৩০ সেকেন্ডেই শেষ ৩২ প্রাণ

লঞ্চডুবিতে বুড়িগঙ্গার তীরে লাশের সারি

মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • শাহীন করিম
  • ৩০ জুন ২০২০, ১১:০৯

প্রতিদিনের মতো গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে সাতটায় মুন্সিগঞ্জের কাঠপট্টি ঘাট থেকে ঢাকার সদরঘাটের উদ্দেশে রওনা হয় ‘মর্নিং বার্ড’ নামের ছোট লঞ্চটি। প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা চালিয়ে সকাল সোয়া ৯টার দিকে লঞ্চটি ঢাকার শ্যামবাজারের লালকুঠি ঘাট বরাবর বুড়িগঙ্গা নদীতে চলে আসে। লঞ্চটি তখন সদরঘাট টার্মিনাল থেকে আর মাত্র কিছু দূরে। ঢাকায় নামার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন যাত্রীরা। ঠিক তখন লালকুঠির ঘাটে থাকা ঢাকা-চাঁদপুর রুটের ময়ুর-২ নামক লঞ্চটি হঠাৎ পেছন (ব্যাকে) দিকে যায়। আচমকা এই যাত্রীশূন্য বিশাল লঞ্চটির পেছন দিকের ধাক্কায় মুহূর্তেই মর্নিং বার্ড নামক ছোট যাত্রীবোঝাই লঞ্চটি দুমুড়ে-মুচড়ে বুড়িগঙ্গায় তলিয়ে যায়। মাত্র ৩০ সেকেন্ডে লঞ্চটি উল্টে ডুবে যায়। অধিকাংশ যাত্রী কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘটে যায় সাম্প্রতিক সময়ে দেশের নৌপথের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা। দিনে-দুপুরে বিভীষিকাময় এ ঘটনায় সলিল সমাধি হয় অন্তত ৩২ জন অভাগা যাত্রীর।

ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরী দল, নৌপুলিশ ও বিআইডব্লিউটিএর সদস্যরা শুরু করেন উদ্ধার অভিযান। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত উদ্ধার করা হয় অন্তত ৩৫ যাত্রীর মরদেহ। তবে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সরকারিভাবে ৩০ জনের প্রাণহানির কথা ঘোষণা করা হয়। তাদের মধ্যে ১৯ জন পুরুষ, ৮ নারী এবং তিনজন শিশু বলে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। আরো কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন।

বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা জানান, মর্নিং বার্ড নামক দোতলা ছোট লঞ্চটিতে ৫০-৫৫ জন যাত্রী ছিল। তবে স্থানীয়দের দাবি, লঞ্চে যাত্রীর সংখ্যা শতাধিক। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, লঞ্চটি ডুবে যাওয়ার সময় সাঁতরে কয়েকজন তীরে এসে পৌঁছান। কিন্তু অধিকাংশ যাত্রী লঞ্চের নিচতলায় আটকা পড়ার কারণে আর বের হতে পারেননি। উদ্ধার করা মরদেহ ছাড়াও আরো অনেক যাত্রী এখনো নিখোঁজ আছেন। মূলত ঢাকা-চাঁদপুর রুটের ময়ুর-২ লঞ্চের মাস্টারের (চালক) চরম অসর্তকতা, দায়িত্বহীনতা ও উদাসীনতার কারণে ভয়াবহ এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে মন্তব্য করেছেন উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়া বিভিন্ন বাহিনীর কর্মকর্তারা। তারা জানান, ২০১৪ সালে মাওয়ায় পিনাক লঞ্চের অর্ধশতাধিক যাত্রীর প্রাণহানির পর গত ছয় বছরে এটিই সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা।

গতকাল দুপুরের পর ঢাকার শ্যামবাজারের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। এ সময় তিনি গণমাধ্যমকে জানান, সিটিভি ফুটেজ দেখে বোঝা গেছে, এটি দুর্ঘটনা নয় হত্যাকাণ্ড। লঞ্চডুবির ঘটনায় মৃত প্রত্যেকের পরিবারকে দেড় লাখ টাকা ও প্রতিটি লাশ দাফনের জন্য ১০ হাজার টাকা করে দেয়ার ঘোষণা দেন তিনি। দিনেদুপুরে এই লঞ্চডুবির ঘটনায় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী সাত দিনের মধ্যে এই কমিটি মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করবে।

এদিকে বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চডুবির মর্মান্তিক ঘটনায় প্রাণ হারানো যাত্রীদের মরদেহগুলো উদ্ধার করার পর বিকেলে সাড়ে ৩টার দিকে সেগুলো নেয়া হয় মিটফোর্ড হাসপাতাল মর্গে। পরে শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া ও যাচাই-বাছাই শেষে অনেক মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর আগে প্রিয়জনদের হারানোর খবর পেয়ে শ্যামবাজারের লালকুটি ঘাট, নদীর পাড় ও বাবুবাজার সংলগ্ন মিটফোর্ড হাসপতালে ঝড়ো হন শত শত স্বজন। এ সময় তাদের আহাজারিতে পুরো এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। সৃষ্টি হয় বেদনাবিধুর পরিবেশের।

গতকাল সকাল সোয়া নয়টার দিকে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরী দল, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, নৌপুলিশ ও বিআইডব্লিউটিএর সদস্যরা। তারা
সম্মিলিতভাবে সন্ধ্যা পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান চালায়। দুপুর সাড়ে ৩টা পর্যন্ত উদ্ধার করা হয় ৩২টি মরদেহ। বুড়িগঙ্গায় ডুবে যাওয়া যাত্রীবাহী লঞ্চটি উদ্ধারের জন্য নারায়ণগঞ্জ থেকে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে আসে উদ্ধারকারী জাহাজ ‘প্রত্যয়’। কিন্তু উচ্চতার কারণে বিশাল এ জাহাজটি পোস্তগোলা ব্রিজে আটকে যায়।
পরে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চটি উদ্ধারের কাজ শুরু করে সংশ্লিষ্টরা। উদ্ধারকাজে অংশ নেয়া ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা জানান, যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে, তার কাছাকাছি এলাকায় নদীর মাঝখানে ডুবে যাওয়া লঞ্চটি শনাক্ত করা হয়েছে। ভেতরে আরো লাশ আছে কি না, তা তল্লাশি করে দেখা হচ্ছে। কোস্টগার্ড কর্মকর্তা লে. কমান্ডার হায়াৎ ইবনে সিদ্দিক জানান, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও নৌপুলিশের সদস্যরা মিলে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছেন। সন্তোষজনক পর্যায় না আসা পর্যন্ত অভিযান চলবে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান গোলাম সাদেক দুপুরের দিকে জানান, ময়ুর-২ নামের একটি লঞ্চ সদরঘাট লালকুঠির চাঁদপুর ঘাটে ছিল। হঠাৎ ওই লঞ্চটি মর্নিং বার্ডকে ধাক্কা দেয়। এতে মর্নিং বার্ড নামের লঞ্চটি ডুবে যায়। বিআইডব্লিউটিএর ঢাকা নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফউদ্দিন বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে জানান, ধাক্কা দেওয়া লঞ্চ ময়ূর-২ জব্দ করা হয়েছে। তবে লঞ্চের চালক পালিয়ে গেছেন। উদ্ধার করা ৩০ মরদেহের মধ্যে পুরুষ ১৯ জন, নারী আটজন এবং শিশু তিনটি। ফায়ার সার্ভিসের অন্তত ১২ জন ডুবুরি সেখানে উদ্ধার কার্যক্রম চালাচ্ছে। ডুবে যাওয়া লঞ্চটি উদ্ধার করার আগ পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান চলমান থাকবে।

বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবির মর্মান্তিক ঘটনার একটি সিসিটিভি ফুটেজে মিলেছে। এতে দেখা যায়, ময়ূর লঞ্চের এক ধাক্কায় ডুবে যায় ‘মর্নিং বার্ড’ নামের ছোট লঞ্চটি। ৩৭ সেকেন্ডের ভিডিওটি অনুযায়ী গতকাল সকাল ৯টা ১২ মিনিটে ঘটনাটি ঘটে। ঘাট থেকে পেছন দিকে (ব্যাকে) যেতে গিয়েই ময়ূর এই দুর্ঘটনা ঘটায়। এবং মুহূর্তে ডুবন্ত ছোট লঞ্চটির ওপর পুরো শরীর উঠিয়ে দেয়। ঘটনার পরই সিসিটিভি ফুটেজটি পাওয়া যায়। কর্তৃপক্ষ জানায়, পন্টুনগুলোতে বিআইডবিøটিউএ ও নৌপুলিশের সিসি ক্যামেরা আছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) যুগ্মপরিচালক (বন্দর ও পরিবহন বিভাগ) একেএম আরিফ উদ্দিন বলেন, সিসি ক্যামেরার দুর্ঘটনার বিষয়টি ধরা পড়েছে। সেটাতে দেখা যাচ্ছে কিভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। তদন্ত টিম অবশ্যই তদন্তে এই বিষয়টি কাজে লাগাতে পারবে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি: বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চডুবির ঘটনায় সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। আগামী সাত দিনের মধ্যে এই কমিটিকে মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। গতকাল বিকেলে এ-সংক্রান্ত এক অফিস আদেশ জারি করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। এ দুর্ঘটনার তদন্তে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন) মো. রফিকুল ইসলাম খানকে। কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছে বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক (নৌনিরাপত্তা) মো. রফিকুল ইসলামকে। কমিটির বাকি সদস্যরা হলেন- নৌপরিবহন অধিদফতরের চিফ নটিক্যাল সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন জসিম উদ্দিন সরকার, বিআইডব্লিউটিসির প্রধান প্রকৌশলী, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পর্যায়ের একজন প্রতিনিধি, ফায়ার সার্ভিস অধিদফতরের একজন উপযুক্ত প্রতিনিধি এবং নৌপুলিশের একজন উপযুক্ত প্রতিনিধি।

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads







Loading...