গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে

গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে - সংগৃহীত

poisha bazar

  • সেলিম আহমেদ
  • ০৬ এপ্রিল ২০২০, ০০:২৪,  আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০২০, ০০:৪৬

বিশ্বব্যাপী মহামারী রূপ নেয়া করোনা ভাইরাসের গণহারে সংক্রমণ এড়াতে গত ২৭ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল (শনিবার) পর্যন্ত দেশের তৈরি পোশাক কারখানার অধিকাংশই বন্ধ ছিল। দীর্ঘদিনের ছুটি থাকায় ওইসব বন্ধ কারখানার শ্রমিকদের বিরাট একটা অংশ গ্রামে চলে যায়।

শনিবার থেকে কিছু গার্মেন্টস খোলা থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমিত পরিবহনে গাদাগাদি করে কিংবা পায়ে হেঁটে কর্মস্থলে আসেন শ্রমিকরা। করোনা ঝুঁকির সময় হাজারো পোশাক শ্রমিকের কাজে যোগদানের এই মিছিল দেখে শুরু হয় নানা সমালোচনা। আতঙ্ক প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

নানা সমালোচনার পর অবশেষে ফের ১১ এপ্রিল পর্যন্ত কারখানা বন্ধ রাখতে আহ্বান জানিয়েছে বিজিএমইএ। তাই ফের ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন কর্মীরা। মালিকপক্ষের কারখানা চালু ও বন্ধের এই দুই সিদ্ধান্তের কারণে হাজার হাজার শ্রমিকের ঘর থেকে বেরিয়ে গাদাগাদি করে দলবেঁধে রাস্তায় চলায় করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

এর দায় বিজিএমইএ ও বিকেএমইএকেই নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন তারা। তারা বলছেন, হাজার হাজার শ্রমিকের দলবেঁধে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যবিধি না মেনে গাদাগাদি করে কর্মস্থলে আসার ও সিদ্ধান্ত বদলের কারণে শ্রমিকদের বাড়ি যাওয়া সরকারের নভেল করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করেছে।

এতে করোনা সংক্রমণের ভয়াবহ ঝুঁকির ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এইসব মানুষের একজন করোনা পজিটিভ হলে তার মাধ্যমে কারখানা কিংবা বাসাবাড়িতে ভাইরাস ছড়াবে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মুজিবুর রহমান বলেন, করোনার এই প্রকোপের মুখে হেঁটে, ট্রাক বা পিকআপে একসাথে মানুষের গাদাগাদি করে চলাচল মানে সাংঘাতিক বিপদ ডেকে আনা।

এসব মানুষের একজন করোনা পজিটিভ হলে তার মাধ্যমে কারখানা কিংবা বাসাবাড়িতে ভাইরাস ছড়াবে। আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুশতাক হোসেন বলেন, শ্রমিকরা বাড়ি যাওয়ার সময় একবার একটা ঝুঁকি তৈরি করেছে। এখন আসার পথে আরেকবার ঝুঁকি তৈরি করেছে। এখন তারা যদি আবার গ্রামে যায়, আবার ফিরে আসে তাহলে সংক্রমণের ঝুঁকি তো আরো বেশি বেড়ে যাবে।

হাজার হাজার পোশাক শ্রমিকদের এই যাতায়াত চলমান পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. তৌফিক জোয়ার্দার বলেন, তারা যতবার যাতায়াত করবে, ততবার সামাজিক দূরত্ব ভেঙে কাছাকাছি চলে আসবে। ততবারই জীবাণুটা ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ বেড়ে যাবে। এই যে হাজার হাজার শ্রমিক আসল, এদের মধ্যে কেউ যদি সংক্রমিত হয়ে থাকে তাহলে সেটা তার মধ্যে আর থাকবে না। আরো অনেকের মধ্যে ছড়িয়ে যাবে। এই শ্রমিকরা কিন্তু এক জায়গায় বসে থাকবে না। তাদেরকে চাল-ডাল কেনাসহ নানা কাজে বের হতে হবে। কারখানায় যেতে হবে। সেখানেও রোগটি ছড়িয়ে পড়তে পারে।

যারা ঢাকায় চলে এসেছে তাদের কোনোভাবেই আর ঢাকার বাইরে যেতে না দেয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তৌফিক জোয়র্দার বলেন, ভুল সিদ্ধান্ত যদি বিজিএমইএ নিয়ে থাকে তার মাশুল তাদেরই দিতে হবে। পাঁচ দিন যদি শ্রমিকরা বসে থাকে তাহলে এর ক্ষতিপূরণ বিজিএমইএকে দিতে হবে। এর দায় তো শ্রমিকরা নিতে পারে না।

বিশিষ্ট বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, সারাদেশ থেকে যেভাবে পোশাকশ্রমিকরা এসেছেন, তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বলা তো যায় না, তাদের মধ্যে এই করোনা ভাইরাসের ক্যারিয়ার কে। এখানে ‘সোশ্যাল ডিসটেন্স’ না মানায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমদ বলেন, শ্রমিকদের একসঙ্গে আসায় স্বাস্থ্য ঝুঁকি বেড়েছে। এই স্বাস্থ্য ঝুঁকির দায় কে নেবে। এই স্বাস্থ্য ঝুঁকির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে অর্থনৈতিক ঝুঁকিও।

করোনা ভাইরাসের এ দুর্যোগকালীন সময়ে গার্মেন্টস শ্রমিকরা ঢাকায় হেঁটে আসার বিষয়টি নিয়ে মালিকদের সমালোচনা করে ব্যারিস্টার সৈয়দ সাইদুল হক সুমন বলেন, ‘টাকা নিয়ে গার্মেন্টস মালিকরা কানাডায় সেকেন্ড হোম তৈরি করেন। শ্রমিকদের মানুষ মনে করেন না। করোনার মধ্যেও গার্মেন্টস মালিকরা লাভ করছেন, আগেও করতেন আগামীতেও করবেন। এই একটা দেশে প্রধানমন্ত্রী (শেখ হাসিনা) ছাড়া কারো ওপর ভরসা করার কোনো কিছু পাচ্ছি না।

তিনি বলেন, অনেকদিন আগে থেকে শুনতাম গার্মেন্টস শ্রমিকদের নির্যাতন করা হতো। অর্থনৈতিক কারণে এই নির্যাতন মেনে নেয়া হতো। অনেক সময় বিশ্বাস করতাম না।

সুমন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মেনে সারাদেশে যখন লকডাউনের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে, তখন গার্মেন্টস মালিকরা শ্রমিকদের এরকম করোনা ভাইরাসের মধ্যে হাঁটাইয়া হাঁটাইয়া ঢাকায় নিয়ে এসেছেন। কিছু কিছু গার্মেন্টস মালিক শ্রমিকদের মানুষই মনে করেন না। শ্রমিকদের যদি মানুষই মনে করতেন, অন্তত আরো দুই সপ্তাহ ওয়েট করতেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, গার্মেন্টস শ্রমিকদের ঢাকায় নিয়ে আসা কোভিড-১৯ এর সংক্রমণের শঙ্কাকে বাড়িয়ে দেয়। ‘আমরা আশা করি, ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি হবে না, হলে পরে সংক্রমণ অবশ্যই বেড়ে যাবে। বিকেএমইএ এবং বিজিএমইএ’র এই সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি বলে জানান তিনি।

গতকাল রোববার কোভিড-১৯ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়মিত অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী এ কথা বলেন। যে ঝুঁকি তৈরি হলো এবং এই দুই সংগঠন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে না জানিয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিল কিনা প্রশ্নে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়। কাজেই তারা আমাদের কাছে জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন মনে করেনি। কিন্তু এই বিষয়টি সঠিক হয়নি এটা আমরা মনে করি।

সূত্র জানায়, করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে গত ২৭ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল (শনিবার) পর্যন্ত দেশের তৈরি পোশাক কারখানার অধিকাংশই বন্ধ ছিল। এই সময়কালে গণপরিবহণও বন্ধ রাখা হয়। দীর্ঘদিনের ছুটি থাকায় ওইসব বন্ধ কারখানার শ্রমিকদের বিরাট একটা অংশ নানা ঝুঁকি নিয়ে বাস-ট্রাক কিংবা অন্য পরিবহনে গাদাগাদি করে গ্রামে চলে যায়। পরবর্তী সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে গণপরিবহন বন্ধ রাখার সময়সীমা আরো বাড়ানো হয়। তবে বাড়ানো হয়নি গার্মেন্টস কর্মীদের ছুটি। তাই চাকরি বাঁচাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফের গাদাগাদি করে কিংবা পায়ে হেঁটে কাজে যোগদান করে শ্রমিকরা। তারা ঢাকায় আসার পর সমালোচনার মুখে সব ধরনের পোশাক কারখানা আগামী ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধ রাখতে মালিকদের প্রতি আহ্নবান জানিয়েছেন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা।

শনিবার রাতে তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতি রুবানা হক সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো এক অডিও বার্তায় গার্মেন্টস মালিকদের প্রতি কারখানা বন্ধ রাখার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আগামী ১১ এপ্রিল পর্যন্ত কারখানা বন্ধ রাখার জন্য সব কারখানা মালিক ভাই-বোনদের বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি। একই সাথে শ্রমিক ভাই-বোনদের এটাও আশ্বস্ত করতে চাই যে, তারা তাদের মার্চের বেতন পাবেন। এটা নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।

কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকার কারণে কোনো শ্রমিক যাতে চাকরিচ্যুত না হন সবপক্ষকে এই অনুরোধটুকু করছি। পরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিকেএমইএ সভাপতি এ কে এম সেলিম ওসমান আগামী ১১ এপ্রিল পর্যন্ত তাদের সংগঠনভুক্ত সব কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের কথা জানান।

মানবকণ্ঠ/এমএইচ




Loading...
ads






Loading...