পণ্যবাহী বাহনে ঢাকা ছাড়ার হিড়িক; বাড়ছে দুর্ঘটনা

পণ্যবাহী বাহনে ঢাকা ছাড়ার হিড়িক; বাড়ছে দুর্ঘটনা
পণ্যবাহী বাহনে ঢাকা ছাড়ার হিড়িক; বাড়ছে দুর্ঘটনা - ছবি: সংগৃহীত

poisha bazar

  • আব্দুল্লাহ রায়হান
  • ২২ মে ২০২০, ১৩:১৮

মহামারী করোনা থেকে রক্ষা পেতে শারীরিক দূরত্বের অংশ হিসেবে যে যেখানে আছেন তাকে সেখানেই ঈদ করতে সরকারের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হচ্ছে। গণপরিবহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। তার পরও সরকারি নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এভাবে বাড়ি ফেরায় নিজের জীবনসহ অন্যদেরও বিপদে ফেলে দেয়া হচ্ছে।

সর্বসাধারণের একটা বড় অংশ মানতে চাইছেন না সামাজিক দূরত্বের গুরুত্ব। অতিরিক্ত ভাড়ায় বিকল্প বাহনে চড়ার মানসিকতা গোটা রাষ্ট্রকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি করে দিচ্ছে। মানুষ পণ্যবাহী যানবাহনে রাজধানী ছেড়ে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছে। অনেকেই ব্যক্তিগত গাড়িতে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে বা ম্যানেজ করে, অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমেও রাজধানী ত্যাগ করছেন। এর ফলে বাড়ছে সড়কে দুর্ঘটনা। বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল।

বৃহস্পতিবার গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে রড বোঝাই ট্রাকে করে বাড়ি ফেরার পথে ট্রাক উল্টে ১৩ জন নিহত হয়েছেন। প্রতিদিনই পণ্যবাহী যানবাহনে চড়ে মানুষ দুর্ঘটনায় মৃত্যুকে বেছে নিচ্ছেন। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ১০২ ধারা অনুযায়ী এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ জন্য সংশ্লিষ্ট গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সুপারদের কাছে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকার প্রবেশ ও বাহির পথে কঠোর অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু এর আগ থেকেই প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ভাড়া করে মানুষ গ্রামের বাড়িতে যাওয়া শুরু করে। পরিবার-পরিজন এবং পরিচিতজন মিলে কেউ ব্যক্তিগত গাড়িতে আবার অনেকে গাড়ি রিজার্ভ করে প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ উদযাপনে রওনা হচ্ছেন।

অথচ সামাজিক তথা শারীরিক দূরত্ব অনুযায়ী ঈদে ঢাকা না ছাড়ার সিদ্ধান্ত কঠোরভাবে পালন করতে বলা হয়েছে। কেউ বিকল্প বাহনে ঢাকা ছাড়তে চাইলে মাঝ রাস্তা থেকে ফেরত পাঠানোর নির্দেশনাও রয়েছে। ঈদের সাত দিন পরিস্থিতি কঠিন থাকবে এমন বিবেচনায় সর্বসাধারণ নানা বাহনের সহায়তায় এখনো ঢাকা থেকে গন্তব্যে পাড়ি দিচ্ছেন। এ মিছিল রোধ করতে না পারলে দেশে আক্রান্তের হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন সচেনতন মহল।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রায় দুই মাস ধরে বন্ধ রয়েছে গণপরিবহন। ঈদকে সামনে রেখে পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পরিবহনের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে প্রতিদিনই। এই অবস্থায় পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পরিবহন করলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উপপ্রধান তথ্য কর্মকর্তা মো. আবু নাছের বলেন, দেশব্যাপী সড়ক মহাসড়কে পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পরিবহন করা যাবে না মর্মে নিষেধাজ্ঞা সত্তে¡ও কোনো কোনো পণ্যবাহী যানবাহন কৌশলে যাত্রী পরিবহন করছে যা সরকারি আদেশ অমান্যের শামিল এবং সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যে সকল পণ্যবাহী যানবাহন যাত্রী পরিবহন করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বিআরটিএ সূত্র জানায়, ব্যক্তিগত গাড়ি শুধু নয়, পণ্যবাহী গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমেও রাজধানী ত্যাগ করছেন অনেকে। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ১০২ ধারা অনুযায়ী এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ জন্য সংশ্লিষ্ট গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সুপারদের কাছে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।

সংস্থাটির পরিচালক লোকমান হোসেন মোল্লা জানান, করোনা পরিস্থিতিতে গণপরিবহন বন্ধ রাখাসহ পণ্যবাহী গাড়িতে যাত্রী পরিবহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তদুপরি দেখা যাচ্ছে কোনো কোনো পণ্যবাহী গাড়িতে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। এটি বন্ধ করতে সবাইকে জানানো হয়েছে।

চেকপোস্টে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, কোনো পণ্যবাহী যানবাহন যাত্রী নিয়ে চেকপোস্ট অতিক্রম করতে পারেন না। তবে অনেকেই পণ্যবাহী গাড়ির যাত্রী চেকপোস্ট থেকে দূরে যাত্রীদের আগে নামিয়ে দিয়ে চেকপোস্ট পার হওয়ার পর যাত্রী তোলে। ফলে অনেক সময় তাদের কিছু করার থাকে না। থানা ও পুলিশ ফাঁড়ির অধিকাংশ সদস্য করোনা আক্রান্ত হওয়ায় পুলিশের সংখ্যা কমে গেছে। দাঙ্গা দমন বিভাগ থেকে চাহিদামতো পুলিশ সদস্য পাওয়া গেছে। তারা এখন থেকে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা চৌকিতে দায়িত্ব পালন করবেন এবং পণ্যবাহী কোনো যানে মানুষ ঢাকা থেকে বের হতে কিংবা ঢুকতে দেবেন না।

রাজধানীর প্রবেশ ও বহির্গমন পথ গাবতলী, যাত্রাবাড়ী ও টঙ্গী- এ তিন এলাকা দিয়েই বিকল্প বাহনে মানুষ বাড়ি যাচ্ছে। ট্রেন ও লঞ্চ- এ দুই মাধ্যমে বাড়ি ফেরার সুযোগ না থাকায় অতিউৎসাহী মানুষ সড়কপথকেই বেছে নিয়েছে। কোভিড-১৯-এর মতো সময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরতে কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছেন। অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া অথবা নিজেই অসুস্থ এমন নানা অজুহাত তৈরি করে বাড়ি যেতে চেষ্টা করছেন এ মানুষগুলো।

ঈদের চার দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর থাকবে তাই আগেই ঢাকা ছাড়তে ব্যস্ত অনেকে। এ জন্য কেউ কেউ সিএনজি অটোরিকশা, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুলেন্সের সাহায্য নিচ্ছেন। অনেকে মোটরসাইকেলে করেও শত শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিচ্ছেন ঈদুল ফিতর পালনে।

ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ যাওয়া কোনো সমস্যাই মনে করছেন না যাত্রীরা। আরেকটু দূরে কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পথেও অনেক যাত্রী রওনা হচ্ছেন রিজার্ভ বাহন বা পথে গাড়ি বদল করে। দক্ষিণাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল সবদিকেই ছুটছে মানুষের দল। নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্তরা পণ্যবাহী বাহনকে ভরসা করছেন আর অন্যরা গাড়ি রিজার্ভ করেই রওনা হচ্ছেন গ্রামের বাড়িতে।

সাইনবোর্ড, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ ও শনির আখড়ার সড়কগুলোতেও শত শত মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে যানবাহনের আশায়।
করোনার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে গত ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি শুরু হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় এবং সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে ছুটি। এর আওতায় বন্ধ রয়েছে গণপরিবহন। সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী ৩০ মে পর্যন্ত ছুটি বাড়ানো হয়েছে।

ঈদে ঢাকা ছাড়া দেশের একটি সাধারণ ঘটনা। করোনার কারণে ঈদুল ফিতরে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় ব্যক্তিগত গাড়িসহ বিকল্প বাহন হিসেবে মিনি ট্রাক, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানসহ কোনো যানবাহনে কেউ যেন ঢাকা ছাড়তে না পারে সে জন্য নির্দেশনা জারি করে সরকার। যাত্রা ঠেকাতে ঈদের আগের চার দিন ও ঈদের পরের দুই দিনসহ মোট সাত দিন গাড়ি চলাচল কঠোরভাবে বন্ধ রাখার কথা রয়েছে। কেবল জরুরি সার্ভিসের যানবাহন চলাচলে সুযোগ দেয়া হবে। তবে গতকালও ঢাকা থেকে গ্রামে গেছেন হাজারো মানুষ।

পোশাক কারখানায় কাজ করা এক দম্পতি জানান, ১০ দিনের ছুটি পাওয়ায় তারা শিশুসন্তানকে নিয়ে ঢাকার আশুলিয়া থেকে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার গুণবাহা গ্রামে নিজ বাড়িতে যাচ্ছিলেন। সকাল ৯টার দিকে সাভারের নবীনগর থেকে অন্যান্য যাত্রীদের সঙ্গে একটি ট্রাকে করে পাটুরিয়া ঘাটের উদ্দেশে রওনা দেন তারা। সকাল ১০টার দিকে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পৌঁছালে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা ট্রাকটি জব্দ করে। পরে, এই দম্পতিসহ অন্যান্য যাত্রীরা হেঁটে পাটুরিয়ার দিকে রওনা হন।

নাসরীন আক্তার নামে এক পোশাক শ্রমিক বলেন, কারখানা বন্ধ। টঙ্গীতে থাকলে অনেক খরচ। এই খরচ কে দেবে? বাধ্য হয়েই বাড়ি যাচ্ছি।

যাত্রাবাড়ীর মোড়ে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ কনস্টেবল মাহাবুবুর রহমান বলেন, করোনার প্রথম দিকে মানুষ কথা শুনত। দোকানপাট খুলে দেয়ার পর থেকে আর কাউকে আটকানো যাচ্ছে না। বাস ছাড়া আর সব গাড়ি চলছে। যাত্রাবাড়ীর মোড়ে মাঝেমধ্যে যানজটও হয়। ফুটপাতগুলোতে হকারদেরও দেখা গেল। পাশাপাশি বিক্রি হচ্ছে ফল আর কাপড়।

ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক (প্রশাসন) গোলাম আম্বিয়া বলেন, যাত্রীবহনকারী যান চলাচল বন্ধ আছে। সরকারি আদেশ অমান্য করায়, ১০টি গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে, নির্দেশনা অনুযায়ী, ওষুধ, জরুরি সেবা, জ্বালানি ও পচনশীল পণ্যবহনকারী ট্রাক বা কাভার্ডভ্যান, অ্যাম্বুলেন্স ও সংবাদপত্রের গাড়ি যথারীতি চলবে বলেন তিনি।

পণ্য পরিবহনে যুক্ত মালিক ও শ্রমিক সংগঠন সূত্র জানায়, স্বাভাবিক সময়ে দেশে সাড়ে ৩ লাখ ট্রাক, কাভার্ডভ্যানসহ পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল করে। ২৬ মার্চের পরবর্তী দুই-তিন দিন মাত্র ১০ শতাংশ পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল করেছে। এর পেছনে মূল কারণ ছিল শ্রমিকের স্বল্পতা, মহাসড়কে খাবারের দোকান বন্ধ থাকা এবং কিছুটা আতঙ্ক। পরে পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা পুলিশের সঙ্গে বৈঠক করে কিছু খাবারের দোকান খোলা রাখার ব্যবস্থা করে। এতে পণ্যবাহী পরিবহনের চলাচল বেড়েছে। এ সুযোগে পণ্যবাহী গাড়িতে যাত্রী পরিবহনও বেড়ে যায়।

ট্রাক-কাভার্ডভ্যান পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের নেতারা জানান, পণ্যবাহী গাড়িতে যাত্রী পরিবহন একেবারেই নিষিদ্ধ। বিআরটিএর পক্ষ থেকে জানানো হয়, পণ্যবাহী গাড়িতে যাত্রী পরিবহন বন্ধে পুলিশ সদর দফতর এবং প্রত্যেক জেলা প্রশাসকের দফতরে চিঠি দেয়া হয়েছে।

 

 




Loading...
ads






Loading...