পাপুলের জামায়াত কানেকশন, টনক নড়ছে দুদকের


poisha bazar

  • ফরহাদ শিকদার
  • ১১ জুন ২০২০, ১০:২২,  আপডেট: ১১ জুন ২০২০, ১১:১৯

কুয়েত সিআইডির হাতে গ্রেফতার হওয়া লক্ষ্মীপুর-২ আসনের এমপি কাজী শহীদ পাপুল, তার স্ত্রী, মেয়ে ও শ্যালিকার ব্যক্তিগত বিভিন্ন নথিপত্র তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চিঠি পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন দুদক পরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য।

তিনি গণমাধ্যমকে জানান, অর্থপাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদক থেকে পাঠানো চিঠিতে পাপুল, তার স্ত্রী সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি সেলিনা ইসলাম, মেয়ে ওয়াফা ইসলাম ও সেলিনার বোন জেসমিনের জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, টিআইএন নম্বর, আয়কর রিটার্নসহ ব্যক্তিগত সব নথিপত্র তলব করা হয়েছে।

দুদকের ঊর্ধ্বতন একটি সূত্রে জানা যায়, চিঠি পাঠানো হয়েছে গুলশানে সেলিনা ইসলামের আবাসিক ঠিকানা ও লক্ষ্মীপুরের স্থায়ী ঠিকানায়। চিঠিতে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে উল্লিখিত নথিপত্র দুদক কার্যালয়ে পাঠানোর জন্য বলা হয়েছে। প্রয়োজনে বিশেষ ব্যবস্থায় তাঁদের বক্তব্য নেয়া হতে পারে বলে চিঠিতে বলা হয়। এরই মধ্যে দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে এমপি পাপুল ও তাঁর স্ত্রী সেলিনা ইসলামসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত কয়েক শ কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্য-উপাত্ত মিলেছে। বিদেশে অর্থপাচারের তথ্য-প্রমাণাদি ও নথিপত্র যাচাই করা হচ্ছে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।

কাজী শহীদুল ইসলাম পাপুলের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, হুন্ডি ব্যবসা ও মানবপাচার, অবৈধ ভিসা ট্রেডিংসহ অবৈধ সম্পদের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক।

এদিকে ২০১৬ সালের ঈদুল আজহার আগে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) কাজী শহীদুল ইসলাম পাপুলকে তার গ্রামের মানুষ চিনতেন না। হঠাৎ গ্রামের বাড়ির সামনে মায়ের নামে একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান করতে গিয়ে এলাকাবাসীর নজরে আসেন তিনি। দুই হাতে দেদার বিলিয়েছেন টাকা। এরপর স্থানীয় আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সাংসদ নির্বাচিত হন।

শুধু তাই না, পরবর্তী সময়ে স্ত্রী সেলিনা ইসলামকেও একইভাবে কুমিল্লায় সংরক্ষিত আসনের (৩৪৯) এমপি বানান। এলাকার দুই একজন আওয়ামী লীগ নেতা বিভিন্ন জন-সমাবেশে মাঝেমধ্যে তাকে ‘হাইব্রিড’ গালি দিয়ে জালাময়ী বক্তব্য দিলেও বেশিরভাগই চুপ। তাতে পাপুলও খুশি। আওয়ামী লীগের কোন পদ-পদবী লাগে না তার। বছরে দু-একবার হেলিকপ্টার যোগে এলাকায় আসেন। মরুভূমির সম্রাটের মতো এলাকায় নামেন, তারপর টাকা ছিটিয়ে চলে যান!

শহিদ ইসলাম কুয়েতে গ্রেফতার হন গত শনিবার রাতে মানব ও মুদ্রা পাচারের অভিযোগে। তার আগে লক্ষ্মীপুরের মানুষ তাকে দানবীর হিসেবেই জানতেন। এলাকার লোকজন জানান, ১৯৮৯ সালে একটি প্রতিষ্ঠানের সুপারভাইজার (শ্রমিকদের তত্ত্বাবধায়ক) হিসেবে চাকরি নিয়ে কুয়েত যান তিনি। তখন তিনি ছিলেন অনেকটা নিঃস্ব। ১৯৯০ সালে ইরাকের কুয়েত দখলের কারণে তিনি দেশে ফিরে আসেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কাজী শহিদ আবার কুয়েতে যান। এ ক্ষেত্রে তাকে সহযোগিতা করেন বড় ভাই কাজী মঞ্জুরুল আলম। মঞ্জুরুল কুয়েত বিএনপির সাধারণ সম্পাদক।

জানা গেছে, ১৯৯৮ সালে নিজের ক্লিনিং ব্যবসা শুরু করেন কাজী শহীদ পাপুল। পরে এর নাম দেন মারফিয়া কুয়েতিয়া। তবে তার অর্থ উপার্জনের সব পথ বৈধ ছিল না। বিশেষ করে তার প্রতিষ্ঠানে অবৈধভাবে বিনা বেতনে লোক খাটানোসহ মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায় অবৈধ উপায়ের কিছু ঘটনা প্রকাশ পেতে শুরু করলে তিনি এক পর্যায়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য তৎপর হয়ে ওঠেন।

সূত্র জানায়, অবৈধ সম্পদ রক্ষার জন্যই তার দরকার হয় একটি কূটনৈতিক পাসপোর্টের। এমপি পাপুল ওয়ার্ক পারমিট নিয়েই কুয়েতে ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন। তিনি কুয়েতের স্থায়ী নাগরিকত্ব নেননি। এ কারণে বাংলাদেশের কূটনৈতিক পাসপোর্টধারী হলে তিনি কুয়েতে 'ডিপ্লোম্যাটিক সুবিধা' পাবেন, এ চিন্তা থেকেই মূলত তিনি যে কোনো মূল্যে এমপি হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। এ কারণেই তিনি বাংলাদেশে জামায়াত নেতাদের মালিকানাধীন 'দিগন্ত টিভি'র অন্যতম পরিচালক হয়েও একাদশ জাতীয় নির্বাচনে লক্ষ্মীপুরে আওয়ামী লীগের একটা বড় অংশের সমর্থন পান। তবে তিনি নির্বাচন করেন স্বতন্ত্র হিসেবে।

সূত্র জানায়, প্রতারণার জন্য কুয়েতের রাজকীয় আইন বেশ কঠোর। এ অপরাধ প্রমাণিত হলে তার কোম্পানিও জব্দ করা হতে পারে। পাপুলের এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রবাসে বৈধভাবে বিনিয়োগ করে ব্যবসা করা বাংলাদেশিদের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে বলেও সূত্রের অভিমত।

রায়পুরের মধ্য কেরোয়া গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ শামসু বলেন, ৩০-৩২ বছর আগে গ্রাম ছাড়েন শহিদ। তখন তার আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। বিদেশে গিয়ে আদম ব্যবসা শুরু করার পর হঠাৎ তার উত্থান হয়েছে। এক বছর আগে গ্রামবাসীর কাছে তিনি দানবীর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু সেই পরিচয় এখন আর নেই।

রায়পুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা গেছে, লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শত শত মানুষকে চাকরি দেবেন বলে কুয়েতে পাঠানো শুরু করেন কাজী শহিদ। কুয়েতের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আদম ব্যবসায় নামেন তিনি। মারাফি কুয়েতিয়া গ্রুপ অব কোম্পানির নামে তিনি জনশক্তি রফতানি শুরু করেন। একসময় এই প্রতিষ্ঠানটির কর্মী ছিলেন তিনি।

রায়পুর পৌরসভার মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল খোকন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-২ আসনটি জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ নোমানকে ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু ভোটের ৯ দিন আগে তিনি নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। তখন জোট নেতাদের নির্দেশে আমরা স্বতন্ত্র প্রার্থী কাজী শহিদ ইসলামের জন্য কাজ করি। এমপি হওয়ার জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করেছেন শহিদ। এমপি হওয়ার পর তার সঙ্গে আমাদের বনিবনা আর হচ্ছে না।’





ads







Loading...