সুনসান পূর্ব রাজাবাজার

সুনসান পূর্ব রাজাবাজার - সংগৃহীত

poisha bazar

  • সেলিম আহমেদ
  • ১১ জুন ২০২০, ০৪:০২,  আপডেট: ১১ জুন ২০২০, ১০:০৭

রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজার। প্রতিদিন ভোর থেকেই রিকশার টুংটাং শব্দ, অফিসযাত্রীর তাড়া, অলিগলিতে সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের হকারদের চিৎকারে ঘুম ভাঙানো এলাকার মানুষের। প্রতিদিনের মতো গতকালও ভোর হলো। কিন্তু সে এক অন্যরকম ভোর। নেই এলাকার মানুষের কোনো ব্যস্ততা।

চারদিকে ভর করেছে সুনসান নীরবতা। স্বাভাবিকের চেয়ে সরু গলিগুলোতে নেই কোনো জ্যাম। করোনা প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে লকডাউনে থমকে গেছে মানুষের জীবনযাত্রা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি আর মহড়ার কারণে দিনভর জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হয়নি কেউই।

এদিকে পূর্ব রাজাবাজার ছাড়াও রেড জোনে থাকা দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক আরোপিত লকডাউনও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে স্থানীয় একাধিক সূত্র। গতকাল সকালে পূর্ব রাজাবাজার ঘুরে দেখা যায়, লকডাউন পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে স্থানীয় ও পুলিশ প্রশাসনের পাশাপাশি মাঠে সক্রিয় সেনা সদস্যরাও।

রাজাবাজারে প্রবেশের আটটি পথের মধ্যে শুধুমাত্র আইবিএ হোস্টেলের পাশের পথটি খোলা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বাকি পথগুলো। তবে সেই পথটি দিয়েও ওই এলাকায় অবস্থানরত সংবাদকর্মী, চিকিৎসক ও নার্স ছাড়া কাউকেই প্রবেশ বা বের হতে দেয়া হচ্ছে না। সকাল থেকেই বিভিন্ন পেশার লোকজন পরিচয়পত্র নিয়ে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য আসলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের ফিরিয়ে দিচ্ছেন। অনেকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা ও বার বার অনুরোধ করেও এলাকা থেকে বের হতে পারেননি। কর্মস্থলে যেতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা বাসায় ফিরে গেছেন।

বাংলাদেশে মরণঘাতী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ও ঊর্ধ্বগতি এড়াতে সংক্রমণের হার অনুযায়ী তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে দেশকে। অধিক সংক্রমিত এলাকাগুলোকে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করে করা হচ্ছে কার্যকর লকডাউন। এরই অংশ হিসেবে মঙ্গলবার মধ্যরাত ১২টা থেকে ঢাকার প্রথম এলাকা হিসেবে পূর্ব রাজাবাজারে পরীক্ষামূলকভাবে পুরোদমে লকডাউন কার্যকরের তৎপরতা শুরু হয়। লকডাউনের ফলে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন গিঞ্জি এ এলাকাটির ৪০-৫০ হাজার মানুষ। ইতোমধ্যে ছোট্ট এই এলাকার ৩১ জনের শরীরে পাওয়া গেছে মরণব্যাধি করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি।

স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদুর রহমান বলেন, মঙ্গলবার রাত ১২টা থেকে পূর্ব রাজাবাজার এলাকা লকডাউন করা হয়েছে। সড়ক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এই এলাকায় কাউকে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। বের হতেও দেয়া হচ্ছে না। তিনি জানান, ওয়ার্ড কাউন্সিলরের পক্ষ থেকে পূর্ব রাজাবাজার এলাকার কর্মহীন, অসহায় ও দুস্থ মানুষের একটি তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী তাদের ডিএনসিসি থেকে ত্রাণসামগ্রী সরবরাহ করা হবে। এছাড়া অন্যরা অনলাইনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পণ্য কেনাকাটা করতে পারবেন। প্রশিক্ষিতরা বাসায় সেসব নিত্যপণ্য পৌঁছে দেবেন।

এলাকাবাসীকে বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা করতে কাউন্সিলরের নির্দেশে ৪০ জন স্বেচ্ছাসেবক সকাল থেকে কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানান শুভ নামের এক স্বেচ্ছাসেবক। তিনি জানান, এলাকাবাসীর সুবিধার্থে বেশ কয়েকটি কাঁচাবাজারের ভ্যান আগে থেকেই প্রস্তুত করা ছিল। সেগুলো এলাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করবে।

সকালে কাজে যোগ দিতে বের হন বারডেম হাসপাতালের নার্সিং সুপারিন্টেন্ডেন্ট রাহিলা খানম। তিনি বলেন, ‘সরকার জনসাধারণের ভালোর জন্যই কঠিন সিদ্ধান্তটি নিয়েছে। যদিও এলাকাবাসীর বেশ কয়েকদিন কষ্ট হবে, তবু উচিত বিষয়টি মেনে চলা।’ অন্যদিকে, কাজে যোগ দিতে যেতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন সায়মন সিয়াম নামে একজন।

তিনি বলেন, ‘অফিসের উদ্দেশে বের হয়েছি। কিছুতেই বের হতে দিচ্ছেন না পুলিশ সদস্যরা। এভাবে ১৪ দিন লকডাউন থাকলে হয়তো চাকরিটা নাও থাকতে পারে।’

মূলত কারা কারা এই মুহূর্তে এলাকা থেকে বের হতে এবং প্রবেশ করতে পারছেন, জানতে চাইলে সেখানে কর্তব্যরত শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সনজিৎ বলেন, এই মুহূর্তে আমরা এই এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে যারা সাংবাদিক, ডাক্তার ও নার্স শুধুমাত্র তাদের বের হতে এবং প্রবেশ করতে দিচ্ছি। এর বাইরে অন্য কোনো পেশার কাউকেই বের হতে দেয়া হচ্ছে না। কিন্তু, একান্ত জরুরি প্রয়োজন হলে সেক্ষেত্রে আমরা বিষয়টি ভেবে দেখব।

সবার সহযোগিতায় ‘রেড জোন’ থেকে ‘গ্রিন জোন’-এ রূপান্তর সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম। রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজার এলাকাকে মডেল হিসেবে সফলতার সঙ্গে করোনা মোকাবিলায় সবার প্রতি আহ্বান জানান আতিক। গতকাল বুধবার ডিএনসিসি নগর ভবন থেকে এক ভিডিওবার্তায় এ আহ্বান জানিয়ে নগরবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা জানেন পূর্ব রাজাবাজার এলাকার ২৭ নম্বর এলাকা আমরা পরীক্ষামূলকভাবে রেড জোন ঘোষণা দিয়ে কাজ করছি। এই কাজ সফল করতে সবার সহায়তা দরকার।

মানবকণ্ঠ/এমএইচ





ads