বাজেট দেয়ার নাজুক প্রস্তুতি

বাজেট দেয়ার নাজুক প্রস্তুতি
বাজেট দেয়ার নাজুক প্রস্তুতি - ফাইল ছবি

poisha bazar

  • আসাদ জোবায়ের ও মৃত্তিকা সাহা
  • ২২ এপ্রিল ২০২০, ২৩:৫৮,  আপডেট: ২৩ এপ্রিল ২০২০, ০০:০৩

চলতি অর্থবছরের প্রায় পুরোটাই একমাত্র রেমিট্যান্স ছাড়া অর্থনীতির সব সূচক নিম্নমুখী। এমন এক নাজুক প্রেক্ষাপটেই করোনা ভাইরাস মহামারীতে তছনছ বিশ্বব্যবস্থা। মাস দেড়েক পরেই সংবিধান অনুযায়ী নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব করতে হবে অর্থমন্ত্রীকে। এই বাজেটের আয়ের সংস্থান কোথা থেকে হবে, তা নিয়ে চিন্তার শেষ নেই। অর্থমন্ত্রী আ. হ. এ. মুস্তফা কামাল অবশ্য বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছে বাজেট সহায়তা চাচ্ছেন।

সূত্র জানায়, বর্তমান করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও সরকার নির্ধারিত সময়ে তথা আগামী জুন মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার ৪ জুন বা দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার ১১ জুন ঘোষণার লক্ষ্য নিয়েই বাজেট প্রণয়নের কাজ করছে। দেশে করোনা ভাইরাসের পরিস্থিতি যদি আরো খারাপ হতে থাকে অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি হয় তাহলে অর্থমন্ত্রীর বিকল্প পরিকল্পনাও রয়েছে।

তবে সেক্ষেত্রে তিন মাসের অন্তর্বর্তী বাজেট হতে পারে বলেও আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। এদিকে এই অস্থির সময়ে বাজেট প্রস্তুত করাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে। ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য ৬৪ জন সচিবকে জেলায় জেলায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। যারা বাজেট প্রস্তুত করতে সরাসরি জড়িত।

এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিমও সিরাজগঞ্জ জেলার ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। এই অবস্থায় জুন মাসের শুরুতে কীভাবে বাজেট প্রস্তুত হবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। এ অবস্থায় দুই বিকল্প নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় আগাচ্ছে বলে জানা গেছে।

মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, ছুটির মধ্যেও বাজেট প্রস্তুতির কাজ চলছে। স্বল্প সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে ৫ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার একটি বাজেট পেশ করা হতে পারে। তবে করোনা পরিস্থিতি যেভাবে অবনতির দিকে যাচ্ছে তাতে করে এটি পুরোপুরি প্রস্তুত করা যাবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এ অবস্থায় তিন মাসের একটি অন্তর্বর্তীকালীন বাজেট ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে। তিন মাস পরে এটির সঙ্গে সমন্বয় করে পূর্ণাঙ্গ বাজেট ঘোষণা করা হতে পারে বলে জানা গেছে। প্রতিবছর বাজেটের আগে তিন মাস ধরে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে অর্থমন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, ট্যারিফ কমিশন ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কিন্তু এবার সেটা সম্ভব হয়নি।

এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে এনবিআর ও এফবিসিসিআইয়ের উদ্যোগে জাতীয় পরার্শক কমিটির সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে বাজেটের ওপর সুপারিশ গ্রহণ করা হয়। বড় পরিসরের সেই সভায় অর্থমন্ত্রী উপস্থিত থাকেন। বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা কথা বলার সুযোগ পেয়ে থাকেন। এবার সেটাও হচ্ছে না।

মেইলে বাজেট প্রস্তাবনা পাঠানোর অনুরোধ করা হলেও এনবিআরের সে অনুরোধে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো তেমন সাড়া দেয়নি বলে জানা গেছে। এই অবস্থায় তিন দিন আগে এক প্রজ্ঞাপনে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের আমলাদের জেলায় জেলায় ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এদিকে এনবিআর চেয়ারম্যান, ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব, পরিকল্পনা কমিশনের সচিবসহ কয়েকজন সদস্যসহ অধিকাংশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিবরা এখন একেকটি জেলার ত্রাণ, করোনা পরিস্থিতি ও আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনার সমন্বয় করছেন। অর্থাৎ বাজেট প্রস্তুত কাজে তারা কতটুকু সময় দিতে পারছেন তা বলাই বাহুল্য।

এদিকে একটি বাজের প্রণোয়নে অর্থনীতির চলমান হালচাল ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হয়। যার কোনোটিই এখন সুস্থির নয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম থেকেই আমদানি-রফতানির গতি ছিল।

করোনা পরিস্থিতি সৃষ্টির আগের ৮ মাসে রফতানি আয় আগের বছরের একই সমযের তুলনায় ৪.৮ শতাংশ কম ছিল। আর অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে আমদানি কমেছে ৪.৪ শতাংশ। এই ৭ মাসে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) বেড়েছে মাত্র ৪ শতাংশ। তবে ৮ মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ২০ শতাংশ। করোনা পরিস্থিতিতে তা আর ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

অন্যদিকে বাজেট বাস্তবায়নেও চলতি অর্থবছরে সøথ গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অর্থবছরের প্রথম আট মাসে এডিবি বাস্তবায়নের হার মাত্র ৩৮.৫ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা দশমিক ৩ শতাংশ কম। রাজস্ব আদায়েও ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মনে করছে এ বছর রাজস্ব আদায়ের প্রারম্ভিক টার্গেট থেকে এক লাখ কোটি টাকা ঘাটতি হতে পারে।

এই প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম মানবকণ্ঠকে বলেন, বাজেট তো অবশ্যই নির্ধারিত সময়ে করতেই হবে। তবে এবার করোনা সংকটের কারণে আয়ের তুলনায় ব্যয় আরো বেশি হবে। রাজস্ব আদায় এমনিতেই কম। সামনে আরো কমার আশঙ্কা রয়েছে। সে তুলনায় ব্যয় অনেক বেশি বাড়বে।

কারণ দরিদ্র এবং নিম্ন আয়ের মানুষের সহায়তার জন্য সরকারি ত্রাণ কার্যক্রম আরো বাড়াতে হবে। অর্থাৎ সামাজিক সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্যখাতে সরকারকে আগের তুলনায় বেশি ব্যয় করতে হবে। ফলে বাজেটে ঘাটতির পরিমাণও অনেক বেশি বেড়ে যাবে। আর এই ঘাটতি অর্থায়নের জন্য ব্যাংকঋণের উপর খুব বেশি নির্ভর করা ঠিক হবে না।

কারণ এমনিতেই ব্যাংকঋণের উপর নির্ভর করে সরকার অনেক প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। আর এমনিতেই স য়পত্রে বিনিয়োগে মানুষের আগ্রহ কমে গেছে। সামনে এর পরিমাণ আরো কমবে। কেননা অধিকাংশ মানুষের আয় কমে গেছে এবং নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ার আশঙ্কায় মানুষ স য়পত্রেও খুব বেশি বিনিয়োগ করতে পারবে না। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অর্থাৎ নোট ছাপিয়ে ঘাটতি মেটাতে হবে। এর পাশাপাশি বৈদেশিক সাহায্যের উপরও বেশি জোর দিতে হবে।

সম্প্রতি সিপিডির পক্ষ থেকে এক সংবাদ সম্মেলনে দেশে অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, করোনার কারণে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে। এর ফলে আগামীতে কাস্টমস ডিউটি, ভ্যাট আদায় এবং সম্পূরক শুল্ক থেকে রাজস্ব আহরণ কমে যাবে। কারণ, দেশে ইতোমধ্যে রফতানি আয় কমেছে। করোনার কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। মানুষের চাকরিচ্যুতি ঘটবে। কমে যাবে আয়কর আদায়ের হার।

শুধু তাই নয়, বেসরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আয় কমবে। ফলে কর্পোরেট কর আদায়ও কমবে। এ অবস্থা চলতে থাকলে বেড়ে যাবে বাজেট ঘাটতি। চলতি অর্থবছরে বাজেটে এই ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছে জিডিপির ৫ শতাংশ। কিন্তু সিপিডি বলছে, এই ঘাটতি সাড়ে ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এই পরিস্থিতিতে সিপিডির পক্ষ থেকে আগামী অর্থবছরে বিভিন্ন শ্রেণির আয়করদাতাদের কিছু সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সিপিডি শঙ্কা ব্যক্ত করে বলেছে, আগামী অর্থবছরে কর হার বা করের আওতা বাড়ানো সরকারের জন্য কঠিন হবে। এর পরিবর্তে এনবিআরের উচিত হবে কর মনিটরিং জোরদার করা, যাতে বিদ্যমান করদাতারা যেন কর ফাঁকি দিতে না পারে এবং আমদানি-রফতানির নামে মুদ্রাপাচার যেন না ঘটে। এনবিআরের উচিত করোনার কারণে যেসব কৃষিভিত্তিক শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের কর রেয়াত সুবিধা দেয়া। এক্ষেত্রে তাদেরকে মার্চ-জুন প্রান্তিকে ভ্যাট মওকুফ করে দেয়া যেতে পারে এবং এটা আগামী অর্থবছরে অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

অভ্যন্তরীণ শিল্প ও রফতানিমুখী শিল্পকে তাদের কর্পোরেট কর কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া এবং এই কিস্তি সুবিধা আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের টার্নওভার ট্যাক্স মওকুফের সীমা ৫০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ কোটি টাকায় উন্নীত করারও সুপারিশ করেছে সিপিডি।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, করোনায় অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় নতুন পরিকল্পনা নিয়ে পাঁচ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রণয়নে কাজ চলছে। আগামী জুন মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার ৪ জুন বা দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার ১১ জুন ঘোষণার লক্ষ্য নিয়েই বাজেট প্রণয়নের কাজ চলছে।

তবে দেশে করোনা ভাইরাসের পরিস্থিতি যদি আরো খারাপ হয় অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি হয় তাহলে অর্থমন্ত্রীর বিকল্প পরিকল্পনাও রয়েছে। সেটি হচ্ছে সংবিধান অনুযায়ী তিন মাসের একটি অস্থায়ী বাজেট ঘোষণা হতে পারে। এ অস্থায়ী বাজেট চলাকালীন অর্থমন্ত্রী পুনরায় পুরো অর্থবছরের বাজেট ঠিক করবেন। তিন মাস পর পুনরায় বাজেট ঘোষণা করবেন অর্থমন্ত্রী।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ছয় লাখ কোটি কিংবা তারও বেশি টাকার আগামী বাজেট ঘোষণার পরিকল্পনা ছিল অর্থমন্ত্রীর। কিন্তু করোনার কারণে সেটি কমিয়ে ৫ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে। যা চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে প্রায় ১১ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের বাজেটের আকার হচ্ছে পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার প্রভাবে দেশে আরো নতুন করে অনেক বেশি মানুষ দরিদ্র হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই আগামীতে এদের সহায়তার আওতায় আনতে আসন্ন বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৮০ হাজার কোটি টাকা করা হতে পারে। আগামী বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের আওতাও বাড়ানো হবে। চলতি বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭৪ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১৪ দশমিক ২১ শতাংশ। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এ খাতে সুবিধাভোগীর সংখ্যা প্রায় ৮৯ লাখ গরিব মানুষ।

প্রতিবছর জুন মাসে বাজেট ঘোষণার আগেই মে মাসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে নতুন অর্থবছরের এডিপি অনুমোদন করিয়ে নিতে হয়। সে কারণে মার্চ নাগাদ শুরু হয়ে যায় এডিপি তৈরির কাজ। এ বছরও মার্চ মাসেই শুরু হয়েছে এডিপি প্রণয়নের কাজ। ২৩ মার্চ জারি করা হয়েছে এডিপি প্রণয়নের নির্দেশিকা। এরপর করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির কারণে দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলেও থেমে নেই এর কাজ। গত সপ্তাহেও মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে এডিপিতে নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্তি এবং এডিপিতে প্রকল্পভিত্তিক অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রস্তুতির নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, এরই মধ্যে জারি করা এডিপির নীতিমালায় বলা হয়েছে- নতুন প্রকল্প যুক্ত করার ক্ষেত্রে বেষম্য হ্রাস, দারিদ্র্য নিরসনসহ সংশ্লিষ্ট বিষয় মাথায় রাখতে হবে। এছাড়া অ লভিত্তিক সুষম উন্নয়ন, এসডিজি (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) অর্জন, নদীভাঙন-জলাবদ্ধতা রোধে ড্রেজিং, নদীশাসন ও রক্ষণাবেক্ষণের লক্ষ্যে পরিবেশ ও প্রতিবেশের বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে সমন্বিত প্রকল্প প্রণয়নে অগ্রাধিকার দিতে হবে।


মানবকণ্ঠ/এমএইচ





ads