আরামপ্রিয়দের করোনাভীতি


poisha bazar

  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ২৮ জুন ২০২০, ০০:৪০,  আপডেট: ২৮ জুন ২০২০, ১১:২৬

করোনা-ভীতিতে থমকে আছে পুরো পৃথিবী। মৃত্যুভয়ে জড়োসড়ো মানুষগুলো ঘর থেকে বাইরে পা ফেলতেও সন্দেহ উঁকি দেয়-এই বুঝি মরণকামড় দেয় ঘাপটি মেরে থাকা করোনা। তবে এখন পর্যন্ত দেশে মৃত্যুর যে হার তাতে এগিয়ে আছে বিলাসী জীবনযাপনের পাশাপাশি আরামপ্রিয় মানুষগুলো।

কায়িক পরিশ্রমের কাজ না করা ব্যক্তিরাই এগিয়ে আছেন মৃত্যু ও সংক্রমণে। পক্ষান্তরে অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের লোকজনের মধ্যে করোনার প্রাদুর্ভাব তুলনামূলক অনেক কম। বেঁচে থাকার লড়াইয়ে এদের পরিশ্রমের ঘামে ভেজা শরীরকে দুর্বল করতে পারছে না প্রাণঘাতী এই ভাইরাস। কেন এমনটি হচ্ছে? সংক্রমণ ও মৃত্যুর ক্ষেত্রে ধনী-গরিবের মাঝে করোনার কেন এই ‘উল্টো শ্রেণীবৈষম্য’? এমন প্রশ্নই প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খাচ্ছে মানুষের মনে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দিনরাতের অধিকাংশ সময় যারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ ও কৃত্রিম আলোর নিচে বাস করেন তাদের কোভিড-১৯ ঘায়েল করে ফেলতে পারে খুব দ্রুতই। এই শ্রেণির মানুষ শারীরিক শ্রম কম করেন। মুক্ত বাতাসে, প্রখর রোদে, ভেজা মাটিতে হাঁটা হয়ে ওঠে না এদের।

ফ্রিজে সংরক্ষিত ফলমূল, শাকসবজি ও খাদ্যগ্রহণের অভ্যাসটিও এই জন্য খানিক দায়ী। বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত লোকদের শরীর এসব অভ্যাসের কারণে নানা রোগে আক্রান্ত থাকে বরাবরই। যে কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও তাদের স্বাভাবিকভাবেই কম। ফলে শরীরে করোনা উপসর্গ দেখা দিলেই দুর্বল হয়ে পড়েন তারা।

অপরদিকে কৃষিজীবী, শ্রমজীবী, বস্তিবাসী মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশি থাকার কারণ প্রকৃতির আলো-বাতাস আর কঠোর শ্রম। সেই সঙ্গে সংক্রমিত হলেও দৃঢ় মনোবলের কারণে খুব সহজে ঘায়েল হন না তারা।

গত মার্চ মাসের শুরু থেকে বাংলাদেশে দেখা দেয়া করোনা ভাইরাসের বিষয়ে নানাজনের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন রকম উপলব্ধি হয়েছে। এই কয় মাসের পর্যবেক্ষণে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, যারা ঘরে-বাইরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রক (এসি) ছাড়া চলতে পারেন না, তাদের জন্য করোনা বেশি অশুভ বার্তা হয়ে এসেছে। ধনীদের টাকা থাকলেও দুর্বল শারীরিক ও মানসিক কাঠামোর কারণে তাদের মনোবল কম। হাজার কোটি টাকা থাকতেও, দেশের নামকরা হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েও বাঁচানো যাচ্ছে না তাদের। প্রকৃতির যেন এ এক চরম প্রতিশোধ।

অপরদিকে খরতাপ, ঝড়, বৃষ্টি উপেক্ষা করে যে মানুষগুলো তৃণমূল পর্যায়ে শ্রমিকের কাজ করছেন, তারা করোনাকে এখনো অনেকটা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েই চলছেন। বৈশ্বিক ও সর্বসাধারণের জন্য প্রাণঘাতী হলেও দেশের গরিব শ্রেণির চোখে করোনা ‘বড়লোকের অসুখ’।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী প্রথম শনাক্ত হয়। এর মধ্যে শতাধিক দিন অতিক্রান্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ছয় লাখ লোকের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, যা ১৬ কোটির বেশি জনসংখ্যার দেশ বিবেচনায় খুবই নগণ্য। এরই মধ্যে দেশের হাসপাতালগুলোতেও চিকিৎসাসেবা বেহাল। আইসিইউ তো প্রায় সোনার হরিণ। দেশের শীর্ষস্থানীয় বিত্তবান পরিবারের সদস্যদেরও কেউ কেউ আইসিইউর পূর্ণ সেবা পেতে ব্যর্থ হয়েছেন। শয্যা না পেয়ে রোগী হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে। পথেই মারা গেছে অনেকে।

স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর বরাতে জানা যায়, বাংলাদেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণের একটি উল্লেখযোগ্য জনবৈশিষ্ট্য হলো, চাষাবাদের সঙ্গে যুক্ত মানুষ, রিকশাচালক, খোলা জায়গায় কাজ করা শ্রমিক, বস্তিবাসী- এমন জনগোষ্ঠীতে করোনা আক্রান্তের হার খুবই কম। ঢাকার সীমান্তবর্তী জেলা মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে ২৯ জনের করোনা আক্রান্তের খবর মিলেছে। তবে এদের অধিকাংশই ঢাকা থেকে গ্রামে ফিরেছেন বলে জানা গেছে। এই উপজেলার কোনো কৃষিজীবী মানুষ করোনা আক্রান্ত হননি। এই চিত্রটি কমবেশি সারা দেশের।

গ্রামের মানুষের ভাষায় করোনা হলো শহরের অসুখ। ঢাকার রিকশাচালকদের মধ্যে কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যাও বিরল। তাদের ধারণা, করোনা বড়লোকদের বা টাকাওয়ালাদের অসুখ। ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বস্তিবাসী মানুষের মধ্যেও করোনা সংক্রমণ অত্যন্ত কম। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল করোনা আক্রমণের প্রথম ধাক্কায় এসব সাধারণ মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কারণ তাদের বসবাসের স্থান অস্বাস্থ্যকর। এরা একটি ঘরে গাদাগাদি করে অনেকে বাস করে। কিন্তু সেটি ঘটেনি।

ঢাকার কড়াইল বস্তি, কল্যাণপুরের পোড়াবস্তি অথবা মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ বস্তি- সব জায়গাতেই একই চিত্র। বস্তিবাসীরা করোনাকে বড়লোক ও শিক্ষিত লোকের রোগ মনে করে অবাধে চলাফেরা করছেন এখনো। শ্রমজীবী মানুষের অধিকাংশ যারা খোলামেলা পরিবেশে কাজ করেন তাদের মধ্যেও কোভিড-১৯-এর প্রকোপ কম।

বেশ কয়েকজন সাধারণ নাগরিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে মানবকণ্ঠকে বলেন, দেশের বিত্তবান শ্রেণির লোকজন সাধারণ সময়ে হাঁচিকাশি বা সাধারণ মেডিকেল চেক-আপের জন্যও দেশের বাইরে চলে যেতেন। টাকাওয়ালা, ক্ষমতাবান, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও নানা বেসরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয়রাও পরিবারসহ নিজেদের রোগের চিকিৎসা সাধারণভাবে বিদেশেই করে থাকেন। দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দিকে তারা কেউ এত দিন নজর দেননি। কিন্তু কোভিড-১৯ সমস্ত দৃশ্যপট বদলে দিয়েছে। বিদেশযাত্রার সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে এখন। তাই করোনার এই কালে এরা সবাই স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন। এদের হাহাকার ধ্বনি কান পাতলেই শোনা যায়। বিত্ত, ক্ষমতা ও অবস্থানের ত্রিমুখী জোটের সদস্যরা দেশের ভেতর চিকিৎসাসেবার উন্নত জায়গাগুলো দখলে নেয়। ফলে এসব বড়লোকের ভিড়ে চিকিৎসাবঞ্চিত হয় সাধারণ মানুষ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী করোনা নিয়ে একটি গবেষণার চিত্র তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে কোভিড-১৯-এর সংক্রমণের তীব্রতা কম বলে গবেষণায় প্রতীয়মান হচ্ছে। নির্ণীত কোভিড-১৯ রোগীর ৮০ শতাংশ বাস করেন দেশের ২০ শতাংশ স্থানে। আর বাকি ২০ শতাংশের বাস দেশের বাদবাকি অঞ্চলে। পর্যবেক্ষণ থেকে বেরিয়ে এসেছে দিনরাতের অধিকাংশ সময় যারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ ও কৃত্রিম আলোর নিচে বাস করেন তাদের মধ্যে কোভিড-১৯ সংক্রমণের হার বেশি। আর শ্রমিকদের মধ্যে গার্মেন্টস কর্মীরা একটু বেশি সংখ্যায় আক্রান্ত। অন্য পেশার লোকজনের মধ্যে সংক্রমণের হার তুলনামূলক খুবই কম। যাদের মধ্যে রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিক, কৃষক শ্রেণি উল্লেখযোগ্য।

ডা. লেলিন আরো বলেন, এই পর্যবেক্ষণ থেকে এটি বেরিয়ে এসেছে যে, প্রাকৃতিক রোদ, বাতাস, মাটির পরিবেশে তাজা ফলমূল, শাকসবজি ও খাবার খেয়ে যারা পরিশ্রমী জীবনযাপন করেন তারা তুলনামূলকভাবে বেশি কোভিড-১৯ প্রতিরোধী। বিষয়টি নিয়ে আরো গবেষণা হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন এই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।

 




Loading...
ads






Loading...