ত্রাণ বিতরণে করোনা আক্রান্তের ঝুঁকি বাড়ছে

ত্রাণ বিতরণে করোনা আক্রান্তের ঝুঁকি বাড়ছে - সংগৃহীত

poisha bazar

  • আব্দুল্লাহ রায়হান
  • ০৬ এপ্রিল ২০২০, ২৩:৫৫,  আপডেট: ০৭ এপ্রিল ২০২০, ০১:০৬

বিশ্বের ২০৩টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এ ভাইরাসের প্রভাবে পড়েছে। যে কারণে অঘোষিত লকডাউনে বন্ধ রয়েছে মানুষের স্বাভাবিক কাজকর্ম।

দুই দফায় ১৯ দিনের বন্ধের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য, দোকানপাট, পরিবহনসহ নিত্যদিনের কর্মতৎপরতাও বন্ধ হয়ে গেছে। কর্মহীন হয়ে পড়েছে অসংখ্য মানুষ। দৈনিক আয়ের মানুষগুলো পড়েছে অসহায় অবস্থায়।

দিনমজুর, রিকশাচালক, স্বল্প আয়ের শ্রমিক-কর্মচারীসহ অসংখ্য মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে ক্ষুধার কষ্টে আছেন। কাজ হারিয়ে কোনো উপার্জন করতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন তারা। এমন দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন মানবিক মানুষগুলো।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় নিজেদের মতো করে যার যা সামর্থ্য তাই নিয়ে হতদরিদ্রদের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দিতে পথে নেমেছেন অনেকেই। বর্তমানে নিম্ন আয়ের মানুষকে ব্যক্তি, সংগঠনসহ বিভিন্ন পর্যায় থেকে যে ত্রাণ সহায়তা দেয়া হচ্ছে, তাতে কোনো সমন্বয় নেই। দেখা দিয়েছে বিশৃঙ্খলা। সামাজিক দূরত্ব বা ন্যূনতম সাবধানতা অবলম্বন না করে সাহায্য নিতে ভিড় জমাচ্ছেন রাজধানীর মোড়ে মোড়ে।

অনেকেই আবার প্রতিদিনই ত্রাণের আশায় রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন। ত্রাণের গাড়ি এলেই তারা হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। এতে বিভিন্ন স্থানে ত্রাণদাতাদের পালিয়ে আসতে হয়েছে। মারামারির ঘটনাও ঘটেছে কোথাও কোথাও। ত্রাণ দেয়া মানবিক মানুষগুলো বলছেন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ত্রাণ বিতরণ করলেও অধিকাংশই তা মানতে পারছেন না।

অনেকেই আবার ঢাকার রাস্তায় গাড়িতে করে ঘুরে ঘুরে ত্রাণ দিচ্ছেন। এতেও বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। এতে করে কেউ পাচ্ছে এবং কেউ একেবারে পাচ্ছে না। দেশের বিভাগীয় শহরগুলো ছাড়াও গ্রামা লের ত্রাণ দেয়ার ক্ষেত্রেও নেই সামাজিক দূরত্ব মানার প্রবণতা। ত্রাণ বিতরণে সামাজিক দূরত্ব অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। আর এতেই করোনা আক্রান্তের ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সরকারের অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষেও ত্রাণ সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে জনসমাগম করা এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় না রাখার অনেক অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে সরকার বলছে, এখন থেকে সারাদেশে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে তালিকার মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাহায্য দেয়া না হলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ব্যক্তিগতভাবে বা বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে ত্রাণ দেয়ার এসব আয়োজনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনেক জমায়েত তৈরি হচ্ছে। ফলে করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছেই না। গত কয়েকদিন ধরে এমন অনেক ছবি এবং খবর নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

সরকার বারবার দেশজুড়ে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে তালিকা ধরে ঘরে ঘরে সহায়তা দেয়ার কথা বললেও কার্যত তা হচ্ছে না। নিয়ম ভেঙেই অভুক্ত অসহায়রা জড়ো হচ্ছেনÑ এলাকায় মোড়ে মোড়ে। অনেকের অভিযোগ, ভোটার আইডি কার্ড থাকার পরও তাদের তালিকা হচ্ছে না। আবার অনেকের তালিকায় নাম থাকলেও পাচ্ছেন না সরকারি ত্রাণসামগ্রী।

এ নিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশে লকডাউনের মধ্যে দরিদ্র জনগোষ্ঠী বা নিম্ন আয়ের দেড় কোটির বেশি মানুষকে খাদ্য সহায়তা দেয়া প্রয়োজন। বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, সংগঠন এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেকে ত্রাণ দিচ্ছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে জেলা প্রশাসকদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়েছে, কর্মহীন ও যারা দৈনিক আয়ের ভিত্তিতে সংসার চালান, তাদের তালিকা প্রস্তুত করে খাদ্য সহায়তা দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

স্থানীয় পর্যায়ে বিত্তশালী ব্যক্তি, সংগঠন, এনজিও কোনো খাদ্য সহায়তা দিলে জেলা প্রশাসকরা প্রস্তুতকৃত তালিকার সঙ্গে সমন্বয় করবেন, যাতে দ্বৈততা পরিহার করা যায় এবং কোনো কর্মহীন মানুষ যেন বাদ না পড়ে। সামগ্রিকভাবে সমন্বিত কার্যক্রম এ মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি।

ত্রাণ বিতরণকারীদের অনেকেই জানান, ত্রাণ দিতে গেলে ভবঘুরে আর রিকশা চালকরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন বেশি। দ্রব্যসামগ্রী বিতরণের সময় মারামারির ঘটনাও ঘটছে বিভিন্ন জায়গায়। ত্রাণ নেয়ার জন্য কাড়াকাড়ি ও হুড়োহুড়ি মুরু করে সবাই। অনেক বিশৃঙ্খলার কারণে ত্রাণ বিতরণ শেষ না করেই চলে যান আয়োজকরা।

অনেক জায়গায় বিতরণের অপেক্ষা না করে মুহূর্তেই তারা নিজেরা ভ্যান থেকে ত্রাণের ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায়। এমন নানা ঘটনার ভিডিও ছবি দেখা যাচ্ছে ফেসবুকে। ফেসবুক অ্যাক্টিভিস্ট শাহিনুর ইসলাম সৌরভ গতকাল তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, এখনো সময় আছে রাস্তাঘাটে বিচ্ছিন্নভাবে ত্রান দেয়া বন্ধ করা হোক।

ত্রাণ ত্রাণ খেলা কঠিন পরিণতি ডেকে আনবে। এই দুর্যোগময় মুহূর্তে সারাদেশের ইউনিয়নগুলোতে চেয়ারম্যান মেম্বারদের ঈদ উৎসব শুরু হয়েছে। তাদেরকে ত্রাণ বণ্টনের দায়িত্ব না দিয়ে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ত্রাণ দেয়া হোক। আর এমন পরামর্শ দিচ্ছেন ফেসবুক ব্যবহারকারীদের অনেকেই।

সরেজমিনে গতকাল সোমবার দুপুরে রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তার পাশে ত্রাণের আশায় বসে থাকতে দেখা যায় বহু মানুষকে। তারা বলছেন, রাত থেকে ঘুরেও কিছু পাননি। তবুও তারা আশায় বুক বেঁধে প্রতিদিনই রাস্তায় নামেন। গতকাল সকাল থেকে মিরপুর, শ্যামলী, গুলিস্তান, জাতীয় প্রেসক্লাব, শাহবাগ, ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর, জিগাতলা, যাত্রাবাড়ী, দোলাইরপাড়, সাইনবোর্ড, শনিরআখড়া, রামপুরা, বনশ্রী এলাকায় প্রায় প্রতিটি মোড়েই সাহায্য প্রত্যাশীদের ভিড় ছিল কয়েকদিনের তুলনায় বেশি।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা আলমগীর হোসেন আত্মীয়-স্বজন নিয়ে বাসার সামনেই নিম্ন আয়ের মানুষদের ত্রাণ দিয়েছেন গতকাল। এ সময় তিনি মানবকণ্ঠকে বলেন, আমাদের বাসার কাছে বস্তিতে অনেক মানুষ বাস করে, এদের অনেকেই রিকশাচালক, যাদের এখন আয় নাই। আমরা নিজেরা একটা তালিকা করে তাদের এনে সাহায্য দিচ্ছি। জনপ্রতি দুই কেজি চাল, এক কেজি ডাল, আলু এবং লবণ এবং সাবান প্যাকেট করে দিচ্ছি।

মহাখালীর আমতলীতে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাস্তার মোড়ে মোড়ে ঘুরেও কোনো ধরনের ত্রাণ পাননি বরিশালের মেয়ে ফতেমা আক্তার। মহাখালীতে দুই বাসায় কাজ করা ফতেমা মানবকণ্ঠকে বলেন, বাসাবাড়ি থেকে কাম ছাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এখন বাসায় খাবার নেই। তাই সকাল ৬টায় আইসা এইহানে দাঁড়াইছি। কেউ সাহায্য দিতে আইলে ব্যাটা মাইনষেরা আগে আগে দোড়াইয়া গিয়া নিয়া নেয়। এইহানে যারা আইছে, এর মধ্যে অনেকের অবস্থা ভালো, বাসায় খাবার-দাবার আছে। আমগোর হক মাইরা খাইতে আইয়া দাঁড়াইছে তারা।

মানবকণ্ঠের জেলা প্রতিনিধিদের সূত্রে জানা যায়, সারা দেশেই ত্রাণ বিতরণে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সমন্বয় না থাকায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। এমনকি জনপ্রতিনিধিদের ত্রাণ দেয়া কার্যক্রমেও করোনা ঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব মানা হচ্ছে না। সমন্বয়হীনভাবে ত্রাণ দিতে গিয়ে জনসমাগম বেশি হচ্ছে।

লোকজন একেবারে হামলে পড়ছে যা সামাল দেয়া যায় না। আসলে কোনো সমন্বয় নাই। ব্যক্তি, সংগঠন, সরকার সবাই দিচ্ছে, কিন্তু এসব বিচ্ছিন্নভাবে হচ্ছে। ফলে কেউ পাচ্ছে এবং কেউ একেবারে পাচ্ছে না। একটা বিশৃঙ্খলা হচ্ছে। এ অবস্থায় সরকার এখন ব্যক্তি বা কোনো সংগঠনের নিজেদের উদ্যোগে জনসমাগম না করে তাদের সাহায্য সারাদেশে জেলা প্রশাসনের কাছে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

ঢাকার দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ত্রাণ দেয়ার সময়ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। এ নিয়েও অনেক সমালোচনা হয়েছে। এই সিটি কর্পোরেশনের বিদায়ী মেয়র সাঈদ খোকন বলেছেন, ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে বাসিন্দাদের মধ্যে নিম্ন আয়ের তালিকা করে ঘরে ঘরে খাদ্য সাহায্য পৌঁছানো হচ্ছে।

বিভিন্ন ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের মধ্যে রিকশাচালক এবং দিনমজুর যারা আছেন তাদের চিহ্নিত করা খুব কঠিন। সেজন্য বিভিন্ন রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশের সহায়তা নিয়ে তাদের এক জায়গায় জড়ো করে সাহায্য দেয়া হয়। রিকশাচালক ভাইদের দিতে গিয়ে দেখেছি অনেক ছিন্নমূল ও দুস্থ মানুষ এসে দাঁড়াচ্ছেন। তখন সেই কার্যক্রম আমাদের বন্ধ করতেও হয়েছিল।

তবে এক্ষেত্রে ভিন্ন পরামর্শ দিয়েছেন জাতীয় অধ্যাপক ও এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির উপাচার্য জামিলুর রেজা চৌধুরী। তিনি বলেন, অনেকেই খাবার কিনে দিচ্ছেন। তাতে কেউ বারবার পাচ্ছে, কেউ পাচ্ছেই না। বাজারে এখনো খাবার যথেষ্ট আছে। হাটবাজার খোলা আছে। কাজেই আমাদের অভাবী মানুষের তালিকা করে প্রত্যেকের মোবাইল ফোনে টাকা পাঠাতে হবে। এটারও একটা সমন্বয় দরকার।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান মানবকণ্ঠকে বলেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগে যারা সাহায্য করছেন তারা সামাজিক দূরত্বটা বজায় রাখতে পারছেন না। যার কারণে কমিউনিটি সংক্রমণের শঙ্কা বাড়ছে। এটা দেখার পর ডিসিদের এবং সেনাবাহিনীকে অনুরোধ করি তারা যেন এটা তত্ত্বাবধান করেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোনো অবস্থাতেই জনসমাগম করে ত্রাণ বিতরণ করা যাবে না। জেলা প্রশাসকদের তত্ত¡াবধানে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত যে তালিকা হচ্ছে, সেই তালিকা ধরে জেলা প্রশাসন সমন্বয় করে মানুষের বাড়িতে ত্রাণ পৌঁছে দেবেন।

খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম মাসুদ বলেন, রাজধানীতে ত্রাণ বিতরণে বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে। তাছাড়া পারস্পরিক দূরত্বও নিশ্চিত হচ্ছে না। তাতে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ কঠিন হয়ে পড়বে। সরকার উপজেলাভিত্তিক কম আয়ের এবং কর্মহীনদের তালিকা তৈরি করে প্রকাশ করতে পারে। যারা ত্রাণ দিতে চাইবে তারা সেই তালিকা অনুসরণ করবে।

মানবকণ্ঠ/এমএইচ




Loading...
ads






Loading...