ঝুঁকিপূর্ণ ‘ব্যাগারে’ দুর্ঘটনা ঘটছেই, বাড়ছে প্রাণহানি

মানবকণ্ঠ
লঞ্চডুবি - প্রতীকী ছবি

poisha bazar

  • শাহীন করিম
  • ০৬ জুলাই ২০২০, ১৩:১৬,  আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২০, ১৩:২০

বরিশাল ও চাঁদপুরসহ বিভিন্ন রুট থেকে আসা বিশাল লঞ্চগুলো প্রথমে সদরঘাটে ভিড়ানো হয়। পরে বুড়িগঙ্গা নদীতে ঘাট পরিবর্তন করে কেরানীগঞ্জ ডকে কিংবা আশপাশে রাখা হয়। অন্য ঘাটে নোঙর করতে ‘ব্যাগার’ (পেছনে নেয়া) দেয়ার কাজটি সাধারণত মূল মাস্টারের পরিবর্তে সহকারীরা করে থাকেন। পেছনে, ডানে-বামে ছোট যান কিংবা নৌকা না দেখে তারা বিপজ্জনকভাবে বৃহদাকার লঞ্চগুলোকে ঘোরান। এমন ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাগারেই বুড়িগঙ্গায় একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছেন যাত্রী ও নৌকার মাঝিরা।

গত ২৯ জুন বুড়িগঙ্গায় চাঁদপুর রুটের ময়ূর-২ লঞ্চের বিপজ্জনক ব্যাগারে (হঠাৎ পেছনে যাওয়া) মর্নিং বার্ড নামক যাত্রীবাহী একটি ছোট লঞ্চ ডুবে ৩৪ যাত্রীর সলিল সমাধি ঘটে। এর ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় গতকাল রবিবার দুপুরে একইভাবে সদরঘাটে বুড়িগঙ্গা নদীতে মিরাজ-৬ নামক লঞ্চের ধাক্কায় একটি নৌকা ডুবে ইসরাফিল (২৫) নামে এক যাত্রী নিখোঁজ হয়েছে। সাঁতরে উঠেছেন বাকি ছয় যাত্রী। এর আগে ২০১৯ সালে এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাগারে বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সদর ঘাটের অব্যবস্থাপনা ও নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় এসব ঘটনার বারংবার পুনরাবৃত্তি ঘটছে বলে লঞ্চঘাটের যাত্রী, নৌকার মাঝি, লঞ্চের স্টাফসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।
বুড়িগঙ্গায় ভয়াবহ লঞ্চডুবির এক সপ্তাহের ব্যবধানে এবার পারাপারের একটি ছোট্ট নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের ডুবুরিরা নদীতে উদ্ধার অভিযান চালায়।

প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গতকাল দুপুর ১২টার দিকে সদরঘাটের বাদামতলী ঘাট এলাকার মসজিদের পশ্চিম দিক দিয়ে কেরানীগঞ্জ থেকে পারাপারের একটি নৌকা আসছিল। এই সময় ঘাটে মিরাজ-৬ নামে একটি বড় লঞ্চ পেছনের দিকে এলে ধাক্কা ও স্রোতের টানে ছোট্ট নৌকাটি ডুবে যায়। খোঁজ করে দেখা যায় ইসরাফিল নামে এক তরুণ তীরে উঠতে পারেনি। পরে স্থানীয়রা ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিদের খবর দেয়।

নিখোঁজ ইসরাফিলের মামা মুন্না জানান, ইসরাফিল হাজী সেলিমের মদিনা মার্কেট এলাকায় একটি জেনারেটরের দোকানে চাকরি করে। লঞ্চের পেছন দিকের ধাক্কায় অন্যরা যাত্রীর উঠে এলেও ইসরাফিল তীরে উঠতে পারেনি। ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা মালেক মোল্লা জানান, ডুবুরি দিয়ে উদ্ধার কাজ চালছে। সন্ধ্যা পর্যন্ত এই অভিযান চালানো হয়।
সদরঘাটের একাধিক সূত্র জানায়, সাধারণত লঞ্চ চালান সারেং। আর নির্দেশনা দিয়ে মাঝেমধ্যে চালিয়ে লঞ্চটিকে পরিচালনা করেন মাস্টার। লঞ্চের দুর্ঘটনা ঘটলে পুরো দায়িত্ব মাস্টারের। তবে সরদরঘাটে ৪৫টি রুটের লঞ্চ রাখার পর মূল মাস্টার আর সেগুলো পরিচালনা করেন না। তখন সহকারী বা শিক্ষানবিস চালকরা বেপরোয়াভাবে ব্যাগার দিয়ে লঞ্চ সরান। এ কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। গত বছরের ৬ অক্টোবর সুন্দরবন-৯ ও রাজহংস লঞ্চের নিচে পড়ে নৌকার তিন যাত্রী প্রাণ হারান। গত ৬ মার্চ এমভি সুরভী-৭-এর ধাক্কায় নৌকা ডুবে একই পরিবারের ছয়জনের মৃত্যু হয়। এর আগে ২৫ জানুয়ারি মা ও দুই মেয়ে এমভি পারাবাত লঞ্চের ধাক্কায় বুড়িগঙ্গায় ডুবে যান। ১৩টি অবৈধ খেয়াঘাট থেকে ডিঙি নৌকা চলার কারণে কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনাগুলোকে গুরুত্ব দেয় বলে একটি সূত্র দাবি করেছে।

বিআইডব্লিউটিএর ঢাকা নদী বন্দরের যুগ্ম পরিচালক একেএম আরিফ উদ্দিন জানান, সদরঘাটে যথাযথ ব্যবস্থাপনার জন্য প্রত্যেকটি ঘাটে তাদের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করেন। এর ছাড়া নৌপুলিশসহ আরো অনেক সংস্থার সদস্যরা টার্মিনালে দায়িত্ব পালন করেন। তার পরও মাঝেমধ্যে কিছু দুর্ঘটনা ঘটে যায়। তবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়।

প্রসঙ্গত, গত ২৯ জুন সকালে বুড়িগঙ্গা নদীতে মর্নিং বার্ড নামে একটি ছোট লঞ্চ ডুবে ৩৪ জন নিহত হন। মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে লঞ্চটি সদরঘাটে আসার সময় ময়ূর-২ নামে আরেকটি বড় লঞ্চ পেছন থেকে ধাক্কা দিলে সেখানেই মর্নিং বার্ড লঞ্চটি ডুবে যায়।

গ্রেফতার হয়নি কোনো আসামি: ময়ূর-২ লঞ্চের চরম গাফিলতি আর অবহেলার কারণে এত প্রাণহানির ঘটনায় নৌপুলিশ সদরঘাট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ শামসুল বাদী হয়ে সাতজনের বিরুদ্ধে সোমবার রাতে একটি মামলা করেন। মামলায় ময়ূর লঞ্চের মালিক মোফাজ্জল হামিদ ছোয়াদ, মাস্টার আবুল বাশার, জাকির হোসেন, ড্রাইভার শিপন হাওলাদার, মাস্টার শাকিল ও সুকানি নাসিরের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাত আরো কয়েকজনকে আসামি করা হয়। কিন্তু গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। জানতে চাইলে সদরঘাট নৌপুলিশ থানার ওসি রেজাউল করিম বলেন, আসামিদের গ্রেফতারে নৌপুলিশের পক্ষ থেকে অভিযান চলছে। অন্যান্য সংস্থাও আসামি ধরার চেষ্টা করছে।

মানবকণ্ঠ/এইচকে






ads