দুই লঞ্চের মালিক পলাতক

মানবকণ্ঠ
লাশ উদ্ধার - ফাইল ছবি

poisha bazar

  • শাহীন করিম
  • ০১ জুলাই ২০২০, ১০:৫১

রাজধানীর পুরান ঢাকার শ্যামবাজারের লালকুঠি ঘাট-সংলগ্ন বুড়িগঙ্গা নদীতে যাত্রীবাহী মর্নিং বার্ড লঞ্চটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়া ময়ূর-২ লঞ্চটির মালিক, মাস্টার ও চালকসহ অধিকাংশ কর্মচারীর হদিস নেই। তাদের দায়িত্বহীনতা, অসতর্কতা ও উদাসীনতার কারণেই ওই ভয়াবহ দুঘর্টনায় এত মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। গত সোমবার রাতে মামলা হওয়ার পরও তাদের গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। লঞ্চটিকে পেছনের দিকে নেয়ার জন্য চালক তার সহকারীকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন বলে একটি সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে দুর্ঘটনা কবলিত মর্নিং বার্ড নামক ছোট লক্কড়-ঝক্কড় লঞ্চটিও চালাচ্ছিলেন একজন সহকারী। এর ফিটনেস নিয়েও সমস্যা রয়েছে। ঘটনার পর থেকে গা-ঢাকা দিয়েছেন দুর্ঘটনা-কবলিত লঞ্চটির মালিকও। সার্ভে সনদ ও ফিটনেস নেয়ার সময় নৌ অধিদফতরে জমা দেয়া কাগজে একজন দ্বিতীয় শ্রেণির মাস্টার ও চালক দেখানো হলেও বাস্তবে মর্নিং বার্ড লঞ্চটি দীর্ঘদিন ধরে অভিজ্ঞ মাস্টার বা চালক ছাড়াই চলছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে অভিযোগ মিলেছে।


এদিকে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে ঢাকা-চাঁদপুর রুটের ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ রুটের মর্নিং বার্ড লঞ্চডুবির মর্মান্তিক ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৪ জনে দাঁড়িয়েছে। উদ্ধার করা ৩৪ মরদেহের মধ্যে পুরুষ ২১ জন, নারী ৯ জন ও তিনটি শিশু রয়েছে। সবশেষ গতকাল সকালে ও বিকেলে আরো দুজনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল বিকেলে উদ্ধার মৃত ব্যক্তি নাম আবদুর রহমান বেপারি (৪৫)। এর আগে সোমবার রাত পর্যন্ত ৩২ জন যাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিস, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, নৌপুলিশ ও বিআইডবিøউটিএর সদস্যরা। পরে মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়।

এদিকে বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চডুবির ঘটনায় দ্বিতীয় দিনের উদ্ধার অভিযান শেষে গতকাল দুপুরের পর তল্লাশি অভিযানের সমাপ্তি টেনেছে বিআইডব্লিউটিএ। এর আগে দুর্ঘটনা-কবলিত দেড়তলা মর্নিং বার্ড লঞ্চটিকে গতকাল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তুলে তীরে টেনে আনা হয়। অভিযান শেষে নৌ পরিবহন সংস্থার যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন জানান, ডুবে যাওয়া লঞ্চ এমএল মর্নিং বার্ডকে টেনে সদরঘাটের কুমিল্লা ডকইয়ার্ডের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ভেতরে আর কোনো মৃতদেহ পাওয়া যায়নি। বেলা আড়াইটায় উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

সোমবার রাতভর মৃতদেহের সন্ধানে বুড়িগঙ্গায় তল্লাশির পর এক ঘণ্টা বিরতি দিয়ে গতকাল সকাল সাড়ে ৯টায় আবার তল্লাশি শুরু হয়। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিতের পাশাপাশি নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশ এবং বিআইডব্লিউটিএর কর্মীরাও এ অভিযানে অংশ নেন। নদীর ৬০-৭০ ফুট গভীরে উল্টে থাকা লঞ্চটিকে টেনে তুলতে ১১টি এয়ার লিফটিং ব্যাগ ব্যবহার করা হয়। এর একেকটি ব্যাগ ৮ টন ওজন তুলতে পারে। বিআইডব্লিউটিএর ছোট উদ্ধারকারী জাহাজ দুরন্তও এ কাজে যুক্ত ছিল।

সোমবার সকালে দুর্ঘটনার পর সদরঘাটের একটি সিসি ক্যামেরার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে পেছন দিকে চলতে থাকা ময়ূর-২-এর ধাক্কায় তুলনামূলক আকারে অনেক ছোট মর্নিং বার্ডকে মুহূর্তের মধ্যে বুড়িগঙ্গায় ডুবে যেতে দেখা যায়। পরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার পর ওই ভিডিও দেখার কথা জানিয়ে নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনার যে ধরন, তাতে তার মনে হয়েছে ধাক্কা দেয়ার বিষয়টি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। পরে এ ঘটনায় নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএর পক্ষ থেকে আলাদা দুটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়।

অন্যদিকে দুর্ঘটনা-কবিলত লঞ্চটিকে উদ্ধার করতে নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা উদ্ধারকারী জাহাজ ‘প্রত্যয়ের’ ধাক্কায় পোস্তগোলা ব্রিজ গতিগ্রস্ত হয়। ফলে সেখানে যানচলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। গতকাল সকালে ব্রিজটি পরিদর্শন করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পরে বিকেলে থেকে সীমিত আকারে হালকা যান চলাচল করতে দেয়া হচ্ছে। এদিকে ঘটনার ১৩ ঘণ্টা পর সোমবার রাত ১০টার দিকে বুড়িগঙ্গা থেকে সুমন ব্যাপারী নামে এক যাত্রীকে জীবিত উদ্ধারের দাবি করেছে কোস্টগার্ডসহ সংশ্লিষ্টরা। তারা দাবি করেছেন, লঞ্চটি দ্রুত ডুবে যাওয়ার কারণে এয়ার পকেট (বাতাস) সৃষ্টি হওয়ায় সম্ভবত ওই ব্যক্তি অক্সিজেন পেয়ে বেঁচে ছিলেন। ওই ব্যক্তি বর্তমানে মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। পানির নিচে ১৩ ঘণ্টা থাকার পর কিভাবে কোনো মানুষ বেঁচে থাকতে পারে এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে।


মালিক-চালকসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা: বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবির ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার ভোরে নৌপুলিশ সদরঘাট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ শামসুল বাদী হয়ে সাতজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিরা হলেন- ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক মোফাজ্জল হামিদ ছোয়াদ, মাস্টার আবুল বাশার, জাকির হোসেন, ড্রাইভার শিপন হাওলাদার, মাস্টার শাকিল ও সুকানি নাসির। মামলায় বেপরোয়া লঞ্চ চালিয়ে মানুষ হত্যা ও ধাক্কা দিয়ে লঞ্চ দুর্ঘটনার জন্য দণ্ডবিধির ২৮০, ৩০৪ (ক), ৪৩৭ ও ৩৪ ধারার অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে দায়িত্বে চরম অবহেলার অভিযোগ আনা হয়েছে।

নৌপরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালক কমোডর আরিফুর রহমান বলেন, মর্মান্তিক ওই ঘটনার জন্য মামলা হয়েছে। দায়ীদের গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করবে পুলিশ। এ ছাড়া দুটি লঞ্চের সকল কাগজপত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সদরঘাটে দায়িত্বরত নৌ-পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ঘটনার পর থেকেই ময়ুর লঞ্চের মালিক, মাস্টার ও চালকসহ সবাই গা ঢাকা দিয়েছেন। তবে তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

প্রসঙ্গত, সোমবার সকাল সোয়া নয়টার দিকে ঢাকার শ্যামবাজার এলাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ রুটের এমএল মর্নিং বার্ড নামের একটি অর্ধশত যাত্রী নিয়ে ডুবে যায়। এদিন রাত পর্যন্ত তিন শিশুসহ ৩২ জনের মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স। এ ছাড়া ১৩ ঘণ্টা পরে একজনকে জীবিত উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া নদীর পাশের একটি সিসি ক্যামেরার ভিডিওতে দেখা গেছে, বিশাল আকৃতির ময়ূর-২ ও অপেক্ষাকৃত অনেক ছোট মর্নিং বার্ড দিকে পেছনে দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। পরক্ষনেই ময়ূর-২ যাত্রীবোঝাই মর্নিং বার্ডের ওপর উঠে যায় এবং মুহর্তেই উল্টে গিয়ে তলিয়ে যায় ক্ষুদ্র লঞ্চটি।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads






Loading...