ছেলে মোহাম্মদ সাহেদ নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। মাত্র এসএসসি পাস করেন তিনি। তবু নিজেকে আওয়ামী লীগ নেতা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষক দাবি করতেন সাহেদ। এই পরিচয়ে দেশের প্রতিষ্ঠিত বেশিরভাগ টেলিভিশন চ্যানেলের রাতের টকশোতে অংশ নিয়ে জ্ঞান বিলাতেন। জানা গেছে, তার একাধিক নাম রয়েছে। জাতীয় পরিচয় পত্রে প্রথমে তার নাম ছিল শাহেদ করিম।

পরবর্তীতে তা সংশোধন করে হন মোহাম্মদ শাহেদ। গত বছর তথ্য অধিদফতর থেকে সরবরাহ করা প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডে তার নাম মোহাম্মদ সাহেদ। বহুরূপী সাহেদের সঙ্গে বিগত বিএনপি সরকারের আমলে রাজাকার মীর কাসেম আলী ও গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের সাথে সম্পর্ক গড়ে তাদের মাধ্যমে তারেক জিয়ার হাওয়া ভবনের সখ্যতার তথ্যও পাওয়া গেছে।

বিগত অন্তত ২০ বছর ধরে নানা প্রতারণা, ছলচাতুরি, বাটপারির পর অবশেষে মোহাম্মদ সাহেদের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে। সোমবার ও মঙ্গলবার তার মালিকানাধীন উত্তরা ও মিরপুরে রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযানে ভয়াবহ চিত্র বেরিয়ে আসার পর পলাতক রয়েছেন তিনি। ওই মামলার প্রধান আসামি হিসেবে সাহেদ বর্তমানে নজরদারিতে আছেন ও যে কোনো সময় গ্রেফতার হবেন বলে জানিয়েছেন দায়িত্বশীল র‌্যাব কর্মকর্তারা।

এদিকে ছয় বছর ধরে লাইসেন্স না থাকায় ও করোনা পরীক্ষা এবং চিকিৎসার নামে জালিয়াতির কারণে স্বাস্থ্য অধিদফতরের নির্দেশে গতকাল বুধবার বিকেলে মিরপুরে রিজেন্ট হাসপতালটি বন্ধ করে দিয়েছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এর আগে মঙ্গলবার রাতেই বন্ধ করে দেয়া হয় হাসপাতালের উত্তরা শাখাটি। ওই জালিয়াতি ঘটনায় রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারমান মোহাম্মদ সাহেদকে প্রধান আসামি করে ১৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামে উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা দেয় র‌্যাব। ওই মামলায় গ্রেফতার আটজনকে রিমান্ডে এনেছে পুলিশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রিজেন্ট হাসপাতালে র‌্যাবের অভিযানে ভয়াবহ জালিয়াতির তথ্য পেয়ে প্রতিষ্ঠানটির মালিক মোহাম্মদ সাহেদের ব্যাপারে অনুসন্ধান চালিয়ে জানা গেছে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য। তার বিরুদ্ধে জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে রাজধানীর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন থানায় ৩২টি মামলা হয়েছে। এগুলোর অধিকাংশ ৪২০ ধারায় অর্থাৎ প্রতারণা মামলা।

তার প্রতারণার শিকার অনেকেই এখন মুখ খুলছেন। এ ছাড়া ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে উত্তরা ও মিরপুরে রিজেন্ট হাসপাতাল ভবনের মালিকের ভাড়াও নিয়মিত পরিশোধ করেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। তা ছাড়া উত্তরায় একটি আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা খুলে নিজেই প্রকাশক ও সম্পাদক হয়েছেন সাহেদ। সেখানেও সাংবাদিক এবং রিজেন্ট প্রধান কার্যালয়ে কর্তব্যরত কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন না দিয়ে টালবাহানা করেছেন। অভিযোগ আছে শুধু উত্তরার বিভিন্ন বেরকারি ব্যাংকে রয়েছে তার শত কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানায়, ২০১০ সালের দিকে মো. সাহেদ ধানমন্ডি এলাকায় বিডিএস কিক ওয়ান এবং কর্মমুখী কর্মসংস্থান সোসাইটি (কেকেএস) নামে দুটি এমএলএম কোম্পানি খুলে গ্রাহকদের কাছ থেকে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। ওই সময় তার নাম ছিল মেজর ইফতেখার করিম চৌধুরী। প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে গা-ঢাকা দিলে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকরা তার বিরুদ্ধে মামলা করেন।

২০১১ সালে তাকে প্রতারণা মামলায় একবার গ্রেফতারও করা হয়েছিল। কিন্তু অর্থের বিনিময়ে দ্রুতই তিনি জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বের হয়ে আসেন। এরপর প্রতারণার অর্থ দিয়ে তিনি রিজেন্ট গ্রুপ নামে ব্যবসা শুরু করেন। চালু করেন রিজেন্ট হাসপাতাল। মামলার তদন্তকারীরা বলছেন, ২০১৬ সালের ২৫ জানুয়ারি তার রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে মেয়াদ উত্তীর্ণ রি-এজেন্ট ব্যবহারসহ বিভিন্ন অনিয়মের কারণে ছয় লাখ টাকা জরিমানা করেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, বিএনপির আমলে হাওয়া ভবনের ঘনিষ্ঠ সাহেদ ভোল পাল্টে ক্ষমতাসীন প্রভাবশালীদের কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন। অনেক অভিযোগ ধামাচাপা দিয়েছেন। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ অনেক অনুষ্ঠানেও তাকে দেখা গেছে। ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখার উপসচিব নায়েব আলী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ভুয়া সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা পরিচয়ে অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। এতে মোহাম্মদ শাহেদ নামে ব্যক্তিকে ‘ভয়ংকর প্রতারক’ বলে উল্লেখ করা হয়।

প্রায় দুই কোটি টাকার বিল দিয়েছে রিজেন্ট: স্বাস্থ্য অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, করোনা সংকটের শুরুতে ২১ মার্চ সরকারের সঙ্গে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক (এমইউ) সই হয়। ওই চুক্তি অনুযায়ী হাসপাতালটি শুধু চিকিৎসা করবে কিন্তু সমস্ত খরচ জোগাবে সরকার। কিন্তু সেই শর্ত ভঙ্গ গত প্রায়ে সাড়ে তিনমাসে প্রায় সাড়ে চার হাজার রোগীর করোনা টেস্ট করে প্রত্যেকের কাছ থেকে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা নিয়েছেন।

সরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে নামে ভুয়া সনদ দিতেন। এতে শুধু পরীক্ষায় অন্তত তিন কোটি টাকা অন্যায়ভাবে হাতিয়ে নিয়েছেন রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো. সাহেদ। অথচ করোনা রোগীদের চিকিৎসা বাবদ এক কোটি ৯৬ লাখ টাকার বিল অধিদফতরে জমা দিয়েছে রিজেন্ট হাসপাতাল। অধিদফতর হয়ে সেই বিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে গিয়ে প্রায় অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় ছিল। এখনো কোনো অর্থ ছাড় হয়নি।

নমুনা সংগ্রহের অনুমোদন ছিল না: সারা দেশে করোনা আক্রান্তদের নমুনা সংগ্রহের জন্য ২৫টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। সেই তালিকায় রিজেন্ট হাসপাতালের নাম নেই। তারপরও তারা মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করেছে, নগদ টাকা নিয়েছে। র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, আমাদের কাছে যে তালিকা আছে, সেটি স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে পাওয়া। সেখানে সারা দেশে ২৫টি প্রতিষ্ঠান নমুনা সংগ্রহের জন্য অনুমোদন পেয়েছে। সেই তালিকায় রিজেন্টের নাম নেই।

সরকারি চিকিৎসককে বিদায়: র‌্যাব জানায়, সরকারের সঙ্গে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক (এমইউ) সই হওয়ার পর কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোতে একজন করে সরকারি চিকিৎসক দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে রিজেন্ট হাসপাতালেও একজন সরকারি চিকিৎসককে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। ওই চিকিৎসকের নাম ডা. মো. আশরাফ। কিন্তু রিজেন্ট কর্তৃপক্ষ ডা. আশরাফকে সেখানে কাজ করতে দেয়নি।

রিজেন্ট হাসপাতাল কোভিড ডেডিকেটেড: করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতাল স্বাস্থ্য অধিদফতরের সঙ্গে যুক্ত হয় গত ২১ মার্চ। অথচ হাসপাতালটির অনুমোদনের মেয়াদ ২০১৪ সালেই শেষ হয় এবং পরে আর সেটা নবায়ন করা হয়নি। অনুমোদনহীন একটা হাসপাতাল মহামারীর মতো সময়ে কী করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেয়ার তালিকাতে যুক্ত হলো তা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, ‘ওপরের কেউ’ বলার কারণে রিজেন্টকে কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যানসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা: মঙ্গলবার রাতে রিজেন্ট গ্রæপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদসহ ১৭ জনকে আসামি করে উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা দায়ের করে র‌্যাব। ও মামলার আসামিরা হলেন- প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. সাহেদ (৪৩), হাসপাতালের অ্যাডমিন অফিসার আহসান হাবীব (৪৫), এক্সরে টেকনিশিয়ান হাসান (৪৯), মেডিকেল টেকনোলজিস্ট হাকিম আলী (২৫), রিসিপশনিস্ট কামরুল ইসলাম (৩৫), রিজেন্ট গ্রুপের প্রজেক্ট অ্যাডমিন রাকিবুল ইসলাম (৩৯), রিজেন্ট গ্রুপের এইচআর অ্যাডমিন অমিত অনিক (৩৩), গাড়িচালক আব্দুস সালাম (২৫), এক্সিকিউটিভ অফিসার আব্দুর রশীদ খান জুয়েল (২৮), ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসুদ পারভেজ (৪০), হাসপাতাল কর্মচারী তরিকুল ইসলাম (৩৩), স্টাফ আব্দুর রশিদ খান (২৯), স্টাফ শিমুল পারভেজ (২৫), কর্মচারী দীপায়ন বসু (৩২) এবং মাহবুব (৩৮)।

অপর দুজনের নাম জানা যায়নি। প্রভাবশালীদের সঙ্গে সাহেদের ছবি নিয়ে যা বলল র‌্যাব: করোনা ভাইরাস পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দেয়াসহ নানা অভিযোগে সিলগালা করে দেয়া রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো. শাহেদ সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে র‌্যাব। মঙ্গলবার থেকেই ফেসবুকে অনেকে মো. শাহেদের বহু ছবি শেয়ার করেছে যেখানে তাকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে দেখা গেছে।

এমনকি বিএনপির কিছু সিনিযয়র নেতার সাথে তার ছবি ভাইরাল হয়েছে ফেসবুকে। গতকাল বুধবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক ও মুখপাত্র লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, দেশের হর্তা-কর্তা ব্যক্তিদের সাথে সে ছবি তুলেছে। এটা আসলে তার একটা মানসিক অসুস্থতা। এই ছবি তোলাকে কেন্দ্র করেই সে প্রতারণা করত।

সাদেহের/শাহেদের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে এই র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, প্রতারকদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। তারা যখন যার নাম পারে তখন সেটা বেচে নিজের জীবনকে অগ্রগামী করার চেষ্টা করে। লে. কর্নেল সারোয়ার বলেন, প্রতারণার মাধ্যমে রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো. সাহেদ বহু মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। প্রতারণাই ছিল তার প্রধান ব্যবসা।

 





ads






Loading...