নাড়ীর টানে নেই মৃত্যুভয়

নাড়ীর টানে নেই মৃত্যুভয় - ফাইল ছবি

poisha bazar

  • আব্দুল্লাহ রায়হান
  • ২৩ মে ২০২০, ০৩:২০,  আপডেট: ২৩ মে ২০২০, ১০:১৩

প্রাণঘাতি করোনার প্রাদুর্ভাবের মধ্যেও প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে ব্যক্তিগত গাড়ি ও ভাড়া করা মাইক্রোবাসে ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছেন হাজারো মানুষ। রাজধানীর বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার পরিবহন ছাড়ছে না।

গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে অনেকেই টার্মিনালের আশপাশে এসে অবস্থান নিতে দেখা গেছে। তাদের অনেকে আবার মাইক্রোবাস ভাড়া করে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। অন্যদিকে সারাদেশে ফেরি চলাচলও শুরু করেছে যাতে যাত্রীদের যাতায়াতে হয়রানীর শিকার হতে না হয়।

পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঈদুল ফিতরের ছুটিতে বাড়ি ফেরার পথে পুলিশি বাধা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহর ছাড়ার ব্যাপারে পুলিশ কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসেছে। পুলিশ সদর দফতর থেকে পাঠানো নির্দেশনায় বলা হয়েছে, লোকজন ব্যক্তিগত গাড়িতে বাড়ি ফিরতে পারবে।

তবে গণপরিবহন বন্ধ থাকবে। ঘরমুখো মানুষদের বাধা না দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সদস্যদের বলা হয়েছে। ঢাকার ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার পর্যায়ের একজন বলেন, কেউ বাড়ি যেতে চাইলে যেতে পারবেন। তবে গণপরিবহন বন্ধ। তাহলে কীভাবে যাবেন, সহজেই অনুমেয়।

এদিকে এমন ঘোষণার পরই বিভিন্ন সড়ক মহাসড়কে গতকাল শুক্রবার সকাল থেকেই ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস চলাচলের পরিমাণ বেড়ে যায়। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে বন্ধ হয়ে যাওয়া ফেরি চলাচল পুনরায় শুরু হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১১টার দিকে এ রুটে ফেরি চলাচল শুরু হয়।

এর আগে ১৮ মে করোনা সংক্রমণ এড়াতে ঘরমুখো যাত্রীদের চাপ ঠেকাতে বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষ ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেয়। বৃহস্পতিবার রাত থেকে ফেরি চলাচল শুরু হওয়ায় হাজার হাজার যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রাক নদী পার হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘরমুখো যাত্রীদের চাপ আরও বাড়তে থাকে।

তবে সরকারের এমন পদক্ষেপের খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় গঠিত ‘জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির’ একজন সদস্য বলেছেন, এটা করা হলে সারা দেশে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি আরো বাড়বে।

ব্যক্তিগত গাড়িতে যাতায়াতকারীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা নিজস্ব গাড়ি নিয়ে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেয়ার জন্য। মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার ভাড়া করেও একটি বড় অংশ ঢাকা ছাড়ছেন। প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে বাড়তি টাকা দিয়েই এসব মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার ভাড়া করছেন তারা।

গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরে যাওয়ার জন্য যাত্রাবাড়ি থেকে ১৫ হাজার টাকা প্রাইভেট কার ভাড়া করেছেন আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি ঈদ করতে। আমরা তিনজন মিলে মাইক্রোবাসটি ভাড়া করেছি। টাকা একটু বেশি খরচ হচ্ছে, তারপরও পরিবারের সবার সঙ্গে মিলে ঈদ করতে পারবো এটাই বড় কথা।

এলিফেন্ট রোড এলাকা থেকে ময়মনসিংহ গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা করা স্বপন শিকদার বলেন, চারজন মিলে ১৪ হাজার টাকা দিয়ে গাড়ি ভাড়া করেছি। ভাড়া অনেক বেশি, তারপরও বাড়িতে যেতে পারছি এটাই বড় কথা। তবে পরিবহন চললে আমাদের এতো টাকা খরচ হতো না।

তিনি বলেন, ঢাকায় অনেক দিন ধরেই বন্দী জীবন কাটাচ্ছি। কতদিন হয়ে গেছে বাবা-মা, ভাই-বোনের মুখ দেখতে পায় না। সবাই পথের দিকে চেয়ে আছে, কবে বাড়ি যাবো। যত কষ্টই হোক বাড়িতে গিয়ে বাবা-মায়ের হাসি মুখ দেখলেই, সব কষ্ট দূর হয়ে যাবে।

করোনায় আক্রান্তের আশঙ্কার কথা বললে, তিনি বলেন, আক্রান্তের আতঙ্ক তো আছেই। তারপরও এভাবে আর কতদিন থাকা যায়? তাই আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে বাবা-মায়ের কাছে যাচ্ছি।

এদিকে গণপরিবহন না চললেও অনেকে যাত্রাবাড়ি ও সায়দাবাদের বিভিন্ন পরিবহনের কাউন্টারের আসছেন। তাদের পাশাপাশি পরিবহন শ্রমিকরাও সায়দাবাস টার্মিনাল অ লে ঘোরাঘুরি করছেন।

সায়েদাবাদ টার্মিনালে মনির নামে একজন যাত্রীবলেন, ঈদ করতে কুমিল্লায় গ্রামের বাড়ি যাবো। সকাল থেকে অপেক্ষায় আছি, যদি কোনা সুযোগ পাই চলে যাবো। এভাবে ঢাকায় পড়ে থাকতে আর ভালো লাগছে না। মাইক্রোবাস ভাড়া করে আমাদের পক্ষে যাওয়া সম্ভব না। তাই ট্রাক, কাভার্ডভ্যানের অপেক্ষা করছি।

পরিবহন চালক মোজাম্মেল বলেন, মানুষ মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কারে করে গাদাগাদি করে বাড়ি যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের পরিবহন চালাতে দেয়া হচ্ছে না। মালিক পক্ষ থেকেও আমাদের কোনো সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে না। আমরা দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছি।

দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের প্রেক্ষাপটে সরকার প্রথম দফায় ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সব অফিস-আদালত বন্ধ ঘোষণা করে। সেই সঙ্গে সারা দেশে সব ধরনের যানবাহন চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। এরপর ধাপে ধাপে সেই ছুটির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে ৩০ মে পর্যন্ত। এর মধ্যে বিপণি বিতান ও দোকানপাট, মসজিদ এবং পোশাক কারখানার ক্ষেত্রে কিছু বিধি-নিষেধ তুলে দেওয়া হলেও আন্তজেলা বাস ও গণপরিবহনে নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে।

করোনাভাইরাস অত্যন্ত সংক্রামক বলেই সরকারের তরফ থেকে এসব বিধিনিষেধ জারি করা হয়, যাতে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণের এলাকাগুলো থেকে ঈদের সময় মানুষের সঙ্গী হয়ে গ্রামে গ্রামে এ রোগ ছড়িয়ে না পড়ে। এবার ঈদের সময় অন্যবারের মতো বাড়ি যাওয়া ঠেকাতে পুলিশ কঠোর থাকবে জানিয়ে আইজিপি বেনজীর আহমেদ বলেছিলেন, ছুটিতে অনেকেই গ্রামের বাড়ি যাচ্ছেন। তা ঠিক হবে না। এটি কোনোভাবেই হতে দেওয়া যাবে না। প্রধানমন্ত্রী জনগণের সার্বিক কল্যাণের জন্য যে সব নির্দেশনা দিয়েছেন, তা সকলকে যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।

কিন্তু ঈদের মাত্র দুদিন বাকি থাকতে ব্যক্তিগত পরিবহনে বাড়ি ফেরার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসে। হাইওয়ে পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, গত বুধবার রাতে গাইবান্ধায় ঝড়ের মধ্যে ট্রাক উল্টে ১৩ জনের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে আলোচনার পর ব্যক্তিগত গাড়িকে ছাড় দেওয়া ওই সিদ্ধান্ত আসে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার পথে রাজধানীর প্রবেশ ও বাহির পথের পুলিশি বাধা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকেই রাজধানীতে এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে বসানো চেকপোস্টগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া রাজধানীর বুড়িগঙ্গা সেতুর ওপার থেকেও লোকাল যাত্রী নিয়ে মাওয়া ঘাটের দিকে যেতে দেখা গেছে বহু ব্যক্তিগত গাড়ি। অনেকে ব্যক্তিগত গাড়ি ঈদের আগে ভাড়ায় দিয়েছেন। বাবু বাজার সেতু থেকে মাওয়া পর্যন্ত যাত্রীপ্রতি নেওয়া হচ্ছে ৪শ-৫শ টাকা। মাওয়ায় পদ্মা নদী পার হয়ে দক্ষিণা লের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছেন লোকজন।

রাজধানীর আব্দুল্লাহপুরে যাত্রীদের ডেকে রাজধানীর আশপাশের জেলাগুলোতে পৌছে দিতে দেখা গেছে। বাইক চালক মিজান ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন জেলায় যাত্রীদের পৌছে দিয়েছেন। মিজান জানান, জেলা ভেদে ৫শ-১ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেন তিনি। এভাবে আরও অনেকে বাইকে উত্তরা লের বিভিন্ন জেলায়ও যাত্রী নিয়ে যাচ্ছেন।

দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাট ব্যবস্থাপক আবু আব্দুল্লাহ রনি জানান, কর্তৃপক্ষের নির্দেশে রাত থেকে এরুটে ফেরি চলাচল শুরু হয়েছে। ঘাটে যে চাপ ছিল তা সকালের আগেই কমে গেছে। বর্তমানে এ রুটে ১৪টি ফেরি চলাচল করছে।

হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মল্লিক ফখরুল ইসলাম বলেন, যারা ঈদ করতে গ্রামে যেতে চেয়েছেন সরকার তাতে সম্মতি দিয়েছেন। কিন্তু গণপরিবহন বন্ধ থাকবে। পুলিশ সড়কে নিরাপত্তা দেবে, তবে সবাইকে নিজস্ব পরিবহনে যেতে হবে। তিনি বলেন, ব্যাক্তিগত গাড়ি বলতে রেন্ট এ কার নয়, শুধু ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়েই গ্রামের বাড়ি যাওয়া যাবে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগ) ওয়ালিদ হোসেন বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যারা বাড়ি যেতে চায় তারা বাড়ি যেতে পারবে। পুলিশ পথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং গণপরিবহন বন্ধ থাকবে।

করোনাভাইরাস মহামারীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সদস্য ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক নজরুল ইসলাম শুক্রবার বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত যদি হয়ে থাকে তাহলে তো ভাইরাস সারা দেশে ছড়িয়ে যাবে! তিনি বলেন, ঢাকায় ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সারাদেশের সব জেলায় তত নয়। এখন ঢাকা থেকে মানুষ যদি নিজস্ব পরিবহনেও যায়, ভাইরাসটা তো ছড়িয়ে গেল। এতে ঝুঁকি আরো বেড়ে গেল।

সারাদেশে ফেরি চলাচল শুরু: ঘূর্ণিঝড় আমফানের দুর্যোগ কেটে যাওয়ার পর সারাদেশে আবার ফেরি চলাচল শুরু হয়েছে। বিআইডব্লিউটিসি চেয়ারম্যান খাজা মিয়া বলেন, ‘ঝড়ের প্রভাব কেটে গেছে। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে ফেরি পারাপার শুরু হয়েছে।’অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় আমফান বাংলাদেশ উপক‚লের দিকে এগিয়ে আসতে থাকায় সারা দেশে ফেরিসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয় গত মঙ্গলবার দুপুরে।

বিআইডব্লিউটিসির পক্ষ থেকে সেদিন বলা হয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া, শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি, চাঁদপুর-শরীয়তপুর, লক্ষীপুর-ভোলা এবং ভেদুরিয়া-লাহারহাট ঘাট দিয়ে ফেরি চলাচল করবে না।

বুধবার দুপুরের পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে আঘাত হেনে রাতে বাংলাদেশে প্রবেশ করে ঘূর্ণিঝড় আমফান। বৃষ্টি ঝরিয়ে দুর্বল হয়ে বৃহস্পতিবার সকালের মধ্যে তা স্থল নিম্ন চাপে পরিণত হয়। ঝড়ের মধ্যে প্রবল বাতাসে বহু গাছপালা ভেঙে পড়ে, ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন সোয়া দুই কোটি গ্রাহক।


মানবকণ্ঠ/এমএইচ




Loading...
ads






Loading...