প্রকট হচ্ছে জীবন-জীবিকার দ্বন্দ্ব


poisha bazar

  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ২০ জুন ২০২০, ২৩:৪৯

সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচানোর পাশাপাশি জীবিকা নিশ্চিতের কঠিন সমীকরণ মেলাতে গিয়ে বিশ্বের অন্য অনেক দেশের মতো লকডাউন শিথিলের পথে হেঁটেছে সরকার। পেছনে অর্থনীতির বিপুল ক্ষতি, আর করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বগতিতে সামনে এখন গভীর অনিশ্চয়তা।

এমন এক কঠিন পরিস্থিতিতে মানুষ প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ‘স্বাভাবিক’ কর্মকাণ্ডে ফিরেছেন। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে কতটা উপকৃত হয়েছে মানুষ আর কতটাই সচল হয়েছে অর্থনীতির চাকা-এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে মানুষের মনে। এ নিয়ে ভাবনার অন্ত নেই অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদদের পরামর্শে ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এররের’ (পরীক্ষা এবং ত্রুটি) মধ্য দিয়েই এগোচ্ছে সরকার। পাশাপাশি মহামারী করোনার বিস্তার ঠেকাতে ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ‘ম্যাচিং ও জোনিং’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথেও এগোনো হচ্ছে। কিন্তু এতকিছু করেও অর্থনৈতিক এবং মানুষের জীবনের সুরক্ষার সমীকরণ মেলাতে পারছে না কেউই। করোনায় নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও মানুষ বের হচ্ছে জীবিকার সন্ধানে। এ যেন অনেকটা জেনে-শুনে মরণফাঁদের দিকে যাত্রা।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সীমিত পরিসরে সব খুলে দেয়ার এমন সিদ্ধান্তে সংক্রমণ ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি অর্থনীতির গতিও কিছুটা বেড়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়তো আগের মতো হচ্ছে না। কিন্তু অর্থনীতির চাকা সচল হয়েছে-এমনটি বলা যাবে না। সরকারি অফিসে ২৫ শতাংশ উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে। গণপরিবহন আর ট্রেন চলাচল পুরোদমে শুরু হয়নি। বড় শপিংমলগুলোও খোলেনি।

তার মানে, সীমিত পরিসরে খুলে দিলেও সবকিছু এখনো স্বাভাবিক হয়নি। এদিকে বলা হচ্ছে, করোনা আগামী দুই-তিন বছর ধরে চলতে পারে। এটি হলে তো সবকিছু লকডাউন করে দিয়ে ঘরে বসে থাকলেও চলবে না। অর্থনীতি সচল করার পথে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেয়ার ওপরই এখন জোর দিচ্ছেন তারা।

তাদের মতে, স্বাস্থ্য খাতের জনবল যদি সুরক্ষা নিয়ে কাজ করে যেতে পারে, তাহলে অন্য খাতেও সেটা সম্ভব। কিন্তু পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিতে হবে এবং সেটি নিতে হবে অতি গুরুত্বের সঙ্গে। শতভাগ না পারলেও অন্তত ৯০ শতাংশ নিতে হবে। এটি হতে হবে লাঠি না ভেঙে সাপ মারার মতো।

বাংলাদেশে প্রথম কোভিড-১৯ রোগী ধরা পড়েছিল গত ৮ মার্চ। শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১০০ ছাড়াতে লেগেছিল প্রায় এক মাস। ওই অবস্থায় ২৬ মার্চ থেকে সব অফিস-আদালত ও যানবাহন চলাচল বন্ধ রেখে সবাইকে ঘরে থাকতে বলা হয় সরকারের তরফ থেকে। এই লকডাউনের মধ্যেই এপ্রিলে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে।

গত ৪ মে রোগীর সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু এর মধ্যেই দোকানপাট, কারখানা খোলার সিদ্ধান্ত আসে। ৩১ মে থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া প্রায় সবকিছুই খুলে দিয়ে ‘সীমিত আকারে’ কর্মকাণ্ড শুরুর কথা বলা হয়।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, লকডাউনের শেষ দিন ৩০ মে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজার ৬০৮ জন। সে পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছিল ৬০১ জনের। শনিবার পর্যন্ত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা এক লাখ আট হাজার ছাড়িয়ে গেছে, মৃতের সংখ্যা পেরিয়েছে এক হাজার ৪০০। অর্থাৎ লকডাউন শিথিল করার পর এই কদিনে সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়েছে দ্রুতগতিতে। যা ভাবিয়ে তুলছে সবাইকে।

সরকারের তরফ থেকে এখনো সন্ধ্যার পর দোকানপাট খোলা না রাখা, রাতে চলাচল সীমিত করাসহ বিভিন্ন বিধিনিষেধ জারি রাখা হয়েছে। কিন্তু যানবাহনে গাদাগাদি ভিড়, বাজার-দোকানে দূরত্ব বজায় না রাখা, পার্কে মানুষের জটলা করে বসে থাকার চিত্র আসছে নিয়মিত। ফলে অফিস-কারখানায় সংক্রমণ ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে নতুন করে ‘কঠোর লকডাউন’ জারির দাবি আসছে বিভিন্ন মহল থেকে।

সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, করোনা ভাইরাস সংকট আর দীর্ঘদিনের লকডাউনে দেশের অর্থনীতি যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে বিধিনিষেধ শিথিল করে কাজে ফেরার কোনো বিকল্প ছিল না। সরকারের একজন মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, যেসব উন্নত দেশে পণ্য রফতানি করা হয় সেসব দেশও ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। এখন তারা একটি শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে গিয়ে তাদের অর্থনীতি আবার সচল করে দিয়েছে। তারা এখন নতুন করে অর্ডারও দেয়া শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতি খোলা না থাকলে চরমভাবে পিছিয়ে পড়তে হবে। তবে এখন স্থানীয়ভাবে লকডাউন করে মহামারী নিয়ন্ত্রণের কৌশল সরকার নিয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ তা বাস্তবায়ন করবে।

এ বিষয়ে আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘বিধিনিষেধ তখনই শিথিল করার প্রশ্ন আসে যখন সংক্রমণ কমতে থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে ইউরোপে বিধিনিষেধ শিথিল হয়েছে সংক্রমণের হার কমার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে। কিন্তু বাংলাদেশে সংক্রমণ বাড়তে থাকার মধ্যে লকডাউন শিথিল করায় জনস্বাস্থ্যের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।’

সরকারের জোনিং পদ্ধতি কতটুকু কাজ করছে সে বিষয়ে এই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘সারা দেশে তো সংক্রমণের একই রকম অবস্থা থাকে না, যেখানে ক্লাস্টার আছে এবং সে ক্লাস্টারে যদি গণসংক্রমণ হয়, তাহলে সেখানে চলাচলের সীমাবদ্ধতা রাখতে হবে সর্বোচ্চ। যে রকম হয়েছিল মিরপুরের টোলারবাগ আর মাদারীপুরের শিবচরে। কিন্তু সেটি তো হচ্ছে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘এলাকা বড় হলে বেষ্টনী তৈরি করতে হবে, গণহারে সংক্রমণ হলে বেষ্টনী হবে নিবিড়ভাবে। আর সারা দেশেই যেহেতু সংক্রমণ হচ্ছে, সেহেতু চলাচলে যেন ভিড় না থাকে তাও নিশ্চিত করতে হবে। একজনের সঙ্গে অন্যজনের যেন শারীরিক দূরত্ব বজায় থাকে, কোথাও কোনো সমাবেশ যেন না হতে পারে, বাজারঘাটে একে অপরের সংস্পর্শ যেন এড়ানো যায়-এটা সব এলাকার জন্যই প্রযোজ্য।’

মুশতাক হোসেন বলেন, ‘এটি একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা। সরকারের একার পক্ষে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। জনগণের সহযোগিতা নিয়েই সেটি করতে হবে। মহামারী নিয়ন্ত্রণে কী করা দরকার, সেই তথ্য মানুষকে জানানোর এবং সচেতনতা বাড়াতে তাদের অন্তর্ভুক্ত করার ওপর জোর দেন এই বিশেষজ্ঞ।

 





ads