বাজেটের টাকা আসবে কোত্থেকে!


poisha bazar

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ০৬ জুন ২০২০, ১০:২১

করোনা মহামারীর সঙ্গে হাত মিলিয়েছে অর্থনৈতিক মহামন্দা। এ রকম কঠিন বাস্তবতা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতোই বাংলাদেশের অর্থনীতির সূচকও মুখ থুবড়ে পড়ে যাচ্ছে। উৎপাদন ও সেবাখাত প্রায় অচল হয়ে রয়েছে। এ অবস্থায় রাজস্ব আয় থমকে গেছে।

এমনই এক নাজুক পরিস্থিতিতে আগামী ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল আগামী অর্থবছরের জন্য জাতীয় বাজেট উত্থাপন করতে যাচ্ছেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতে এ বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হচ্ছে স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে। এজন্য সামর্থ্যরে সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েও বড় বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী।

কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই বাজেটের অর্থ আসবে কোত্থেকে? এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাদের ঘাড়ে তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যদিও চলতি অর্থবছরের সম্ভাব্য রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে বিগত পাঁচ বছরের গড় প্রবৃদ্ধি ১৪ শতাংশ ধরলে আগামী অর্থবছরে দুই লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় হবে না।

এনবিআরকে এত বড় টার্গেট বেঁধে দিয়েও রেকর্ড ঘাটতি বাজেট ঘোষণার পরিকল্পনা নিচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। এ বিশাল ঘাটতি পূরণে বিদেশি ঋণ ও সহায়তাকেই ভরসা মানছেন তিনি। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ উৎস তথা ব্যাংক খাত ও সঞ্চয়পত্র থেকেও বাড়তি ঋণ নিতে হবে সরকারকে। ব্যাংক খাত থেকে বেশি ঋণ নিলে তা বেসরকারি বিনিয়োগে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে বলে সতর্ক করছেন অর্থনীতিবিদরা।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, করোনাকালীন নানা টানাপড়েন মেনে নিয়েই অর্থমন্ত্রী বাজেটের একটি খসড়া তৈরি করেছেন। এতে নতুন বাজেটের সম্ভাব্য আকার পাঁচ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এটি চলতি বাজেটের তুলনায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা বেশি। বাজেট যেহেতু ১১ জুন ঘোষণা করা হবে, তাই আরো কিছুদিন বাকি। এ সময়ের মধ্যে বাজেটের আকারে পরিবর্তন আসতে পারে। এত বড় বাজেট দেয়ার কারণ হিসেবে করোনা ভাইরাসে স্বাস্থ্য, খাদ্য, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসহ নানা খাতে ব্যয় বাড়াকে দায়ী করা হচ্ছে।

ফলে এবার ঘাটতি ‘গোল্ডেন ফাইভ রুলস’ ভাঙছে। বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ দশমিক ৮ শতাংশে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। সে হিসাবে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় এক লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেটের আকার পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। আর ঘাটতির পরিমাণ এক লাখ ৪৫ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা। সে হিসাবে আগামী অর্থবছরে ঘাটতির পরিমাণ চলতি অর্থবছর থেকে ২৯ হাজার ৬২১ কোটি টাকা বেশি।

ঘাটতি মেটাতে আগামী অর্থবছরের বাজেটে অভ্যন্তরীণ খাতে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে এক লাখ সাত হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার ব্যাংক থেকে বেশি মাত্রায় ঋণ নেয়ার চিন্তাভাবনা করছে। ব্যাংক থেকে সরকার ৭২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য স্থির করেছে। চলতি বাজেটে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৪৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা। সে হিসেবে আগামী বাজেটে ব্যাংকঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ২৪ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা।

আর আগামী বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি বাজেটে সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। সে হিসেবে এ উৎস থেকে লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার আগামী অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকছে বিদেশি উৎসের ওপর। আগামী বাজেটে বিদেশি উৎস থেকে সরকার ৭৫ হাজার কোটি টাকার সহায়তা পাওয়ার আশা করছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৬৮ হাজার ১৬ কোটি টাকা। সে হিসাবে ছয় হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে।

চলতি অর্থবছরের আট মাসে সার্বিক রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ। এ সময়ে মোট ৬৮ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়। এটি পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ২০ শতাংশ। তার পরও আগামী বাজেটে মোট রাজস্বপ্রাপ্তি ধরা হতে পারে তিন লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের মাধ্যমে সংগৃহীত লক্ষ্যমাত্রা তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। বাকি রাজস্ব আসবে এনবিআরের বাইরে করবহির্ভূত রাজস্ব খাত থেকে।

আসন্ন বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে মূল বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু করোনার কারণে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না। অর্থ মন্ত্রণালয় তা সংশোধন করে ৫ দশমিক ৫ শতাংশের প্রস্তাব দিয়েছে।

সূত্রগুলো জানায়, আগামী বাজেটে রাজস্ব নীতি প্রণয়নে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বেগ পোহাতে হচ্ছে। ১৯৭২ সালে এনবিআর গঠনের পর এ ধরনের কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়তে হয়নি দেশের প্রধান রাজস্ব আদায়কারী এ সংস্থাকে। আগে রাজস্ব নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকারের বেঁধে দেয়া প্রাক্কলিত লক্ষ্যমাত্রার ওপর ভিত্তি করে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্কহার নির্ধারণ করা হতো। এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

করোনাভাইরাস সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছে। ভোগ ও চাহিদা কমে যাওয়ায় বর্তমানে বৈশ্বিক ও দেশীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা একেবারেই নাজুক। অন্যদিকে সংকট মোকাবিলায় সরকারকে অর্থের জোগান দিতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা না হলে জোরাজুরি করে রাজস্ব আদায় বাড়ানো যাবে না। এজন্য কর ছাড় দেয়া প্রয়োজন। আবার কর ছাড় দিলে লক্ষ্য অনুযায়ী রাজস্ব আদায় একেবারেই সম্ভব হবে না, যা ইতোমধ্যে এনবিআর থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। এ কঠিন পরিস্থিতি উত্তরণে রাজস্ব নীতিতে বিনিয়োগকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে।

আগামী অর্থবছরের প্রাক্কলিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা যৌক্তিকীকরণের অনুরোধ জানিয়ে অর্থ সচিবকে পাঠানো চিঠিতে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, আগামী অর্থবছরের শুরুতে দুর্যোগ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও স্থানীয় ও বৈদেশিক অর্থনীতির ওপর রেখে যাওয়া বিপুল প্রতিক্রিয়ায় আশানুরূপ রাজস্ব আহরণ সম্ভব হবে না। তারপরও বর্তমান বছরের সম্ভাব্য আদায়ের ওপর পূর্ববর্তী গড় পবৃদ্ধি ১৪ শতাংশ হিসাব করা হলে আগামী অর্থবছরের সর্বমোট আহরণ ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি হবে না। অপরদিকে আগামী অর্থবছরের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা আদায় দুরূহ হবে।

এর কারণ হিসেবে চিঠিতে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসজনিত দুর্যোগ মহামারী পৃথিবীর সামাজিক, রাজনৈতিক, মনস্তাত্তি¡ক ও অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। বিশেষত এ দুর্যোগ পরিস্থিতি কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে এবং পূর্বতন জীবনযাত্রা ফিরে আসবে সেটা নির্দিষ্ট করে বলা কারো পক্ষেই সম্ভব হচ্ছে না। কর আহরণ ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিশ্বের সব মানুষের ভোগ, চাহিদার ওপর নির্ভরশীল।

কোভিড-১৯ জনিত পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও সনাতনী ধারায় অর্থনীতি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ আহরণ, বণ্টন, বাণিজ্য ও ভোগে বিপুল পরিবর্তন নিয়ে আসবে এবং সারা বিশ্বের সঙ্গে আমাদের দেশেও পরিবর্তনের ঢেউ আঘাত হানবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্থানীয় ভোগের চাহিদা কমে গেলে আমদানি কমবে, শিল্প-উৎপাদন কমলে কাঁচামাল-যন্ত্রপাতির চাহিদা কমে যাবে। এতে পরোক্ষ করের ওপর ব্যাপক ঋণাত্মক প্রভাব পড়বে। অন্যদিকে আয়বর্ধক কার্যক্রম কমে গেলে অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হলে প্রত্যক্ষ করও কমে যাবে।

ধারণা করা যায়, নিকট আগামীতে রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বড় একটি অংশ জনগণের মৌলিক চাহিদার সেবায় নিয়োজিত হবে। যার মধ্যে চিকিৎসা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন, খাদ্য, শিক্ষা, আবাসন ও জনগণের নিরাপত্তার দিকেই অধিকতর মনোযোগ নিবিষ্ট করতে হবে। এসব মৌলিক সম্পদ, উৎপাদন, বিপণন, সরবরাহ ও সেবার অধিকাংশই সম্পূর্ণ করমুক্ত বা ন্যূনতম করের আওতাধীন। তাই নিকট ভবিষ্যতে দুর্যোগ অবস্থা স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও তার দীর্ঘস্থায়ী প্রতিক্রিয়ায় রাজস্ব আহরণ ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে।

এনবিআরে চেয়ারম্যান চিঠিতে আরো বলেন, অতিরিক্ত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলে মাঠপর্যায়ে রাজস্ব আহরণকারী কর্মকর্তাদের ওপর এক ধরনের মানসিক চাপ তৈরি হয়। অনেকে অসম্ভব বিবেচনা করে এক পর্যায়ে হাল ছেড়ে দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে করদাতাদের ওপর হয়রানির অভিযোগ আসে। অন্যদিকে লক্ষ্যমাত্রা যৌক্তিক হলে কর্মকর্তাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রচেষ্টা থাকে ও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কৃতিত্ব পাওয়ার অনুপ্রেরণা তৈরি হয়।





ads







Loading...